Print

লক্সলি হল | উম্মে ফারহানা

বিডিনিউজডেস্ক.কম | তারিখঃ ২০.০৯.২০১৫

ক্লাসে ঢুকেই আমার মনে হলো, সম্ভবত আমার পিরিয়ড শুরু হয়ে গেছে। তখনও নাম ডাকা শুরু করিনি, শুধু নাম ডাকার খাতাটা খুলেছি।

আগে আমি ক্লাসের শেষে নাম ডাকতাম, ইদানীং আগে ডাকি। শুধু এটেনডেন্সের জন্য বসে থাকা অনাগ্রহী ছাত্রদের বিরক্ত চেহারা দেখতে আমার ভালো লাগে না। এটেনডেন্স পেয়ে গেছো বাবা, ক্লাস ভালো না লাগলে চলে যাও, বাইরে গিয়ে আড্ডা দাও, প্রেম করো, রাজনীতি করো, ওয়াইফাই দিয়ে ফেইসবুক করো, যা খুশি করো, আমার মাথা খেও না। আমি গলা ফাটাব ভিক্টোরিয়ান পোয়েট্রি বা হিস্ট্রি অফ ইংল্যান্ড বা আমেরিকান নভেল নিয়ে, গলা ফাটাবার রসদ যোগাড় করতে আগের রাতে তিনটা পর্যন্ত পড়ব আর ছাত্ররা ক্লাসে বসে ঝিমাবে আর এটেনডেন্স পেয়ে গেলেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠবে এই বিষয়টা ভাবতেই আমার খুব রাগ আর ক্ষোভ হয়, নিজের পরিশ্রম আর চেষ্টা তুচ্ছ মনে হয়। আমি মোটামুটি খেটে পড়াই, শুধু আগের রাতে পড়িই না, নেট ঘেঁটে মেটেরিয়াল যোগাড় করি, সেগুলোর প্রিন্টআউট দিই, যাতে ছাত্ররা রামজিলালের গাইড বই থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু কালরাতে আমি ভালো করে পড়তে পারিনি, তাই ক্লাসে ঢোকার আগেই বেশ নার্ভাস লাগছিল। এখন উরুসন্ধি থেকে শুরু করে ইঞ্চি দুয়েক নিচ পর্যন্ত একটা চটচটে অনুভূতি নার্ভাসনেসটাকে আরো বাড়িয়ে দিল। আমি নাম ডাকা শেষ করে বললাম, “সো... উই আর সাপোজড টু রিড অ্যানাদার পো’ম বাই টেনিসন, রাইট? হোয়াট ইজ দ্য টাইটেল অফ দ্য পো’ম?”

নাম ডাকার সময় আমি এটাও লক্ষ্য করেছি যে আরাফাত ক্লাসে নেই। এতে খানিকটা হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। আমার এখন খালি মনে হয় ক্লাসে আরাফাত থাকলে আমার যে হার্টবিট খুব দ্রুত আর জোরালো হয়ে যাচ্ছে সেই শব্দটা বাকি সবাই শুনতে পাবে। আমার আর আরাফাতের মধ্যে যে ‘কিছু একটা’ চলছে সেটাও সকলেই টের পেয়ে যাবে। কে জানে হয়ত এইজন্যেই সে ইদানীং আমার ক্লাসে একেবারেই আসছে না। এটাও একটা সমস্যা। পরে যখন এটেনডেন্সের জন্য ফরম ফিলাপ আটকে যাবে আরেক মুশকিল হবে, এমনিতেই ও একবার ড্রপ খেয়েছে এটেনডেন্সের জন্য। আমি মাথা থেকে আরাফাতের চিন্তা ঝেড়ে ফেলবার জন্য মাথা নেড়ে কথা শুরু করি। ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’...

