আজ বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সদ্য প্রাপ্তঃ

*** সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ হত্যা মামলায় আপিল বিভাগের রায় ১০ অক্টোবর * বন্যায় টাঙ্গাইলে সেতুর সংযোগ সড়কে ধস; উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার রেলযোগাযোগ বন্ধ * রাজারবাগে এক নারী কনস্টেবলকে ধর্ষণের অভিযোগে তার এক সহকর্মী গ্রেপ্তার * কোটালীপাড়ায় হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ফায়ারিং স্কোয়াডে ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় * সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ হত্যা মামলায় আপিল বিভাগের রায় ১০ অক্টোবর * বন্যায় টাঙ্গাইলে সেতুর সংযোগ সড়কে ধস; উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার রেলযোগাযোগ বন্ধ * রাজারবাগে এক নারী কনস্টেবলকে ধর্ষণের অভিযোগে তার এক সহকর্মী গ্রেপ্তার * কোটালীপাড়ায় হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ফায়ারিং স্কোয়াডে ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়

Bangladesh Manobadhikar Foundation

Khan Air Travels

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ২১.০৮.২০১৭

সিধু নামে এক গ্রামে এক কৃষক বাস করতো। তার ছিল দুটি বলদ। জাবিলা ও জাতিয়া।

সিধু এদেরকে খুব ভালোবাসতো। আর যত্নের কোন ত্রুটিও করতো না। তবে ভালোবাসলেও চাষের সময় লাঠি দিয়ে এদের পিঠে আঘাত করতো। একদিন সকালে বলদ দুটি নিয়ে সে ক্ষেতে গেলো। তাদের গলায় বাঁধলো লাঙ্গল-জোয়াল। আর ‘বাবাবাহ... হুটহুট...’ বলে তাড়া দিল। বলল, ‘চল চল... হে এ এ জাবিলা হে হে এ... জাতিয়া.... হে হে এ এ.. জলদি করে। এটা শেষ করে এর পর অন্য জমি চাষ করতে যাবো। জলদি না করলে কেমনে হবে। হুম... বাবাবা... হেইইই...।’

কিন্তু কী জানি কী হল। বলদ দুটো মানুষের মতো কথা বলতে আরম্ভ করল। এমন কখনো ঘটেনি। জাতিয়া বলল, ‘তুমি সব সময় আমাদের দিয়ে কাজ করাও। কাজ করাও ভাল কথা, কিন্তু আমাদের কেন ভালমতো খাওয়াও না? তুমি আমাদেরকে তোমার ঐ লাঠি দিয়ে পেটাও আর আমাদেরকে বাধ্য করো অতিরিক্ত কাজে। আমরা এত কাজ কিভাবে করব, আমাদের তো শক্তি থাকতে হবে, নাকি?’

সিধু এদিক ওদিক তাকাল। না, আশেপাশে তো কেউ নেই! এই রকম কথা কে বলল? ‘ধুর...কী আবল তাবল ভাবছি! নিজের মাথায় কি গোণ্ডগোল দেখা দিয়েছে?’ এই বলে সে জাবিলার লেজ ধরে একটা ঘুরান দিয়ে বলল, ‘বাবাবাহ... হুটহুট...’। কয়েক পাক ঘুরে সে এবার জাতিয়ার লেজ ধরে দিল ঘুরান। বলল, ‘বাবাবাহ... হুটহুট... চল চল, জলদি শেষ কর। আজ তোদের ভাল খাওয়াবো জলদি কাজ শেষ করলে।’

‘ওহ! অসহ্য! কেন তুমি এইভাবে আমার লেজ ধরে ঘুরাচ্ছ। বল কী করতে হবে! করি। বলদ বলে কি আমাদের জীবন নেই?’– এই শুনে সিধু থমকে গেল। সে এবার সত্যি খেয়াল করলো বলদ কথা বলছে। সে বলল, ‘জাতিয়া! তুই কি কথা বলছিস!’

জবাব এল, ‘হ্যাঁ। কেন? একজনের জীবন থাকলে আর একটা মুখ থাকলে সে কি কথা বলে না, নাকি?’

