Print

ভারতের চাল আসছে, বাম্পার ফলনেও কৃষকের সর্বনাশ

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ১৫.০৫.২০১৬

চলছে বোরো ধান কাটার মৌসুম।

সারাদেশে ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। এক মণ ধান উৎপাদনে প্রায় ৬শ’ টাকা খরচ হলেও এলাকা ভেদে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা থেকে ৪২০ টাকা ধরে। অথচ সরকার প্রতি মণ ধানের মূল্য বেঁধে দিয়েছে ৯শ’ ২০ টাকা। সরকার কৃষিবান্ধব প্রমাণের জন্য এ খবর মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারও করা হচ্ছে।
বাস্তবতা হলো কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করছে না গুদামগুলো। বাধ্য হয়েই ধান বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি মণ ধানে ২শ’ থেকে আড়াইশ’ টাকা লোকসান গুণছে কৃষক। এলাকা ভেদে দেড় মণ থেকে ৩ মণ ধানের দরে এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। ধানে কৃষকের সর্বনাশ এখন ‘টক অফ দ্য কান্ট্রি’। গ্রামের হাট-বাজারগুলোতে একই আলোচনা ধানের মূল্যই কৃষকের সর্বনাশ করছে। অনেক কৃষকের পথে বসার উপকৃম হয়েছে। অথচ ভরা মৌসুমে ভারত থেকে চাল আমদানি চলছেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধান উৎপাদন ব্যাপক হওয়ার পরও চলতি মাসেও ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়েছে। হিলিস্থল বন্দর দিয়েই ২০১৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে ভারত থেকে ৩২ হাজার ৮৬৩ মেট্রিক টন চাল আমদানি করা হয়েছে। অন্যান্য স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে কি পরিমাণ চাল এসেছে তা অবশ্য জানা যায়নি।
চলতি মাসেও ভারত থেকে শত শত টন চাল আমদানি করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের ঘোষণা দিলেও সেটা কার্যত কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রতি কেজি ধানের দাম ২৩ টাকা করে প্রতি মণ ধান ৯২০ টাকায় ক্রয়ের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সরকারি দলের নেতাদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের উদ্দেশ্যে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান নিচ্ছে না।
বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফরিয়া ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাসীন দলের হোমরা-চোমরাদের সঙ্গে সরকারি খাদ্য গুদামের কর্মকর্মা-কর্মচারীরা সিন্ডিকেট করেছেন। এখন কৃষকের কাছ থেকে যে ধান ৪শ’ টাকায় ফরিয়ারা কিনছে কয়েকদিন পর সে ধান ৯২০ টাকা মণ দরে জেলা-উপজেলা খাদ্যগুদামে তোলা হবে। অথচ সরকার প্রচার করছে ৫ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা হবে।
আমাদের জেলা প্রতিনিধিরা জানান, যে দু’এক যায়গায় ধান ক্রয় করা হচ্ছে তা ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকেই নেয়া হচ্ছে। কৃষকরা জানান, সার-কীটনাশক ও ডিজেলসহ অন্য সব কৃষি সামগ্রীর দাম ঊর্ধ্বমুখী। ধান রোপণ করা থেকে কাটা পর্যন্ত মজুরের মজুরিও বেড়েছে। ধান কাটতে একজন মজুর এলাকা ভেদে ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকা মজুরি নেয়।
এ ছাড়াও দাদন ব্যবসায়ী-এনজিওসহ বিভিন্ন ব্যাক্তির কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ দিয়ে ধান চাষ করায় উৎপাদন খবর পড়েছে বেশি। অথচ সরকারি গুদাম কৃষককের কাছ থেকে ক্রয় না করায় সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে অর্ধেক দামে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নেই বাজার তদারকি
