আজ মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৭

সদ্য প্রাপ্তঃ

*** ময়মনসিংহে সুটকেসের ভেতর যুবকের লাশ * ঢাবি অধিভুক্ত ৭ কলেজের মাস্টার্স পরীক্ষা স্থগিত * দিনাজপুরে বজ্রপাতে নিহত ৬ * দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে 'সুপার ম্যালেরিয়া' * রিয়ালের পথের ইতি টানতে চান বেনজেমা * মধ্যবাড্ডায় অগ্নিকাণ্ডে মায়ের মৃত্যু, ২ সন্তান দগ্ধ * পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই: বাড়ছে ক্ষোভ, ঝিমিয়ে পড়া

Bangladesh Manobadhikar Foundation

Khan Air Travels

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ২০.০৯.২০১৭

চালের মজুদ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিলেন মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীরা।

সারা দেশে এক কোটি টন চাল মজুদ আছে বলে খাদ্যমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রী দাবি করলেও তাকে ভিত্তিহীন বললেন ব্যবসায়ীরা। এ পরিমাণ চাল মজুদ থাকলে তার সপক্ষে প্রমাণ চান ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ।

চালের বাজারে অস্থিরতা নিয়ে সচিবালয়ে গতকাল চাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিন মন্ত্রী। ওই বৈঠকেই চালের মজুদসংক্রান্ত পরস্পরবিরোধী বক্তব্য উঠে আসে। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ও হয়।

বৈঠকের শুরুতে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম দেশে চালের কোনো সংকট নেই দাবি করে মূল্যবৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, ব্লাস্ট ও বন্যার কারণে ২০ লাখ টন চাল কম উত্পাদন হয়েছে। তার পরও উত্পাদন হয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ টন। আমার হিসাবমতে, এক কোটি টন চাল মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে মজুদ আছে। তার পরও দাম বাড়ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন দাম আর বাড়েনি। কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে। এটি একটি কৃত্রিম সংকট।

খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন জয়পুরহাট চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল বারী। কী ধরনের সংকট ব্যবসায়ীরা সৃষ্টি করেছেন, তারও ব্যাখ্যা চান তিনি। খাদ্যমন্ত্রী এ সময় আরো কিছু বলতে গেলে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। কয়েকজন ব্যবসায়ী একসঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করেন। খাদ্যমন্ত্রীর ওপর ক্ষোভও প্রকাশ করেন তারা। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এ সময় খাদ্যমন্ত্রীকে থামিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন।

দেশে এক কোটি টন চাল মজুদ আছে বলে দাবি করেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীও। মোটা চাল কিনা ব্যবসায়ীরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোটা চাল মেশিন দিয়ে কেটে মিনিকেট বানানো হয়। কৃষিমন্ত্রীর এ বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে চাল আমদানিকারক চিত্ত মজুমদার বলেন, ‘আপনার মতো একজন সিনিয়র মন্ত্রীর কাছে আমরা এ ধরনের মন্তব্য আশা করি না। কোথায় এক কোটি টন চাল মজুদ আছে, আমাদের দেখান।’

চালের মজুদ নিয়ে দুই মন্ত্রীর দাবি সঠিক নয় বলে দাবি করেন দিনাজপুরের জহুরা অটো রাইস মিল মালিক আবদুল হান্নান। তিনি বলেন, এক কোটি টন ধান-চালের মজুদ আমাদের কাছে নেই। যদি থাকে তার প্রমাণ আমাদের দেখান। আমরা দেখতে চাই।

নিজেকে সরকারদলীয় সমর্থক পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, আমি মোটা চাল উত্পাদন করি না। তার পরও সরকারি দল করি বলে চারটি মিল অন্য জেলায় ভাড়া করে সরকারকে চাল দিয়েছি। সরকারকে আমি সবচেয়ে বেশি চাল দিয়েছি। প্রতি কেজি চালে আমার ৪ টাকা লোকসান হয়েছে। সাড়ে সাত হাজার টন চাল সরকারকে দেয়ায় আমার লোকসান হয়েছে ২ কোটি টাকা।

এরপর ব্যবসায়ীরা একে একে চালের দাম বাড়ার কারণ বলতে থাকেন। চিত্ত মজুমদার বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে আমি চাল আমদানি করছি। চলতি বছরের শুরুতে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমানোর দাবি করে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। আবার শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেয়ার পরও এক সপ্তাহ পর্যন্ত সীমান্তে আদেশ পৌঁছেনি। অনেক চালবাহী ট্রাক দু-তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করেছে।