এবার সিধু সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। যেন দ্রুত লাঙ্গলের হাতল থেকে হাত সরিয়ে নিল। হাত থেকে লাঠিটি খসে পড়ল। ভয়ে সে কাঁপতে থাকল। সে তাজ্জব হয়ে গেল। জাতিয়া কী আসলেই বলদ? নাকি মানুষ! একটা বলদ কিভাবে কথা বলতে পারে। সে ভাবে নিশ্চয়ই এ এক জাদুটাদু কিছু হবে।

‘তুমি ঠিকই ধারণা করেছ। আমি এক জাদুর বলদ। কিন্তু আমি তোমার কোনই ক্ষতি করবো না। তোমার কিসে মঙ্গল আমি সব বলে দিব। মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোন। তুমি হবে ধনী লোক যদি যা বলি তা কর।’ জাতিয়া যেন মনের কথাও বুঝতে পারে। সিধু নিজের অজন্তেই ভয় পাচ্ছিল। কারণ জাতিয়ার মুখ ছিল বন্ধ আর খুব শান্তভাবেই জাতিয়া সিধুর দিকে তাকাচ্ছিল। কিভাবে এটা কথা বলবে! এটা তার কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছিল। সে নিজেকে বলল, ‘আমি কি এসব স্বপ্নে দেখছি!’ কিন্তু পর মুহূর্তে ধনী হবার লালসা তাকে পেয়ে বসল। সে বলল, ‘বল, জাতিয়া, কী করতে হবে আমাকে!’ জাতিয়া বলল, ‘দিব্যি দিতে হবে যে এই কথা কাউকেই বলা যাবে না। তবেই আমি তোমাকে বলব।’

‘এই মাটি ছুঁয়ে দিব্যি করছি, এই কথা তুই আর আমি ছাড়া কেউ জানবে না।’– সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল সিধু। জাতিয়া বলল, ‘আমার গলায় লাঙ্গল-জোয়াল বাঁধবে না। তবে জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ মঙ্গলবার প্রাতঃকালে আমাকে দিয়ে অল্প সময় জমি চাষ করবে। তারপর তাতে তুমি যা-ই বুনো তা সোনা হয়ে ফলবে। আর তুমি হবে ধনী। কিন্তু মনে রেখ, শর্ত ভঙ্গ করলে তুমি সর্বস্ব হারাবে। পথের ফকির হয়ে যাবে তুমি।’

সিধু চাষবাস বন্ধ করে দিল বলদের কথায়। সে বলদ দুটোকে মাঠে নিয়ে যায়, ঘাস খাওয়ানো হলে বাড়ি ফিরে আসে। ব্যাপারটা সিধুর বৌ কমলার চোখে পড়ে। এমনি একদিন বেলা গড়ানোর আগেই সিধু বাড়ি এসে হাজির। কমলা গিয়েছিল পুকুর ঘাটে স্নান করতে। স্নান সেরে ঘরে আসতেই দেখে সিধু বারান্দায় বসে। সে ভাবে তার স্বামী কি দিন দিন অলস হয়ে যাচ্ছে! কমলা স্বামীর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে কড় কড় করে উঠল, 'এ, তোমার সমস্যা কী! আজকাল সকাল সকাল বাড়ি ফের? সবাই ক্ষেতের কাজে কত ব্যস্ত! আর তুমি কি না বাড়ি এসে বারান্দায় ঝিমাচ্ছো?' সিধু বলল, 'কমলা, রাগছো কেন। আমার শরীর খারাপ লাগছে, আর খুব ক্ষুধাও লেগেছে। জলদি কিছু খেতে দাও।'

বৌ বলে কথা। যতই রাগ-গোস্বা করুক, স্বামীর জন্যই তো পরাণ পোড়ে। কমলা কিছুটা ভীত হয়ে বললো, 'ওগো, সত্যি করে বল, কী হয়েছে তোমার!'

