আজ শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৭

সদ্য প্রাপ্তঃ

*** ময়মনসিংহে সুটকেসের ভেতর যুবকের লাশ * ঢাবি অধিভুক্ত ৭ কলেজের মাস্টার্স পরীক্ষা স্থগিত * দিনাজপুরে বজ্রপাতে নিহত ৬ * দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে 'সুপার ম্যালেরিয়া' * রিয়ালের পথের ইতি টানতে চান বেনজেমা * মধ্যবাড্ডায় অগ্নিকাণ্ডে মায়ের মৃত্যু, ২ সন্তান দগ্ধ * পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই: বাড়ছে ক্ষোভ, ঝিমিয়ে পড়া

Bangladesh Manobadhikar Foundation

Khan Air Travels

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ০৬.১১.২০১৭

ফিলিপ রথ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক। তিনি ইহুদি বংশোদ্ভূত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালের সবচেয়ে শক্তিশালী মার্কিন লেখকদের মাঝে তাকে গণ্য করা হয়। তার ১৯৬৯ সালের উপন্যাস পোর্টনয়'জ কম্প্লেইন্ট ব্যাপক পাঠক জনপ্রিয়তা লাভ করে।২০০৬ সালের মে মাসে নিউ ইয়র্ক টাইম্‌স্‌ পত্রিকা বিগত ২৫ বছরের সেরা মার্কিন উপন্যাসের একটি তালিকা তৈরি করে। মোট ২২টি উপন্যাসের মধ্যে ৬টি উপন্যাসই ছিল ফিলিপ রথের লেখা।
‘প্রথমে মুখ খেলার জন্য তুমিই তাহলে আসল লোক? তো সব সময় তুমি কি কথা দিয়ে শুরু করো?’ ইটজি বলল।

ওজি বলল, ‘আমি এটি কখনো করিনি। না করি নি।’

‘তুমি কীভাবে যিশুর ব্যাপারে যত্নবান হয়ে কথা বল?’

‘ আমি কখনো যিশুকে নিয়ে বিশেষ কিছু করি না। সে করেছিলো। আমি জানিই না সে কী বিষয়ে কথা বলছিল। সে কথা চালিয়ে যাচ্ছিল। যিশু হলো ঐতিহাসিক- যিশু হলো ঐতিহাসিক।’ ওজি রাব্বি বাইন্ডারের বিশেষ কথাভঙ্গি নকল করে বলল।

‘যিশু তোমার আমার মতো সাধারণ মানুষের জীবন যাপন করতো। আর বাইন্ডার সেই কথাই বলেছিলো। ওজি বলতে থাকে।

‘হ্যাঁ? তাতে কি! তিনি জীবিত বা মৃত হলে আমি কী দুই সেন্ট দেবো? এবং তখন তুমি তোমার মুখ খুলবে?’ ইটজি লেবারম্যান কৌশলে ওজির মুখ খুলতে চাচ্ছিল। বিশেষ করে ওজিকে নানা প্রশ্ন করে সে এই সুযোগটি নিতে চাইল। ওজির প্রশ্ন করার সময় মিসেস ফ্রিডম্যান দু’বার রাব্বি বাইন্ডারকে দেখেছেন। আর এই বুধবার চারটে ত্রিশে তৃতীয়বার দেখা হতে পারে। ইটজি চায় তার মা ঘরকন্নার কাজে ব্যস্ত থাকুক বিশেষ করে তার সাথে যার সাবলেট থাকে তাদের সাথে নানা খুটিনাটি বিষয় নিয়ে সময় কাটাক।

‘যিশু, তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত মানুষ। তবে ইশ্বরের মতো নন। এবং আমরা বিশ্বাস করি না তিনি ইশ্বর।’ ওজি ধীরে ধীরে ইটজির কাছে রাব্বির অবস্থান ব্যাখ্যা করো। আর ইটজি গত বিকেলের হিব্রু ক্লাসে অনুপস্থিত ছিলো।

‘ক্যাথলিকরা বিশ্বাস করে যে যিশু হলো ইশ্বর’ ইটজি বলল। সে অবশ্য ক্যাথলিক শব্দটি বৃহত্তর পটভূমি থেকে বলে যেখানে প্রোটেস্ট্যান্টরাও অন্তর্ভূক্ত। ওজি ইটজির কথা শুনে তার ছোট্ট মাথা নাড়াল যেন সে ইটজির কথায় ফুটনোট দিচ্ছে।ওজি বলল, তার মা ছিলো মেরি আর সম্ভবত তার বাবা ছিলো জোসেফ। তবে নিউ টেস্টামেন্ট বলে তার বাবা ছিলেন ঈশ্বর।

‘ তার প্রকৃত পিতা?’

