মুদ্রণ

বিডিনিউজডেস্ক.কম| তারিখঃ ১৫.০৬.২০১৯

 

হারুকি মুরাকামি জাপান তথা বিশ্বের অন্যতম সেরা লেখক। সম্প্রতি তার লেখা প্রথম উপন্যাস ‘ Hear the Wind Sing’

এর চার দশক পূর্তি হল। আর এই লেখালেখি নিয়ে সম্প্রতি জাপানের প্রভাবশালী বার্তা সংস্থা কিয়েদো নিউজকে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সেই সাক্ষাতকারটির কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরছেন এস এম নাদিম মাহমুদ।

মুরাকামি: ঠিক চল্লিশ বছর আগে মে মাসে ‘নবীন লেখক’ হিসেবে আমি গুয়াংজু পুরস্কার পেয়েছিলাম। আমার মনে পড়ে ওই অনুষ্ঠানের দিনটি ছিল ৮ মে। যেটি টোকিও শিমবাশি শহরের দাইচি হোটেলে আয়োজন করা হয়েছিল।

সাংবাদিক: আপনি পেশাদার লেখক হিসেবে ৪০ বছর পার করলেন। এমনকি জাপানের অন্যতম সেরা উপন্যাসিক নাসুমে সোসেকি যার লেখালেখির স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১০ বছর। এটি কি আপনার কাছে স্মরণীয় অর্জন নয় কী?

মুরাকামি: প্রতি দশ বছর আমার কাছে সন্ধিক্ষণ ছিল। এবং এই সময়ে আমার লেখার ধরণ ও গল্পগুলোর পরিবর্তন হয়েছে। আমি লেখালেখি করতে গিয়ে কখনো বিরক্ত হই না। আমার কাছে সব সময় নতুন লক্ষ্য ছিল। যেটাকে আমি খুব ভাল দিকই মনে করি।

সাংবাদিক: সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় বের হয়েছে যে আপনি ‘কিলিং কমান্ডাটর’ জাপানি ভাষায় কিশিডানচো গোরোশি’ নামে একটি উপন্যাস লিখছেন। এই বিষয়ে যদি একটু বিস্তারিত বলতেন।

মুরাকামি: আমার কাছে প্রথম যে জিনিসটি ছিল তাহলো এর শিরোনাম। যদিও সেটি মোজার্ট অপেরার ‘ডন জিওভান্নি’ থেকে এসেছে এরপর এই শিরোনামটি আমার কাছে অদ্ভুতভাবে আকর্ষন করেছে এমনকি এই শব্দটি আমার কাছে এক ধরনের অনুরেণন তৈরি করছে। আমি সত্যি বিষ্মিত যে জাপানে বসে এই ধরনের একটি গল্প লিখতে পারবো। আর এই ধারনা থেকে এই উপন্যাসের সূচনা হয়েছিল।

সাংবাদিক: তার মানে দাঁড়ায় এই উপন্যাসটির জন্ম হয়েছে কেবল শিরোনাম থেকে?

মুরাকামি: একটি সৈকতের ঘটনা দিয়ে লেখালেখি গল্পটি শুরু হয়েছে। প্রথমে আমি গল্পের শিরোনাম ঠিক করে নিয়েছিলাম এরপর আমি ঠিক করি কিভাবে কোন গল্পটি লেখা যায়। তারপর লেখা শুরু করি। যে কারণে এটি লিখতে অনেক সময় লেগেছে। আমি মনে করি সম্ভবত আমার ‘নরজিয়ান উড’ উপন্যাসে কোন গল্পই ছিল না। যেটি লেখার শেষ পর্যন্ত কোন শিরোনামই ছিল না।

সাংবাদিক: আমি মনে করি নরজিয়ান উডের জন্য ‘দি গার্ডেন ইন দি রেইন’ শিরোনামটিই মানানসই ছিল…

মুরাকামি: আমি খুবই চিন্তত ছিলাম যে যদি আমি আঠার শতকের উয়েদা আকিনারির ‘নিসেনো ইনশি’ কোন ঘটনা যদি ‘কিলিং কমেন্ডাটর’ যুক্ত করতে পারতাম।
সাংবাদিক: আপনি কি ‘হারুসামে মোনোগাতারি (টেলস অব দি স্প্রিং রেইন’) নিয়ে কথা বলছেন নাকি? যেখানে বৌদ্ধরা সন্ন্যাসীরা মৃত্যুর পর মমি (সোকুশিসবুসু) করে রাখায় নিজেদের জীবিত মনে করতো।

মুরাকামি: আমি তহকু অঞ্চলে ঘুরতে গিয়ে অনেক মমি দেখেছি। আমি সম্ভবত কিয়েতোর কোন এক বইয়ের দোকানে একটি বই দেখেছিলাম যেখানে বলা ছিল কিভাবে মমি তৈরি করা হয়।

সাংবাদিক: সম্ভবত ‘অগুসু মনোগাতারি’ (টেলস অব মুনলাইট আন্ড রেই) তে উয়েদার যে গল্প ছিল সেটি আপনার চন্দ্রাকৃত সৈকতের গল্প’ থাকছে কী?