'না, তেমন কিছুই না। আমার এমনি কাজ করতে মন চাচ্ছে না। শরীর খারাপ লাগছে। বোধ হয় জ্বর এসেছে।'– বলল সিধু। সে কমলার কাছ থেকে সব লুকানোর চেষ্টা করল। কমলা স্বামীর কপালে হাত দিয়ে বলল, 'কৈ! না তো! কোন জ্বর নেই। কাল সন্ধ্যায় কিছুই খাওনি তুমি। সে জন্যই তুমি দুর্বলতা বোধ করছো। ঘরে আসো, ভাত দেই।'

এক বাটি পান্তা ভাত সামনে দিতেই একবারেই সব সাবার করে দিল সিধু।

পরদিন সকালে সিধু বলদ দুটো মাঠে নিয়ে গেল। জাতিয়াকে বলল, 'চল জাতিয়া, তোকে আর মারবো না, তুই তো সবই বুঝিস।' জাবিলাকে বলল, ' নে, চল জাবিলা, তুই দৈনিক ঘণ্টাখানেক কাজ করবি।' জাবিলা কিছুই বুঝলো না, সে আগের মতোই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এভাবে দৈনিক ঘণ্টাখানেক কাজ করতো সিধু। অনেকটা না করার মতোই, লোক দেখানো। সে কেবল জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ মঙ্গলবারের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে দিন গুণতে থাকল।

আর জাতিয়ার জন্য সিধুর আদর সোহাগ বেড়ে গেল। যেন ভালোবাসা উছলে পড়ছে। সকাল-সন্ধ্যায় জাতিয়াকে পুজো করা আরম্ভ করল সে। স্ত্রী কমলা মোটেই বুঝলো না তার স্বামী কী করছে এসব! স্বামীর এহেন উন্নতির কী হেতু? তার মনে প্রশ্ন জাগলো কেন তার স্বামী জাতিয়াকে এত সম্মান করছে? জাবিলার সাথেও কেন একই আচরণ করছে না সে? কমলা কৌতূহল সংবরণ করতে পারল না। সিধুকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন তুমি দৈনিক জাতিয়াকে গড় করে প্রণাম করছ? আগের মত আর মাঠেও যাচ্ছ না। চাষবাস করছ না। জমির সব তো অনাবাদিই পড়ে রইল। কেমন করে চলবে এই সংসার, সারাটা বছর? সামনে বর্ষার মাস!’

‘শোন কমলা, এই জাতিয়া হল দেবতার বাহন। যদি একে গড় করে প্রণাম করি তবেই দেবতা মুখ তুলে চাইবে। আর দেবতা মুখ তুলে যদি একবার আমাদের দিকে চায় তবেই তো আমরা সুখে থাকব। নাকি?’

কমল এই আধ্যাত্মিক কথাবার্তা বোঝে না। বিরক্ত হয়ে বলে, ‘হয়েছে। ঢের হয়েছে। কর তোমার যা খুশি।’ এই বলে সে কপালে হাত দিয়ে বারান্দার খুঁটিতে গা ঠেকনা দিয়ে বসে রইল।

শেষ পর্যন্ত জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ মঙ্গলবার এল। সিধু সকাল না হতেই লাঙ্গল নিয়ে চলে গেল মাঠে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মাঠের অর্ধেকটা চাষ করে ফেলে সে। কিছু ধান বুনে সে বাড়ি চলে আসে। এর কিছুদিন পর সে কমলাকে নিয়ে মাঠে যায়। সে দেখে মাঠ ভর্তি ধান। যেই সে ধানে হাত দেয় দেখে সব সোনা হয়ে যাচ্ছে। এই দেখে কমলা বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে সিধুর থেকে সহসা সরে দাঁড়ায়। এক বিচিত্র বিস্ময়ে তার মুখ হা হয়ে যায় আর মনের অজান্তেই মুখে কাপড় চেপে চোখ বড় বড় করে তাকায় কমলা। সিধু জিজ্ঞেস করে, ‘কী হল! এমন করে সরে দাঁড়ালে কেন? এতো দেবতার আশির্বাদ। কালক্ষেপণ কর না, জলদি এগুলো তুলে বাড়ি নিয়ে চল। কেউ দেখে ফেললে কিন্তু সব বর্বাদ হয়ে যাবে। গ্রামের লোকেরা সব ছিনিয়ে নিবে।’ তারা জলদি করে সোনার দানাগুলো বাড়ি নিয়ে গেল। সিধু ধনী হয়ে গেল আর সুখেই দিন কাটাতে থাকল। কিন্তু কমলার কৌতূহল আর যায় না। সে ভাবতেই পারিনি তাদের কষ্টের দিন কাটবে, তারা কোন দিন ধনী হবে। কমলা যত ভাবে ততই শিহরিত হয়ে ওঠে। কি করে হলো এমনসব!