চটের ব্যাগ নিয়ে কথা বলেন জয়পুরহাট চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল বারী। তিনি বলেন, একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো দেশেই এটি ব্যবহার হয় না। পাটের বস্তার কারণে প্রতি কেজি চালের দাম এক-দেড় টাকা বেড়ে যায়। অন্য ব্যবসায়ীরাও এ সময় প্লাস্টিকের বস্তায় চাল আমদানি ও পরিবহনের দাবি তোলেন।

চাল সংগ্রহের বিষয়ে আমিনুল বারী বলেন, কৃষিমন্ত্রী যদি বলেন, আমি কৃষকদের ন্যায্য দাম দেব; বাণিজ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী যদি বলেন, আমরা ট্যাক্স কালেকশন করব; খাদ্যমন্ত্রী যদি বলেন, আমি দাম কমাব; পাট প্রতিমন্ত্রী যদি বলেন, আমি পরিবেশ রক্ষা করব, তাহলে কি আপনার প্রকিউরমেন্ট হবে?

সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সোয়া ২ ঘণ্টা আলোচনার পর চাল ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাধা দূর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সঙ্গে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার দু-তিন মাসের জন্য রিল্যাক্স করে দিয়েছি। যেভাবে পারেন চাল আনেন, কেউ বাধা দেবে না।

চালকলগুলোয় অভিযানের বিষয়ে তোফায়েল আহমেদ বলেন, আপনাদের সঙ্গে যেহেতু বৈঠক হলো, তাই আমি সংশ্লিষ্টদের বলছি, এখন যাতে কোনো ব্যবসায়ী হয়রানির শিকার না হন। ভারত থেকে ট্রেনে করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোহনপুর দিয়ে চাল আনার জন্যও পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

এসব পদক্ষেপের ফলে দু-একদিনের মধ্যেই চালের দাম কমতে শুরু করবে বলে জানান বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক একেএম লায়েক আলী। তিনি বলেন, সরকার ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে নিয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই চালের দাম কেজিপ্রতি ২-৩ টাকা কমে যাবে।

সভাটি আগেই হওয়া প্রয়োজন ছিল উল্লেখ করে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রশীদ বলেন, সরকারি গুদামে চাল দিতে দাম একটু বাড়িয়ে দেয়ার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু দাম বাড়ানো হয়নি। আমরা লোকসান দিয়ে হলেও চুক্তির বেশির ভাগ চাল সরবরাহ করেছি। চলতি বোরো মৌসুমের শুরুতে চার মাস চালের দাম বাড়েনি। পরে ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় কেজিপ্রতি ২ টাকা বাড়ানো হয়। মোটা চাল কম উত্পাদন হওয়ায় সেটি এ মুহূর্তে কমা সম্ভব নয়। তবে সরু চালের দাম কয়েক দিনের মধ্যে কেজিপ্রতি ২-৩ টাকা কমে আসবে।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, আমি যখন খাদ্যমন্ত্রী ছিলাম, তখন ভারত থেকে চাল আমদানি করতে গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। মাত্র পাঁচ লাখ টন চাল আনার চুক্তি করেও কোনো চাল আনতে পারিনি। পরে ভিয়েতনাম থেকে এনে সংকট মোকাবেলা করি।

বিভিন্ন স্থানে অভিযান: চালের মজুদবিরোধী অভিযান গতকালও অব্যাহত রাখে প্রশাসন। অবৈধ মজুদের অভিযোগে নাটোরের লালপুরে গতকাল ১০০ টন চাল জব্দ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পাশাপাশি সাতটি গুদাম সিলগালা করা হয়। চাল মজুদের অপরাধে চান্দু মিয়া নামে এক ব্যবসায়ীকে এক বছরের কারাদণ্ডও দেয়া হয় এদিন।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোর্তুজা খান সাংবাদিকদের বলেন, ১৫ টন চাল বিক্রির অনুমতি থাকলেও সাতটি গুদামে ১১৫ টন চাল মজুদ রাখেন চান্দু মিয়া। অবৈধ মজুদের কারণে ১০০ টন চাল জব্দ করা হয়েছে।

এছাড়া নওগাঁয় পাঁচটি চালকলে এদিন অভিযান পরিচালনা করে জেলা টাস্কফোর্স। গতকাল বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। চালকলগুলো হলো— বেলকন গ্রুপের ১ ও ২, নাদিরা, বিএইচ হাইটেক ও জান মোহাম্মদ।

অভিযান শেষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমান বলেন, জেলার চালকলগুলোয় টাস্কফোর্স কমিটি থেকে নজরদারি ও পরিদর্শন করা হয়েছে। সরকারের নীতিমালা অনুসারে চালকলগুলো পরিচালিত হচ্ছে কিনা, মজুদ ঠিক আছে কিনা ও বাজারে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে কিনা, তা দেখা হচ্ছে। পরিদর্শনে পাঁচটি চালকলে ধারণক্ষমতার তুলনায় কম মজুদ পাওয়া গেছে।