নতুন বোরো ধান পুরাদমে বাজারে উঠলেও নেই বাজার তদারকি। চলছে পাইকার ও ফড়িয়াদের সীমাহীন দাপট। চাষিদের বস্তা হচ্ছে টানাটানি। উপযুক্ত দাম পাচ্ছে না কৃষক। এ ব্যাপারে নেই ন্যূনতম পদক্ষেপ। সরকারের সংগ্রহ অভিযান শুরু হলেও কৃষকের কোনো উপকারে আসছে না। হঠাৎ ধানের মূল্য এতটা কম হবে তা কেউ কল্পনাও করেনি। সেচ, সারসহ উপকরণের দাম বেশী হওয়ায় বোরো আবাদে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেশী হয় বলে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চাষিদের উৎপাদন খরচ উঠছে না। এই চিত্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের।
যশোরের শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নের কৃষক মো. আলম জানান, কিছুদিন আগেও বাংলামতি ধান বিক্রি হয়েছে প্রতিমণ ৯৫০ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৮শ’ টাকায়। মোটা ধানের দাম আরো কম। যশোরের ডাকাতিয়া গ্রামের বোরো চাষি আব্দুল মান্নানসহ বেশ কয়েকজন চাষি জানালেন, ধান ভিজা, নরম, চিটার ভাগ বেশী এমন নানা অজুহাতে দাম কমিয়ে দিচ্ছে পাইকাররা। আড়তদার ও চাতাল মালিকরা সিন্ডিকেট করে দাম নির্ধারণ করছে। কৃষিজাত পণ্যের বিক্রয়মূল্য তদারকির ব্যাপারে আইনও আছে। কিন্তু প্রয়োগ নেই।
সূত্র জানায়, আইনটি হচ্ছে, ১৯৬৪ সালের এগ্রিকালচারাল প্রডিউস মার্কেটস রেগুলেশন এ্যাক্ট ও ১৯৮৫ সালের সংশোধিত বাজার নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৬(১) ও ১৬(২) ধারামতে কৃষিজাত ও ভোগ্যপণ্যের ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য ও মজুদ পরিস্থিতির তদারকির ক্ষমতা রয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জেলা বাজার কর্মকর্তাদের। কিন্তু বাস্তবে এ অঞ্চলের কোন জেলাতে কখনোই বাজার কর্মকর্তাদের তৎপরতা লক্ষ করা যায় না বলে ক্ষতিগ্রস্তদের বিস্তর অভিযোগ।

রাজশাহীতে মন ভালো নেই কৃষকের
রাজশাহী অঞ্চলের মাঠে মাঠে আবাদকারীদের এখন বোরো ধান কাটা আর মাড়াইয়ের চিত্র সহজে নজরে পড়ে। আবহাওয়া মোটামুটি অনুকূল থাকায় এবার আবাদ ভাল হয়েছে। তবে শেষদিকে খরতাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে ফসল বাঁচাতে বেশী সেচ দিতে গিয়ে উৎপাদন খরচের পাল্লা আরেকটু ভারী হয়েছে।
কৃষকরা জানান, বোরো রোপণের আগ দিয়ে বীজতলা প্রায় প্রতিবছর কোল্ড ইনজুরিতে পড়ে নষ্ট হয়। এবার তেমনটি হয়নি। বরং বৃষ্টি হওয়ায় জমিতে ভাল জো এসেছে। এতে করে আবাদ ভাল হয়েছে। যদিও ঘাম ঝরিয়ে টাকা খরচ করে ধান ফলানোর পর উৎপাদন মূল্য না পাবার কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর সে কারনে কৃষক ধান আবাদ বাদ দিয়ে অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছে, ফলে বোরো আবাদের জমি যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে উৎপাদনও।
রাজশাহী কৃষি বিভাগ জানায়, এবার বোরো আবাদের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয় ৬৯ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে। আবাদ হয়েছে ৬৬ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার মে. টন। আবহাওয়া মোটামুটি অনুকূল থাকায় ফলন ভাল হয়েছে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ। বোরোর উৎপাদন ভাল হওয়ায় কৃষি বিভাগ তৃপ্তির ঢেকুর উঠালেও কাক্সিক্ষত দাম না পাবার কারনে কৃষকের মনে রয়েছে অতৃপ্তি।