আশা করছিলাম একটা সমস্বরে উত্তর পাব, “লক্সলি হল।” কিন্তু  উত্তরের বদলে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। আমি অধৈর্য হয়ে বললাম, “হোয়াট’স রং?” সামনের বেঞ্চ থেকে একজন দাঁড়িয়ে বলল, “ম্যা’ম ইউ সেড উই’ল স্টাডি ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’।” তখন আমার মনে পড়ল এটা ভিক্টোরিয়ান পোয়েট্রির ক্লাস নয়, আমেরিকান নভেলের ক্লাস। এই সেমিস্টারে আমার সাহিত্যের কোর্স দুইটাই, আর সেকেন্ড ইয়ারে হিস্ট্রির একটা আছে। এরা ফোর্থ ইয়ারের ব্যাচ, ভিক্টোরিয়ান পোয়েট্রি এদের পড়বার কথা না। আমি বিব্রত হয়ে বললাম, “ওহ, আয়াম সো সরি, আই থট ইউ আর থার্ড ইয়ার।” এটা একটা মিথ্যা কথা। আমি জানি এরা থার্ড ইয়ার না, নাম ডাকার খাতা খোলার সময় আমি থার্ড ইয়ারের পাতাও খুলিনি, এদের রোল নম্বর যেখানে লেখা সেটাই খুলেছিলাম। কিন্তু লক্সলি হল দিয়ে কথা শুরু করলাম কিভাবে সেটাও বুঝলাম না। নাম ডাকার সময় আমি এটাও লক্ষ্য করেছি যে আরাফাত ক্লাসে নেই। এতে খানিকটা হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। আমার এখন খালি মনে হয় ক্লাসে আরাফাত থাকলে আমার যে হার্টবিট খুব দ্রুত আর জোরালো হয়ে যাচ্ছে সেই শব্দটা বাকি সবাই শুনতে পাবে। আমার আর আরাফাতের মধ্যে যে ‘কিছু একটা’ চলছে সেটাও সকলেই টের পেয়ে যাবে। কে জানে হয়ত এইজন্যেই সে ইদানীং আমার ক্লাসে একেবারেই আসছে না। এটাও একটা সমস্যা। পরে যখন এটেনডেন্সের জন্য ফরম ফিলাপ আটকে যাবে আরেক মুশকিল হবে, এমনিতেই ও একবার ড্রপ খেয়েছে এটেনডেন্সের জন্য। আমি মাথা থেকে আরাফাতের চিন্তা ঝেড়ে ফেলবার জন্য মাথা নেড়ে কথা শুরু করি। ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কে কে সেটা বলি, ন্যারেটিভ টেকনিক নিয়ে খানিকক্ষণ কথা বলি, তারপর আবিষ্কার করি যে আমি কথার খেই হারিয়ে ফেলছি। নতুন টেক্সট শুরু করেই ছাত্রদের আলোচনায় জড়ানো যায় না, ওদের কিছুটা পড়া থাকলে না হয় জিজ্ঞেস করা যেত, মতামত জানতে চাওয়া যেত। আমি পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মাথায় ক্লাস শেষ করে বের হয়ে যাই আর থার্ড ইয়ারের ব্যাচকে খুঁজে বের করে বলি আজ আমি ক্লাস নেব না। অথচ আমি লক্সলি হলের ওপর মোটামুটি একটা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, খুব ভালো না হলেও, লেকচার অন্তত দেওয়া যেত। “ইট’স অল অ্যাবাউট আনরিকুইটেড লাভ” দিয়ে শুরু করে আধঘণ্টা কথা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। সাধারণত এইসকল প্রসঙ্গে ছেলেরা আর মেয়েরা দুই দলে ভাগ হয়ে যায়, প্রেমের ক্ষেত্রে মেয়েরা যে স্বার্থপর আর নিষ্ঠুর এই কথা প্রমাণ করতে পুরুষ শিক্ষার্থীরা মরিয়া হয়ে যায়, মেয়েরা আবার উল্টো যুক্তি বের করতে থাকে, আমি বেশ মজা নিয়ে ওদের তর্ক দেখি, বিষয়টা উপভোগই করি। কিন্তু এখন আমার একদমই ভালো লাগছে না। গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে আমি অদ্ভুত এক অশান্তিতে আছি। বিকেলের পর আরাফাত আমার ফোন ধরেনি। অনেকগুলো এসএমএস করেছিলাম, কোনো রিপ্লাইও করেনি। আমি ফোন বের করে সেন্ট মেসেজগুলো দেখি, “হোয়ার আর ইউ? ক্যাম্পাস? হোম? ক্যান উই টক?”, “হোয়াই ডিডন্ট ইউ পিক আপ? আর ইউ বিজি?”, “হোয়াট হ্যাপেন্ড? আর ইউ অ্যাংরি উইথ মি?”, “আর ইউ ওকে?”

“মে আই কাম ইন ম্যা’ম?” আমি ফোন থেকে চোখ তুলে দেখি আরাফাতের ব্যাচের মানে মাস্টার্সের একটা মেয়ে, নাম পিউলি রায়। এই মেয়ের ফেইসবুকের অ্যালবামে ওদের ফার্স্ট ইয়ারের পিকনিকের ছবিতে দেখেছি আরাফাতকে। তখন ওরা একই ব্যাচে ছিল, ছবি দেখেই বোঝা যায় ভালো বন্ধু। ওদের এইসব মজা করা ছবিতে আরেক বিভাগের এক মেয়ে, নাম বিন্দু, বেশ খোঁচা দিয়ে কমেন্ট দেয়, মেয়েটি সম্ভবত আরাফাতের এক্স গার্লফ্রেন্ড। আমি জিজ্ঞেস করলে ও অবশ্য স্বীকার করেনি, উল্টো জিজ্ঞেস করেছে, “গার্লফ্রেন্ড মানে কী?” আমি বলেছি, “গার্লফ্রেন্ড মানে যার সাথে ইমোশনাল ইনভলভমেন্ট থাকে।” “মানে অ্যাফেয়ার?” “হ্যাঁ।” “আমার কখনো অ্যাফেয়ার ছিল না, আর হবেও না।” আমার খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করছিল, “তাহলে আমাদের সম্পর্কটা কী?” জিজ্ঞেস করিনি লজ্জায়, ও যদি আমাদের সম্পর্কটাকে ‘ইমোশনাল ইনভলভমেন্ট’ হিসেবে না দেখে তাহলে আমি কেন সেটা ওর ওপর ইম্পোজ করব?

