আজ শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৭

সদ্য প্রাপ্তঃ

*** ময়মনসিংহে সুটকেসের ভেতর যুবকের লাশ * ঢাবি অধিভুক্ত ৭ কলেজের মাস্টার্স পরীক্ষা স্থগিত * দিনাজপুরে বজ্রপাতে নিহত ৬ * দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে 'সুপার ম্যালেরিয়া' * রিয়ালের পথের ইতি টানতে চান বেনজেমা * মধ্যবাড্ডায় অগ্নিকাণ্ডে মায়ের মৃত্যু, ২ সন্তান দগ্ধ * পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই: বাড়ছে ক্ষোভ, ঝিমিয়ে পড়া

Bangladesh Manobadhikar Foundation

Khan Air Travels

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ১২.১১.২০১৭

বছরে ৩৫ কোটি জোড়া জুতা উৎপাদনের মাধ্যমে বৈশ্বিক ফুটওয়্যার শিল্পের শীর্ষ ১০ উৎপাদনকারীর তালিকায় আগেই

অবস্থান করে নিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে উৎপাদন প্রবৃদ্ধি জোরদারের মাধ্যমে এখন আরো এগিয়ে গেছে দেশের পাদুকা শিল্প। পর্তুগালভিত্তিক জুতা প্রস্তুতকারকদের সংগঠন পর্তুগিজ ফুটওয়্যার, কম্পোনেন্টস, লেদারগুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এপিআইসিসিএপিএস) গত তিন বছরের ফুটওয়্যার ইয়ারবুকে উল্লিখিত উৎপাদন প্রবৃদ্ধির গড় বিবেচনায় শীর্ষ ১০ উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
ফুটওয়্যার শিল্পে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর উৎপাদন, ব্যবহার ও আমদানি-রফতানির তথ্য সংগ্রহের পর তা বিশ্লেষণ করে থাকে এপিআইসিসিএপিএস। এর ভিত্তিতে বৈশ্বিক ফুটওয়্যার শিল্পের গতিবিধির একটা ধারণা দেয় তারা।
এপিআইসিসিএপিএসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী বছরে ২ হাজার ৩০০ কোটি জোড়া জুতা উৎপাদন হয়। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি উৎপাদন করে চীন। তবে ২০১৪ সালের পর থেকে দেশটিতে উৎপাদনের পাশাপাশি উৎপাদন প্রবৃদ্ধিও কমতে শুরু করে। এ সুযোগে বাংলাদেশের উৎপাদকরা নিজেদের অবস্থান আরো সুসংহত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে গত বছরও জুতা উৎপাদনে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বাংলাদেশের। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে এ প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৭ ও ১২ শতাংশ। এ তিন বছরে গড়ে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
২০১৩ সালে চীন জুতা উৎপাদন করে ১ হাজার ৪২০ কোটি জোড়া, যা ২০১৪ সালে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫৭০ কোটি জোড়ায় দাঁড়ায়। কিন্তু পরের বছর উৎপাদন ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যায় দেশটির। ওই বছর ১ হাজার ৩৫৮ কোটি ১০ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করে চীন। এ ধারা অব্যাহত ছিল ২০১৬ সালেও। গত বছর ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমে চীন জুতা উৎপাদন করেছে ১ হাজার ৩১০ কোটি জোড়া। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল— এ তিন বছরের গড় হিসাবে নিলে জুতা উৎপাদনে ২ দশমিক ১ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে চীনের।
অন্যদিকে উৎপাদন বিবেচনায় শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে অষ্টম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি উভয়ই বাড়ছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ২৯ কোটি ৮০ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করে। ২০১৪ সালে এ উৎপাদন ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৩১ কোটি ৫০ লাখ জোড়া হয়। ২০১৫ সালে উৎপাদন ১২ শতাংশ বেড়ে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ জোড়া এবং ২০১৬ সালে ৭ শতাংশ বেড়ে ৩৭ কোটি ৮০ লাখ জোড়ায় দাঁড়ায়।
এপিআইসিসিএপিএসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত জুতা উৎপাদনে গড় প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল তুরস্কের। এ তিন বছরে দেশটি যথাক্রমে ৩২, ৩৫ ও ৫০ কোটি জোড়া জুতা উৎপাদন করেছে। এ সময়ে দেশটির গড় উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
তিন বছরে ১৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দেশটি উৎপাদন করেছে যথাক্রমে ৭২, ১০০ ও ১১১ কোটি জোড়া জুতা।