মুরাকামি: আমি আকিনারির ‘নিসেনো ইনশি’ গল্পকে খুব পছন্দ করি। যেখানে সন্ন্যাসীরা নিজেরাই নিজেদের মমি তৈরি করে রাখতো। উয়েদা আকিনারি সেই সময়ের একটি বিকৃত গল্পই লিখেছিল। যেটি কখনো অসাধারণ গল্প ছিল না।

সাংবাদিক: হুম, তাই নাকি।

মুরাকামি: আমার বাবার বাড়ি ছিল কিয়েতোর একটি বৌদ্ধ মন্দিরের স্কুলের পাশে। যখন তিনি মারা গিয়েছিলেন তখন এই বৌদ্ধ মন্দিরের স্কুল থেকে এক পুরোহিত বৌদ্ধসূত্র পাঠ করেছিলেন। আমি সেই পুরোহিতকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি কী আকিনারি মমিটি দেখাতে পারবেন কী না। আমি যখন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন তিনি ওই ঘটনা আমাকে বলতে পারবেন না, তখন তিনি বললেন, আকিনারি একজন ছিদ্রন্বেষী ছিলেন।

সাংবাদিক: এটি সত্যি একটি মুগ্ধকর গল্প ছিল।

মুরাকামি: আর এই মন্দিরটি কিন্তু দেখভাল করতো এই আকিনারিই।

সাংবাদিক: তার অর্থ দাঁড়ায় ‘কিলিং কমেন্ডাটর’ এবং আকিনারির ‘নিসেনো ইনিশি’ এর মধ্যে কিছুটা মিল রয়েছে। আর কিলিং কমেন্ডাটরের মূল চরিত্রকে দেখা যাবে যিনি একটি বাড়িতে গর্ত খুড়তেছেন তার অতীত দেখবার জন্য। তাই নয় কী?

মুরাকামি: আমার এই গল্প শুরু হয়েছিল অনেকটা প্রাকৃতিকভাবে সচেতন কিংবা অবচেতন মনে। সচেতন মনের গভীর উপত্যকায় গিয়ে আমরা দেখি কদর্য পৃথিবীর অন্ধকার কিছু সৃষ্টিকে। আর এই অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসতে আমরা চূড়ান্তভাবে আমাদের অর্ন্তদৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকি তাই নয় কী? এর বাহিরে আমাদের কোন উপায় থাকে না আর সর্বশেষে আমরা আমাদের অদৃষ্টের কাছে নিজেরা সমর্পণ করি। আমরা কেবল যুক্তির উপর নির্ভর করতে পারি না, কারন সেটা যদি করি তাহলে তা হবে ভয়ানক। একজন রাখালই কেবল একটি বন্য ভেড়ার সাথে পাল্লা দিতে পারে।

সাংবাদিক: আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে কমেন্ডাটর দেখার অপেক্ষায় রয়েছি। ৬০ সেন্টিমিটারের বইটি দেখতে নিশ্চয় ভালই হবে।

মুরাকামি: যদি বইটি বড় হতো, তাহলে তার সাথে কাজ করা আমার জন্য কঠিনই হতো এবং এক সময় সেটি দৈত্যকার হয়ে যেত। যদিও এখন এটি ছোট তবে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য যথেষ্ট। যদিও আমাদের সবকিছুই তুলনামূলক ভাবে ছোট।

সাংবাদিক: আর কমেন্ডাটর নিজেকে একজন কাল্পনিক বিশ্বাস বলেই মনে করতো।

মুরাকামি: তা ঠিক বলেছেন। কিন্তু আমি মনে করি না যে কমেন্ডাটর কেবল একটি ধারনামাত্র। আমি এটি লেখার পর বুঝতে পারলাম যে, কমেন্ডাটর মূখ্য চরিত্র হয়ে গেছে, যে কিনা বিভিন্ন সময় রুপ পরিবর্তন করেছে। সে সম্ভবত একটি আয়না যার প্রতিচ্ছ্ববিতে বিভিন্ন চরিত্র ফুটে উঠেছে। শুধু তাই নয়, তার সাথে অতীতের বিভিন্ন বার্তাবাহকের সাথে যোগাযোগও রয়েছে। যাইহোক, আমি জানি না, কোনটি সঠিক হবে, তবে আমার ধারনা পাঠক তা ঠিকই বের করতে পারবে।

সাংবাদিক: আপনি আপনার লেখায় এটাও বলেছেন, যে একটি নিরপেক্ষ ধারনামাত্র।

মুরাকামি: আমি তা বলবো না, সে (কমেন্ডাটর) ভাল না মন্দ। তবে আমি বিশ্বাস করি, সে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণকারী এবং তা লোকজনের কাছে অদৃশ্যমান কখনো হয়নি। যে তাকে দেখতে চাইবে, কেবল তার কাছেই সে দৃশ্যমান হবে।

সাংবাদিক: তাহলে বইটি প্রথমে জাপানি ভাষায় আসছে আর পরে তা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হবে?

মুরাকামি: আমি মনে করি, কমেন্ডাটরকে সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকা সত্ত্বে আদিম জাপানের পোষাকে দেখা যাবে। যদিও আমি লেখা চালিয়ে যাচ্ছি, তবে আমার চেষ্টা থাকবে যে এটি কিভাবে এই সাংঘর্ষিক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।