মাঠ পর্য্যায়ের কৃষকদের সাথে আলাপকালে তারা জানান গতবারের চেয়ে এবার ফলন ভাল হয়েছে। ভাগ্যগুনে বিঘা প্রতি গড়ে আঠারো থেকে কুড়ি মন ধান পাচ্ছেন। ফলন ভাল কিন্তু দাম নিয়ে হতাশ। বর্তমান এখানকার হাট বাজার গুলোয় মান ভেঙ্গে ধান বিক্রি হচ্ছে ছয়শো হতে সাতশো টাকা মনের মধ্যে। এ দামে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ ওঠানো যাচ্ছে না। এরপর এখনো ধান মাঠে রয়েছে। ধানকাটা শ্রমিকের সংকটের কারণে দ্রুত ধান কেটে ঘরে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বেড়েছে ধান টাকা শ্রমিকের মজুরী। ফলে উৎপাদকদের আরো ব্যয় বাড়ছে। বৈশাখজুড়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যাবার পর এখন আবার শুরু হয়েছে ঝড়বৃষ্টি। যাদের ফসল এখন মাঠে আছে তারা বেশ দুশ্চিন্তায়। এরমধ্যে বজ্রপাতের ভয় তাড়া করে ফিরছে মাঠে ধান কাটা শ্রমিকদের। ইতোপূর্বে এ কারণে অনেকে মারধরের শিকার হয়েছেন। এখন দায়িত্ব পালনে মানসম্মান ঠিক রাখা দায় হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রামে হতাশ কৃষক
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ধান বিক্রি করে লাভ নয়, লোকসানের বোঝা মাথায় উঠছে। সেচ, সার, বীজ, কীটনাশকসহ আবাদ খরচই উঠছে না। কৃষি শ্রমিকের মজুরি গুনতে হচ্ছে নিজের পকেট থেকে। প্রতিমণ ধানে একশ থেকে দেড়শ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনছে কৃষকেরা। আঙ্গিনায় পড়ে থাকা সোনালী বোরোর ধান এখন কৃষাণ-কৃষাণীর গলার ফাঁস। সরকারি উদ্যোগে কৃষক পর্যায়ে ধান সংগ্রহের ঘোষণা এলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি। এতে করে কৃষকেরা হতাশ। এদিকে দাম না পেয়ে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে কৃষকরা। এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। বোরোর বদলে সয়াবিন ও শাকসবজি এবং ডাল আবাদ করেছে প্রান্তিক চাষীরা। আবার অনেক এলাকায় মাইলের পর জমি পতিত পড়ে থাকছে। বার বার লোকসানের মুখে ধান আবাদে কৃষকদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলার প্রবণতাকে কৃষি খাতের বিশিষ্টজনরা অশনি সংকেত মনে করছেন।
তারা বলছেন, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে প্রধান খাদ্য ভাতের এই দেশে খাদ্য নিরাপত্তাই হুমকির মুখে পড়বে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম আঞ্চলিক অফিসের তথ্যমতে এবার চট্টগ্রামসহ এই অঞ্চলের ৫ জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৩২ হাজার ৩২০ হেক্টর। আর শেষ পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৯১০ হেক্টরে। গত কয়েক বছর থেকে প্রতিবছরই বোরোর আবাদ কমে আসছে। হলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি। ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে কিন্তু খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে সংগ্রহ অভিযান শুরু করা যায়নি। এতে করে বাজারে ধানের দাম দিনে দিনে নি¤œমুখী হচ্ছে। সরকার যেখানে ২৩ টাকা করে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছে সেখানে বৃহস্পতিবার বাজারে প্রতি কেজি ধানের দাম ছিল ১৭ থেকে ১৬ টাকা। কৃষকরা বলছেন, প্রতিবছর খাদ্য বিভাগ ধান, চাল সংগ্রহ করেন। কিন্তু কৃষক পর্যায় থেকে না করে চালকল মালিকদের কাছ থেকে ধান, চাল সংগ্রহ করায় এর সুফল পুরোটাই মিল মালিকেরা পেয়ে থাকে। মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে বাজারে ধান, চালের দাম কমিয়ে দেয়। আর চাষীরা বাধ্য হয়ে তাদের কাছে কম দামে লোকসানে ধান বিক্রি করে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে চাষীরা আবাদের আগ্রহ হারাবেন বলে জানান প্রান্তিক চাষীরা।