“ইয়েস, কাম ইন”—আমি পিউলিকে ভেতরে আসতে অনুমতি দিই। “ম্যা’ম, একটা ইনভাইটেশন আছে”—লজ্জা লজ্জা মুখে বিয়ের কার্ড বের করে পিউলি। “ওহ, কংগ্র্যাচুলেশন্স, কবে? বসেন বসেন, দাঁড়ায় আছেন কেন?” “ম্যা’ম আপনাকে কিন্তু আসতেই হবে।” আদুরে ভঙ্গিতে বলে মেয়েটা। আমি কার্ডে ঠিকানা দেখি, বিয়ে হবে টাঙ্গাইলে, ওটা ওর হোম ডিসট্রিক্ট। “এতদূর যাওয়া একটু মুশকিল, আচ্ছা, আমি চেষ্টা করব।” পিউলি আর কিছুক্ষণ জোরাজুরি করে বিয়েতে যাবার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে চায়, বলে “আরাফাতরা তো এখান থেকেই যাবে, আপনি ওদের সঙ্গেই যেতে পারেন।” আমি চমকে উঠি, আরাফাতের যাবার সঙ্গে আমার যাবার কী সম্পর্ক, কেন বলল একথা? তাহলে কি ও কিছু জানে? “আচ্ছা, দেখি”—আমি ওকে আর কথা বাড়াবার সুযোগ না দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াই, “আমাকে একটু পরীক্ষা অফিসে যেতে হবে, বেস্ট অফ লাক।” আমি বিভাগ থেকে বের হয়ে কোয়াটার্সের দিকে যাই, বাংলা বিভাগের কলিগ লাবনী আপার বাসায়। বাথরুমে গিয়ে চেক করি আসলেই পিরিয়ড শুরু হয়েছে কিনা। হয়নি, শুধুই সিক্রেশন। কিন্তু কেন? কাল বিকেলের অর্গ্যাজমের রেশ এখন পর্যন্ত থাকার কথা নয়, কিন্তু কোনো ব্যথা বা ইচিঙও নেই যে এটাকে লিউকোরিয়া ধরে নেব। লিকেজের ভয়ে লাবনী আপার বাসায় গিয়ে ফিরে আসতে আসতে দেরি হয়ে যায়, ট্রান্সপোর্ট অফিসের সামনে এসে দেখি বাস চলে গেছে। ক্যাম্পাসের গেইটে এসে একটা রিকশা নেই। রিকশা কিছুদূর এগোনোর পর আরাফাতের মোটর বাইক চোখে পড়ে, পেছনে বিন্দু বসে আছে, থেমেছে একটা সিগারেটের দোকানের সামনে।

আমাকে আরাফাত বলেছিল ও বিন্দুর সঙ্গে কথা বলে না দু’বছর যাবত, কী একটা বিষয়ে নাকি মনোমালিন্য হয়েছিল, ও সরি বলার পরও বিন্দু রাগ দেখিয়েছে, চিৎকার চেঁচামেচি করেছে, তাই ও আর কথা বাড়ায়নি। “আমাকে লাঠি দিয়া মাথায় একটা বাড়িও দিতে পারো, আমি কিছু মনে করব না, কিন্তু আমার সঙ্গে শাউট করবা না, শাউট করা আমি টলারেট করি না।” ওর এই স্টেটমেন্ট তখন আমার কাছে ওয়ার্নিং মনে হয়েছিল। এখন কি বিন্দু উল্টো সরি বলেছে ওকে? এই জন্যেই কালকে সন্ধ্যা থেকে কোনো রিপ্লাই নেই। বেশ ভালো তো। বিকেলে লাভমেকিঙের পর ও একটা দীর্ঘ স্ট্যাটাস আপডেট পড়তে দিয়েছিল আমাকে, ওর ফোন থেকে, সেক্স বিষয়ক, অনেকগুলো মজার মজার কথার পরে শেষ লাইন হচ্ছে, “আ হাজবেন্ডস জব ইজ টু মেইক হিস ওয়াইফ’স প্যান্টিজ ওয়েট, নট হার আইজ, অ্যান্ড আ ওয়াইফ’স জব ইজ টু মেইক হার হাজব্যান্ড’স ডিক হার্ড, নট হিজ লাইফ।” পড়া শেষ করে আমি বলেছিলাম, “কিন্তু আমরা তো আর হাজব্যান্ড ওয়াইফ না।” ও প্যান্ট পরতে পরতে বলেছিল, “সব কিছুই পার্সোনালি নাও ক্যানো? জোক তো জোকই।” তা ঠিক, সব কিছুই কেন সিরিয়াসলি নিতে হবে, ফান বলেও একটা জিনিস জগতে এক্সিস্ট করে।

এখন আমার প্যান্টি আর চোখ দুটোই ভেজা। আর মাথায় ঘুরছে লক্সলি হলের ওপর না দেওয়া লেকচারের শুরুর কথাটা, “ইট’স অল আবাউট আনরিকুইটেড লাভ”...