Print

গভর্নরের ব্যর্থতা শনাক্ত

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ০৯.০৫.২০১৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের দুটি ব্যর্থতা শনাক্ত করেছে এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি।

চুরি শনাক্তের পর অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ম্যানুয়ালি সমাধানের চেষ্টা করে। এ প্রচেষ্টাকে ভুল হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে নেয়া পদক্ষেপগুলো খুবই দুর্বল ছিল বলে অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে। এতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে প্রাথমিকভাবে কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া গেছে এ তথ্য।
অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গভর্নর ড. আতিউর রহমানের দূরত্ব ছিল। তাদের মধ্যে বোঝাপড়ায় সমস্যার পাশাপাশি বিশ্বস্ততার ঘাটতিও ছিল। অধস্তন কর্মকর্তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে না পারাকে গভর্নরের ব্যর্থতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ৪ ফেব্রুয়ারি রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনা সম্পর্কে জানলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে অবহিত করেননি। তাকে জানানো হয় একদিন পর। পরে জানানোর মাধ্যমে প্রমাণ হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধস্তন কর্মকর্তাদের সঙ্গে গভর্নরের দূরত্ব ছিল। এক মাস গোপন রেখে রিজার্ভ চুরি ঘটনা অর্থমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন বিষয়টি অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার বিষয়টিকে গভর্নরের গাফিলতি হিসেবে শনাক্ত করেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এ প্রসঙ্গে রিপোর্টে বলা হয়, যদিও গভর্নর বিষয়টি একটি এসএমএসের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছিলেন। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ অর্থমন্ত্রীকে সঙ্গে সঙ্গে না জানানোর কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। এটি এক ধরনের গাফিলতি। প্রযুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হলেও এ প্রতিবেদনে সে সম্পর্কে তেমন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। এতে কারিগরি বা প্রযুক্তির চেয়ে প্রশাসনিক বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি সরকারের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট জমা দিয়েছে ২০ এপ্রিল। এ মাসের শেষ নাগাদ তারা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেশ করবে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রোববার নিজ কার্যালয়ে বসে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, রিজার্ভ চুরি সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট আশা করি এ মাসের মধ্যে পাওয়া যাবে। রিপোর্ট পাওয়ার পর বিচার-বিশ্লেষণ করে সরকার বলতে পারবে এ ঘটনার জন্য কেউ দায়ী ছিল কিনা। তিনি আরও বলেন, পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পাওয়ার পর তা জাতীয় সংসদে প্রকাশ করার পরিকল্পনা আছে। তদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশের পর ফিলিপাইন চাইলে দেয়ার সম্ভাবনা আছে।
রিপোর্টে বলা হয়, ‘সুইফট’ মেসেজিং সিস্টেমের মাধ্যমে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরি হয়। এ সিস্টেম ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে রিজার্ভ চুরির অর্থ ফিলিপাইনে স্থানান্তর করা হয়। এ ঘটনার নেপথ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাফিলতির দিকটি উঠে এসেছে কমিটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে। প্রযুক্তি সংক্রান্ত ত্রুটির বিষয় খুব বেশি প্রকাশ পায়নি রিপোর্টে। তদন্তে প্রশাসনিক ব্যর্থতার দিকে জোর দেয়া হয়েছে। প্রায় তিন পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনের বড় অংশে প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয়টি স্থান পেয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টে প্রযুক্তিগত ত্রুটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের সম্ভাবনা আছে বলে জানা গেছে।
ফেডারেল ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয় ৪ ফেব্রুয়ারি। এ ঘটনার এক মাস পর জানতে পারেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এরপর ১৫ মার্চ এ ঘটনা তদন্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক বিভাগ প্রতিষ্ঠান তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে। কমিটির অপর দু’সদস্য হচ্ছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস। কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন এবং ৭৫ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে পেমেন্ট ইন্সট্রাকশন কিভাবে ও কার বরাবর গেছে তা খতিয়ে দেখছে কমিটি। এছাড়া অবৈধ পরিশোধ ঠেকাতে ব্যাংকের নেয়া পদক্ষেপ পর্যাপ্ত ছিল কিনা, রিজার্ভ চুরি বিষয়টি সরকারের কাছে গোপন রাখার কারণ ও যৌক্তিকতারও অনুসন্ধান করেছে। এছাড়া চুরির ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা এবং দায়িত্বের অবহেলা ছিল কিনা সে বিষয়টিও পরীক্ষা করে দেখেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টে আরও বলা হয়, রিজার্ভ চুরির ঘটনার একদিন পর শুক্রবার সরকারি ছুটি ছিল। দ্বিতীয় দিন শনিবারও ছুটির কারণে বন্ধ থাকায় তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। শুক্র ও শনিবার বন্ধ থাকায় এ ঘটনার ব্যাপারে সমস্যা হয়।
অন্তর্বর্তী রিপোর্ট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রিজার্ভ চুরির সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির প্রধান বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন রোববার যুগান্তরকে বলেন, রিপোর্ট সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করতে পারব না। তবে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট নির্ধারিত সময়ের আগেই দেয়া হবে। এরপর সরকার সিদ্ধান্ত নেবে এ রিপোর্ট প্রকাশ করবে নাকি প্রকাশ করার অনুমতি আমাদেও দেবে। তবে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।