দিনাজপুরে কৃষকের চোখে পানি
ইরি-বোরো ধান নিয়ে কৃষকেরা চরম বিপাকে পড়েছে। বেশী মূল্যে বীজ-সারসহ কৃষি উপকরণ ক্রয় করে বোরো আবাদের পর শেষ মুহূর্তে বিদ্যুতের বেহাল অবস্থায় সেচের যোগান দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে কৃষকেরা। সবশেষে ধান কাটার পর বাজারে তুলে মাথায় হাত পড়েছে। এক বস্তা ধান ৯০০ টাকায় বিক্রি করে চোখের পানি ফেলা ছাড়া কোন উপায় থাকছে না কৃষকদের। এর উপর শুরু হয়েছে শিলা বৃষ্টি। গত কয়েকদিনের শিলা বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়ায় একরের পর একর জমির ধান ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে গেছে। বাজারে ইরি-বোরো ধান উঠছে শুরু করেছে। পারিজাতের ধান ৯০০ টাকা, ২৮ জাতের ধান এক হাজার থেকে ১১০০ টাকা বস্তা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি বস্তায় ধান থাকে ৮০ কেজি। ৯০০ টাকা বস্তা হিসাবে বিক্রি করলে এক কেজি ধানের দাম পড়ে ১১ টাকা ২৫ পয়সা।
কৃষকদের অভিযোগ এই দামে ধান বিক্রি করে তাদের উৎপাদন খরচও উঠবে না। সেচ, সার, বিষ এবং ধান কাটা ও মাড়াইয়ে যে খরচ তা যোগাতে হয়েছে কর্জ-মাহাজন করে। দাদনের টাকা ফেরত আর জোতদারের অংশ দিয়ে প্রকৃত কৃষকের ঘর শূন্য হয়ে পড়ে। বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এখনও পুরোদমে ধান কেনা-বেচা শুরু হয়নি। যারা এখন ধান বিক্রি করছে তারা মূলত প্রান্তিক চাষি। ধানে পাক ধরা মাত্রই কেটে-মেড়ে বাজারে নিয়ে আসছে বিক্রির জন্য।
কারন ইরি-বোরো আবাদ শেষে এখন দেনাদারের চাপ আর সাংসারিক খরচ যোগাতে ধান বিক্রি ছাড়া কোন পথ নেই। ফলে শুকানোর পর প্রতি বস্তায় ৭ থেকে ৮ কেজি ওজন কমে যাবে। ফলে বাম্পার ফলনের দাবীদার কৃষকেরা বাম্পার লোকসানের মুখে পড়ছে এটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে।

বগুড়ায় হতাশ কৃষক
জেলায় বোরো ধান কাটা-মাড়াই এখন শেষের পথে। চাষীদের ঘরে ঘরে এখন ধান কাটা-মাড়াই এর ব্যস্ততা। কিন্তু বাজারে ধানের মূল্য খুব কম থাকায় কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
এখন পর্যন্ত বগুড়ায় সরকারিভাবে ধান-চাল ক্রয় শুরু হয়নি। ফলে ধানের বাজারে কাক্সিক্ষত দাম না থাকায় কৃষকদের মধ্যে হতাশাও বাড়ছে। উত্তরাঞ্চলের মধ্যে বগুড়া খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত জেলা হিসাবে পরিচিত। এবার বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে আবাদ এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ লাখ ৪৩ মেট্রিক টন ধান। অনুকূল আবহাওয়া ও সার, বীজ এবং সেচ ব্যবস্থা ঠিক থাকায় আবাদ ভাল হয়েছে। তবে ফলন ভালো হলেও কৃষকের মুখে হাসি ফুটছে না। বাজারে ধানের দাম কম থাকায় উৎপাদন খরচও মিলছে না বলে কৃষকদের অভিযোগ।
এছাড়া ধান কাটা-মাড়াইয়ে শ্রমিক স্বল্পতা নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। ফলে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে। প্রতিবিঘা ধান কাটতে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা লাগছে, গত বছরে এর অর্ধেক মূল্যে কাটা-মাড়াই সম্ভব হয়েছিল। বাধ্য হয়ে কৃষকরা ঋণ করে ধান কাটা-মাড়াই করছে। তবে মজুরি বেশি পাওয়ায় খুশি ধান কাটা শ্রমিকরা।