সেদিন বেলাশেষে সিধু আর কমলা দিনের সমস্ত কাজ শেষে বিশ্রাম নিচ্ছিল। কমলার মনে সমস্ত প্রশ্ন আর কৌতূহল যেন খচর খচর করছিল। রাতের খাবার খেয়ে তারা যখন শুতে গেল কমলা তখন স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরল। অভিমানের সুরে বলল, ‘তুমি আমার কাছে কিছু লুকোচ্ছ। সত্যি করে বল, কেন তুমি প্রতিদিন জাতিয়াকে গড় করে প্রণাম করতে? কেন তুমি মাঠে আর আগের মত কাজ করলে না? এর মধ্যে কী এমন ঘটলো যে আমার এত সোনার মালিক হলাম? সত্যি বলবে, নইলে আমি বাপের বাড়ি চলে যাব। আর সাথে অর্ধেকটা সম্পত্তিও।’

সিধু পড়ল উভয় সঙ্কটে। কিন্তু সে বুঝল সত্য না বললে কমলা ছাড়বে না। সে যে নাছড়বান্দা আর জেদি, যা বলেছে তাই করে বসতে একটুও ভাববে না। তখন কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরুবে। তাই সে বলল, ‘শোন কমলা, আছে একটা বিষয়। কিন্তু তা বলতে পারব না। যদি বলি তো আমরা আগের মত গরিব হয়ে যাব। পথে বসে যাব। বল তুমি কি তাই চাও!’ কিন্তু কমলার এ কথা বিশ্বাস হয় না। তার এক কথা। তাকে বলতেই হবে ভেতরের সত্য। সে বলল, ‘তুমি আমায় ভালোবাস না। তাই বলতে চাও না। আমার কাছে লুকোচ্ছ।’ একগাদা অভিমানী কথা বলে সে কড় কড় করতে তাকল। এত পীড়াপীড়ি করতে থাকল শেষমেষ সিধুর থেকে সমস্তটা শুনেই সে থামল।

ঐ রাতে সিধু স্বপ্ন দেখল জাতিয়া তাকে বলছে, ‘সিধু, তুমি তোমার কথা রাখলে না। তুমি শপথ ভাঙলে। এর ফল তোমাকে ভোগ করতেই হবে। আর আমি তো তোমায় ধনী হওয়ার কথা রেখেছিলাম। যেন রাখ, আমি কখনো মিথ্যা বলি না। তুমি শীঘ্রই নিঃস্ব হয়ে যাবে। আর আমিও তোমায় ছেড়ে যাব, আমাকে কোথাও খুঁজেও পাবে না।’

স্বপ্ন দেখার পরই সিধুর ঘুম ভেঙে গেল। তখন ভোর আভা ফুটে উঠেছে। সে দৌড়ে গোয়াল ঘরে যেতেই দেখল জাতিয়া নেই। জাবিলা একা নির্বিঘ্নে ঘুমাচ্ছে। সিধু বিলাপ করতে করতে বের হয়ে এল। কমলা দৌড়ে এল। দৌড়ে ঘরে গিয়ে সোনার দানার পাত্রে হাত দিয়ে দেখল সোনার দানাগুলো নেই। সিধু হাঁটু গেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। কমলাও বিলাপ করে কাঁদল। তারা সব হারালো কমলার একগুয়েমির জন্য। কমলার অনুশোচনা হল কিন্তু তাতে আর কী হবে, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। (চলবে- প্রতি বৃহস্পতিবার)