আজ বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৭

সদ্য প্রাপ্তঃ

*** ময়মনসিংহে সুটকেসের ভেতর যুবকের লাশ * ঢাবি অধিভুক্ত ৭ কলেজের মাস্টার্স পরীক্ষা স্থগিত * দিনাজপুরে বজ্রপাতে নিহত ৬ * দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে 'সুপার ম্যালেরিয়া' * রিয়ালের পথের ইতি টানতে চান বেনজেমা * মধ্যবাড্ডায় অগ্নিকাণ্ডে মায়ের মৃত্যু, ২ সন্তান দগ্ধ * পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই: বাড়ছে ক্ষোভ, ঝিমিয়ে পড়া

Bangladesh Manobadhikar Foundation

Khan Air Travels

মহাসড়ক নির্মাণ ব্যয়ে শীর্ষে বাংলাদেশ

জাতীয় ডেস্ক | তারিখঃ ১৪.১০.২০১৬

লাগামহীন কমিশন বাণিজ্যের কারণে বিশ্বে মহাসড়ক নির্মাণ ব্যয়ে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বাংলাদেশে শ্রমিকের মজুরি কম থাকার পরও গত ১১ বছরে মহাসড়ক নির্মাণ খাতে নির্মাণ ব্যয় ২৫ গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে নতুন চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় গড়ে সাড়ে ১০ কোটি টাকা। চীনে এক কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণে গড় ব্যয় ১০ কোটি টাকা। ইউরোপে কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় ২৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ছয়টি চার লেন প্রকল্পের কিলোমিটারপ্রতি গড় নির্মাণ ব্যয় ৫৪ কোটি টাকা। তার মধ্যে সর্বশেষ নেয়া ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়কের নির্মাণ ব্যয় কিলোমিটারে ঠেকেছে ১২২ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়।

বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশের মহাসড়কের মান এশিয়ার যেকোনো দেশের তুলনায় নিচে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের মহাসড়ক আছে মাত্র ১ শতাংশ।

সূত্র মতে, বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে প্রকল্প ঝুলিয়ে প্রতি অর্থবছরেই মহাসড়কের নির্মাণ ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প নেয়ার আগেই বেশি ব্যয় প্রাক্কলন করা হচ্ছে। এর নেপথ্যে রয়েছে কমিশন বাণিজ্য। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে চলছে কমিশন বাণিজ্য।

আবার প্রকল্প ঝুলিয়ে রেখে বলা হয়, নির্মাণসামগ্রীর দাম, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় ও পরামর্শকের ভাতা বাড়ছে, তাই বাড়াতে হবে ব্যয়। যেমন প্রকল্প অনুমোদনের এক মাসের মাথায় ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন প্রকল্পে আরো ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে জমির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে।

অথচ ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ সম্প্রসারণ করা হলেও কোথাও দেবে গেছে, কোথাও ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়েছে। তবে মহাসড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সওজ অধিদপ্তর বলছে, মহাসড়ক আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হালকা যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস লেন, উড়াল সড়ক কিংবা ফুট ওভারব্রিজ রেখে নতুন নকশায় নির্মাণ করতে গিয়ে নতুন নতুন মহাসড়ক নির্মাণে ব্যয় বাড়ছে।

 সওজ অধিদপ্তরের অধীন বিলের ওপর নির্মাণ করা দেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের মহাসড়ক বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক ২০০৫ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। তারপর মানসম্পন্ন মহাসড়ক নির্মানের উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে পড়ে। ২০০৫ সালে ওই মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছিল পাঁচ কোটি টাকা। এখন ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেনে কিলোমিটারে খরচ পড়ছে ১২২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

এ ক্ষেত্রে ১১ বছরে ব্যয় বেড়েছে ২৫ গুণ পর্যন্ত। অথচ বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কেও হালকা যানবাহনের জন্য পৃথক সার্ভিস লেন তৈরি করা হয়েছিল। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা, জয়দেবপুর-এলেঙ্গা, হাটিকুমরুল-রংপুর, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ এই চার লেন প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ছয়টি চার লেন প্রকল্পে কিলোমিটারে গড়ে ব্যয় পড়ছে ৫৪ কোটি টাকা।

বিশ্বে সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ ব্যয়-সংক্রান্ত বিভিন্ন দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের সঙ্গে বাংলাদেশে নেয়া প্রকল্পগুলোর উন্নয়ন প্রকল্প ছকের (ডিপিপি) তথ্য তুলনা করে উচ্চ ব্যয়ের বিষয়টি ধরা পড়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের গবেষণা অনুযায়ী, দেশে মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি গড় ব্যয় হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ছয় কোটি টাকা, দুই লেনের মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় হবে বড় জোর ১২ কোটি টাকা। উড়াল সড়ক বা ফুট ওভারব্রিজ ও অন্যান্য সুবিধাসহ নির্মাণে কিলোমিটারে ২২ থেকে ২৪ কোটি টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়।

বুয়েটের অধ্যাপক, অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, ১১ বছর আগে যেখানে কিলোমিটারে পাঁচ কোটি টাকা খরচ হয়েছে সেখানে একই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বাড়তে পারে না। প্রকল্প ব্যয় তদারক করার যে ব্যবস্থাপনা আছে তা দুর্বল। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রস্তাবিত ব্যয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাই স্বাধীন তৃতীয় সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়া যায়। অনেক সময় রাজনৈতিক চাপেও খরচ বাড়ানো হয়।

গ্রিসের ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব এথেন্সের অধ্যাপক দিমিত্রিয়স স্যামবুলাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খরচ হয় গড়ে ২৯ কোটি টাকা। ৪০টি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের দেশের মহাসড়ক নির্মাণের ব্যয় বিশ্লেষণ করে তৈরি করা প্রতিবেদনে অক্সফোর্ড, কলম্বিয়া ও গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে, এসব দেশে নতুন চার লেন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে ১৭ কোটি টাকা।

ভারতের ২০১২-১৭ সালের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে দেশে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারে খরচ পড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ কোটি টাকা। চীনের ১২তম (২০১০-১৫) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, সে দেশে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে গড়ে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। দুই লেনের মহাসড়ক চার লেন করতে কিলোমিটারে খরচ পড়ছে প্রায় ১০ কোটি টাকা।

কেন এভাবে প্রকল্প ব্যয় বাড়ছে, সে ব্যাপারে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক বলেন, ‘আমরা মহাসড়কগুলোর কাঠামো ও সুবিধা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে চাইছি। এ জন্য নতুন মহাসড়কে আলাদা সার্ভিস লেন ছাড়াও পথচারী পারাপারের সেতু রাখা হবে ইন্টারসেকশনগুলোতে। ভূমি অধিগ্রহণেও ব্যয় বাড়ছে। আমরা ব্যয় যুক্তিযুক্ত করার ওপর এখন থেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মাওনা উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে এ মহাসড়ক প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে।’

এদিকে বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন-২০১৫ থেকে জানা গেছে, সড়ক অবকাঠামোর মানের দিক থেকে এশিয়ার সব দেশের তুলনায় নিচে বাংলাদেশের অবস্থান। বিশ্বের ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৯তম স্থানে। সড়ক অবকাঠামো সূচকে ১০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ২.৯, ভারতের ৩.৮, চীনের ৪.৬, পাকিস্তানের ৩.৮ ও শ্রীলঙ্কার স্কোর ৫.১।