মুদ্রণ

বিডিনিউজডেস্ক.কম| তারিখঃ ০৮.১১.২০১৯

কারখানা সচল রাখতে প্রতিনিয়ত ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশ সুরক্ষিত রাখার চেষ্টায়  থাকেন দেশের পোশাক খাতসংশ্লিষ্টরা।

এ ধারাবাহিকতায় উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও কম দামে ক্রেতার কাছে পোশাক বিক্রি করেন তারা। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভবিষ্যৎ কার্যাদেশের সুরক্ষা নিশ্চিতে ৫০ শতাংশের বেশি কারখানা উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কমে পোশাক বিক্রি করে।

আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিশ্চিতে কাজ করছে নেদারল্যান্ডস সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফেয়ার ওয়্যার ফাউন্ডেশন। পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে দরকষাকষির একটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ পদ্ধতির প্রচারণা চালাচ্ছে তারা। এর অংশ হিসেবে গতকাল রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে লেবার মিনিটস কস্টিং অ্যান্ড প্রাইস নেগোসিয়েশনস উইথ বায়ার্স শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। প্রতিপাদ্য বিষয়ে সেমিনারে পেশ করা উপস্থাপনায় ক্রেতার পক্ষ থেকে মূল্যচাপ ও ক্রয়াদেশ ধরতে সরবরাহকারীদের মানসিকতাসংক্রান্ত সমীক্ষার তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

সমীক্ষার তথ্যের ভিত্তিতে ফেয়ার ওয়্যার ফাউন্ডেশন বলছে, ২০১১ সালের তুলনায় ২০১৬ সাল শেষে বাংলাদেশের রফতানি করা পোশাকের মূল্য কমেছে ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ইউরোপের বাজারে পোশাকের মূল্য কমেছে ৯ দশমিক ৪ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

ক্রেতাদের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত মূল্য কমানোর চাপ অব্যাহত আছে এমন তথ্য জানিয়ে ফেয়ার ওয়্যার ফাউন্ডেশন বলছে, পর্যালোচনা শেষে বাংলাদেশের নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা হলেও ক্রেতারা তার সঙ্গে সমন্বয় করে পোশাকের দাম বাড়ায়নি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বরাতে সংস্থাটি দাবি করছে, বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রয় করে এমন ২৫ শতাংশ ক্রেতা পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। বাকি ৭৫ শতাংশ দাম বাড়ায়নি।

নরওয়ে এথিকাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভের সমীক্ষার বরাতে ফেয়ার ওয়্যার ফাউন্ডেশন বলছে, ক্রেতার অব্যাহত চাপ সামলে কারখানাগুলো ভবিষ্যৎ কাজ সুরক্ষিত করতে উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম মূল্যে পোশাক বিক্রি করে। গত বছর উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়েছে কিনা এমন প্রশ্ন করে দেখা গেছে, সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের ৫০ শতাংশের বেশি ইতিবাচক উত্তর দিয়ে জানিয়েছেন, মাঝে মাঝেই তাদের এমনটা করতে হয়েছে। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের ৮ শতাংশ বলেছেন, অনেকবার উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে পোশাক বিক্রি করেছেন।

উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কমে পোশাক কখনই বিক্রি করেননি এমনটা জানিয়েছেন ২৮ শতাংশ কারখানা প্রতিনিধি। এ বিষয়ে কিছু জানেন না এমন উত্তর দিয়েছেন ৯ শতাংশ কারখানা। আর প্রশ্নটি প্রযোজ্য নয় এমন উত্তর দিয়েছেন ৭ শতাংশ। ক্রয়চর্চা নিয়ে আইএলওর সমীক্ষার বরাতে ফেয়ার ওয়্যার ফাউন্ডেশন বলছে, বস্ত্র ও পোশাক শিল্পে ৫২ শতাংশ সরবরাহকারী বলেছেন, যে দামে তারা ক্রয়াদেশ নিয়েছেন, তা উৎপাদন ব্যয় ওঠাতে পারে না।

বিজিএমইএ পরিচালক মো. আবদুল মোমেন বলেন, বস্ত্র খাতকে পরিবেশ ও শ্রমশক্তি বিবেচনায় টেকসই করতে হলে একে অর্থনৈতিকভাবেও টেকসই হতে হবে। আর এজন্য মূল্য ও ব্যয়ের মধ্যে সম্পর্ক থাকতে হবে, যা অধিকাংশ সময়ই দেখা যায় না। শিল্প এখন প্রচণ্ড চাপে আছে। আমরা মূল্য ও ব্যয়ের বিষয়গুলো ক্রেতার সঙ্গে ভাগ করে নিলেও এর কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। মূল্য নিয়ে আলোচনায় বেশি গুরুত্ব পায় ক্রেতার চাহিদা। তারা বলে, তোমরা নির্ধারিত মূল্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আমরা অন্য গন্তব্যে চলে যাব। দরকষাকষির ক্ষমতায় ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। সরবরাহকারী হিসেবে আমরা ক্রেতার চেয়ে অনেক কম ক্ষমতাসম্পন্ন।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেআই হোসেন বলেন, যখনই আলোচনা হয় তখন তা ঘুরেফিরে শ্রমিকের দিকে যায়, কখনো ক্রেতার দিকে যায় না। ক্রেতারা যা করছে তা কি সবসময় সঠিক করছেন? সুশীল সমাজের এখন সময় এসেছে ভোক্তার ক্রয়চর্চা পরিবর্তনের। যখনই ভোক্তারা বিক্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছে, ‘একটি কিনলে একটি ফ্রি’ দেখলে সেই পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে? ভোক্তা যদি এ বিষয় উপলব্ধি করতে না পারেন, তাহলে এ সংকট কখনই কাটবে না। ভোক্তা শুধু নিজের লাভের বিষয়টি ভাবছেন, যা ব্র্যান্ডগুলোকেও প্রভাবিত করছে অতিরিক্ত মুনাফা করতে। এ পরিস্থিতিতে আমরা কার কাছে যাব? এছাড়া কেআই হোসেন বৈশ্বিক ক্রয়চর্চার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুতি গ্রহণের প্রয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।