সিলেটে কৃষকের মাথায় হাত
শীলাবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে এবার সিলেটে বোরো ধানের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। ধানের দাম কম পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। সিলেটের একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সিলেট বিভাগে এ বছর বোরো ধান আবাদ করা হয় ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৬ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় আবাদ হয়েছে ৭৯ হাজার ৫৪৫ হেক্টরে। কৃষকরা জানিয়েছেন, তারা ধান মাড়াই ও শুকিয়ে ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এবছর ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে ধানের কিছু ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়াও বাজারে ধানের দাম নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন জেলার কৃষকেরা। বর্তমানে যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে, তাতে উৎপাদন খরচই উঠবে না কৃষকের। বাজারে বর্তমানে মণ প্রতি ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকা থেকে সাড়ে ৫৫০ টাকা। অথচ মণ প্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হওয়ায় লোকসান দিতে হচ্ছে মণ প্রতি দেড়শ থেকে তিনশ টাকা। সেই সাথে ধানকাটা শ্রমিক না পাওয়ায় বেশি মুজুরি দেওয়ায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে কৃষকদের।
সিলেটের মুন্সিবাজার এলাকার কৃষক ফয়জুল ইসলাম বলেন, ধান চাষ করলেও এতে কোনো লাভ নেই। বাজারে ধানের যে দাম পাচ্ছি তা দিয়ে খরচও উঠবে না। এক বিঘা জমিতে চাষ করতে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চারা ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা, জমি লাগাতে ১ হাজার ৫০০ টাকা, সার ৩ হাজার টাকা, ডিজেল ২ হাজার, কাটতে ৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলেয়ে ধান বিক্রি করে লোকসান দিতে হচ্ছে। একাই এলাকার কৃষক নিজাম উদ্দিন ধান বিক্রি করতে সাহস পাচ্ছেন না জানিয়ে বলেন, বাজারে যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে সে দরে বিক্রি করলে লোকসান দিতে হবে।

সিরাজগঞ্জে হাসি নেই কৃষকের
সিরাজগঞ্জ জেলার ৯টি উপজেলার ১১টি থানায় ইরি-বোরো মৌসুমি ধান কাটা ও মাড়াই চলছে। ঋণগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের ঘাম ঝরানো ফসল যাচ্ছে মহাজনের গোলায়। অপরদিকে নতুন ধানের দরপতন, শ্রমিকের মূল্য বেশি, শ্রমিক সংকট, ঝড়বৃষ্টির আশঙ্কায় কাঁচাপাকা ধান কাটা প্রভৃতি নানাবিধ প্রতিকূল পরিবেশের কারণে এবার কৃষকদের মুখে হাসি নেই। দুঃখের আগুনে পুড়ছেন তারা।
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জসহ চলনবিল অঞ্চলে ইরি-বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও নানাবিধ সমস্যার কারণে কৃষকদের মুখে নেই হাসির ঝিলিক। প্রান্তিক কৃষকরা ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিল। তাদের ঋণ পরিশোধ করতে সব ফসল চলে যাচ্ছে মহাজনদের গোলায়। ধানের দাম কমে যাওয়া, শ্রমিকের সংকট ও শ্রমের মূল্য বেশি, অভাবের কারণে আগাম কাঁচাপাকা ধান কাটা প্রভৃতি নানাবিধ কারণে কৃষকদের এবার লোকসান গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে এক মণ ধানের মূল্য ও একজন দিনমজুরের (কামলা) দিন হাজিরা সমপরিমাণ হওয়ায় কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন।