প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় তৃতীয় অবস্থানে আছে ভিয়েতনাম। ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দেশটির গড় উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এ সময়ে দেশটি উৎপাদন করে যথাক্রমে ৯১, ১১৪ ও ১১৮ কোটি জোড়া জুতা। একইভাবে তিন বছরে গড়ে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ আছে চতুর্থ অবস্থানে। উৎপাদন প্রবৃদ্ধিতে পঞ্চম থেকে দশম অবস্থানে থাকা দেশগুলোর মধ্যে আছে ভারত, পাকিস্তান, ব্রাজিল, মেক্সিকো, চীন ও থাইল্যান্ড।
জুতা উৎপাদন ও রফতানিতে অবদান রাখছে বাংলাদেশের এমন অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান সোনালি আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, জুতার বৈশ্বিক বাজারে প্রধান আধিপত্য চীনের। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অর্ধেকের বেশি বাজার চীনের দখলে আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশটির দখল ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা বাজার দখলে কাঙ্ক্ষিত গতি আনতে পারছি না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু ধীরগতিতে। এ ধীরগতির অন্যতম কারণ এ খাতের সংযোগ শিল্প বা ব্যাকওয়ার্ড-ফরোয়ার্ড ইন্ডাস্ট্রি না থাকা। আবার রেক্সিনের জুতা আমরা উৎপাদন করছি না, যদিও এর বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ছে। আমরা বর্তমানে যে ধরনের জুতা উৎপাদন করছি, সেগুলোয় মূল্য সংযোজনের হার বেশি। এগুলো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে কিনছে। ধীরে হলেও এ খাতের সম্ভাবনা আরো বৃদ্ধি করতে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। পাশাপাশি স্থিতিশীল নীতিসহায়তা ও গ্যাস-বিদ্যুত্সহ সার্বিক ভৌত অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
ফুটওয়্যার শিল্পে স্থানীয় ও রফতানি দুই বাজারেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে বাংলাদেশ। অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় করপোরেটরাও নতুন নতুন ব্র্যান্ড নিয়ে আসছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানি খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সক্ষমতা শ্রমিকের মজুরি। কিন্তু পরিবেশ ও কারখানার কর্মপরিবেশের মানদণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক ভাবধারার পরিবর্তনে শুধু কম মূল্য দিয়ে ক্রয়াদেশ বাড়াতে পারছেন না রফতানিকারকরা। পরিবেশ ও কারখানার কর্মপরিবেশের মান ধরে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদনের বিচারে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে থাকলেও রফতানিকারক হিসেবে অনেকটাই পিছিয়ে বাংলাদেশ।
এপিআইসিসিএপিএসের হিসাবে, উৎপাদনে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে থাকলেও রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ২২তম। আবার আমদানি বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ৭১তম। আর কনজাম্পশন বা জুতার ব্যবহার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। বাংলাদেশের রফতানি করা জুতার ৪২ শতাংশই চামড়াজাত। এছাড়া ৩২ শতাংশ বস্ত্রজাত। বাকি ২৬ শতাংশ রাবার ও প্লাস্টিক থেকে তৈরি জুতা।
সম্ভাবনার বিচারে ফুটওয়্যার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) প্রেসিডেন্ট মো. সায়ফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ফুটওয়্যার শিল্পে শীর্ষ দেশ চীনের প্রবৃদ্ধি দুই থেকে এক অংকে নেমে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। বৈশ্বিক বাজার বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আরো অনেক দেশ আছে। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে শিল্পটিকে আরো টেকসই রূপ দিতে হবে।
জেনিস সুজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এলএফএমইএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট নাসির খান বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে চামড়াজাত ফুটওয়্যার ও অন্যান্য পণ্য থেকে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে আয় হচ্ছে ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ রফতানি আয় পাঁচ গুণ বাড়াতে হবে। উৎপাদন গতি বৃদ্ধি করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর দক্ষতা উদ্যোক্তাদের আছে। সরকারও উদ্যোক্তাদের দক্ষতা কাজে লাগানোর মনোভাব রাখে। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি। মূলত এ দুই কারণে এ খাতের সম্ভাবনা ও উদ্যোক্তাদের দক্ষতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।