গত মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে জেলার সর্বত্র ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হওয়ায় কামলা সংকট ও মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়ও শ্রমিক মিলছে না। কারণ সম্পর্কে স্থানীয় কৃষকরা জানান, অসহ্য গরম, লু-হাওয়ায় মাঠে যেমন কাজ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে, তেমনি দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় যে কোনো মুহূর্তে ঝড় ও প্রচ- শীলা বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে মনে করে অনেক কৃষকই ক্ষেতের কাঁচাপাকা ধান আগাম কাটার জন্য শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে।
সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে ধানের দাম কম হওয়ায় হতাশায় ভুগছে কৃষককূল। কৃষির প্রতি অনীহা বাড়ছে তাদের। চলনবিল জনপদের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষের জীবিকা কৃষিনির্ভর। তাদের একমাত্র ফসল বোরো ধান। তাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে খরচ পড়েছে ২২ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে জমি সেচ, বীজ বোনা, সার দেয়া ও শ্রমিকের মজুরিসহ বিভিন্ন ধরনের খরচ রয়েছে। আর ধান কাটানো থেকে গোলায় উঠানো পর্যন্ত প্রতি একরে আরও খরচ পড়েছে ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা অর্থাৎ ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে দাম পাচ্ছে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ফলে প্রতি বিঘায় লোকসান হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। কৃষকভেদে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। কোনো কোনো কৃষক এক থেকে দুই বিঘা বা তার চেয়ে কম জমিতে ধান চাষ করেছেন। এদের মধ্যে অনেকেরই একমাত্র সম্বল এই একটি ফসল। ফসল ফলিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় তারা এখন স্বাভাবিকভাবেই জীবন-জীবিকার তাগিদে ভিন্ন পথ খোঁজা শুরু করে দিচ্ছেন।
এদিকে বিপাকে পড়েছেন বর্গা চাষিরা। জমির মালিককে ভাগ দেয়ার পর তাদের তেমন কিছুই থাকছে না। এদের মধ্যে যারা মহাজনের ঋণ নিয়েছেন তাদের ফসল মহাজনের গোলায় চলে যাচ্ছে। আব্দুল মালেক নামে এক বর্গা চাষী জানান, চিন্তা করছি, সামনে আর ধান ক্ষেত করব না। ক্ষেত ছেড়ে দেব। ক্ষোভের সাথে তিনি আরও জানান, এবার বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি থেকে ইরি-বোরো ধান রক্ষা হলেও রক্ষা হচ্ছে না চাতাল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগী মহাজনদের কাছ থেকে। হাটবাজারে ধান উঠলেও ক্রেতা না থাকায় বিক্রি না হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে চাতাল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগী মহাজনরা।
অপরদিকে আব্দুল লতিফ জানান, গত বছর ধান কাটতে প্রতি একরে খরচ পড়েছে দুই হাজার টাকা, চলতি বছর খরচ হচ্ছে ৪ হাজার টাকা। শ্রমিকের মজুরি ৫০০ টাকা আর ধানের মণ ৪০০ টাকা। এক মণ ধান বিক্রি করে ১ কেজি ইলিশ মাছ কেনা যায় না। এ দুঃখ রাখার জায়গা কোথায়?