‘হ্যাঁ। এটা বড় ব্যাপার যে ইশ্বরকে তার বাবা মনে করা হয়।’ ওজি বলল।

‘মূর্খ।’

‘এটাই রাব্বি বাইন্ডার বলেছিল যা আসলে অসম্ভব।’

‘সত্যি এটা অসম্ভব। এটা আগাগোড়া বানোয়াট। একটি শিশু পেতে হলে তোমাকে কারো সাথে বিছানায় যেতে হবে। মেরিও গিয়েছিল।’ ইটজি ব্যাখ্যা দিল।

‘এটাই বাইন্ডার বলেছিল। একটি সন্তান পাবার জন্য একজন নারীকে একজন পুরুষের সাথে মিলিত হতে হবে।’

‘তিনি এটা বলেছিলেন? ওজি?’ কিছুক্ষণের জন্য ইটজি ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নকে পাশ কাটালো। ‘তিনি এই সহবাসের কথা বলেছিলেন?’ ইটজির মুখের নিচের অংশের দিকে একটি বাঁকা হাসি হালকা গোলাপি গোঁফের মতো উদয় হচ্ছিল। ‘তুমি বা তোমরা তখন হাসছিলে? না অন্য কিছু করছিলে?’

‘আমি আমার হাত উঁচু করেছিলাম।’

‘হু, তো কী বলেছিলে?’

‘তখন আমি প্রশ্ন করেছিলাম।’

ইটজির চোখ জ্বলে উঠল। ‘সহবাস নিয়ে প্রশ্ন করেছিলে?’

‘না, আমি প্রশ্ন করেছিলাম ঈশ্বরকে নিয়ে। আমি বলেছিলাম কীভাবে তিনি স্বর্গ নরক ছয় দিনে সৃষ্টি করলেন আর সমস্ত প্রাণিকুল, মাছ এবং আলো। মাত্র ছয় দিনে। বিশেষ করে আলো যা আমাদের আলোকিত করে। কীভাবে তিনি আলো তৈরি করলেন? প্রাণি মাছ- খুব সুন্দর।’

‘হ্যাঁ এগুলো অবশ্যই সুন্দর’ ইটজির প্রশংসাসুচক কথার মধ্যে সত্যতা ছিলো তবে কল্পনা যুক্ত ছিলো না। ঈশ্বর এমন যে তিনি একটি টোকা দিয়ে সব কিছু সৃষ্টি করেছেন।

‘তবে আলো তৈরি- আমার মনে হয় তুমি এ নিয়ে চিন্তা করেছ এটা বিশেষ একটি ব্যাপার।’ ওজি বলল। ‘যাহোক, আমি বাইন্ডারকে প্রশ্ন করেছিলাম যে তিনি তো ছয় দিনে সব তৈরি করতে পারেন এবং তিনি ছয়টি দিন বেছে নিয়েছেন ঠিক মতো। তবে তিনি সহবাস ছাড়া কেন একজন নারীকে সন্তান দিতে পারবেন না ‘

‘ওজি! তুমি বাইন্ডারকে সহবাসের কথাটি বললে?’

‘হ্যাঁ।’

‘একদম ক্লাসের মধ্যে?’

‘হ্যাঁ।’

ইটজি তার নিজের মাথার একপাশে সজোরে চড় মারলো।

‘আমি বলছি, কোনো বাচ্চা আশেপাশে ছিলো না। আর কর্মচারি বা কর্মকর্তারা থাকা না থাকা তো কোনো ব্যাপার না।’ ওজি বলল।

ইটজি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, ‘তো বাইন্ডার কী বললেন?’

‘তিনি আবার গোড়া থেকে শুরু করলেন। আবার ব্যাখ্যা দিলেন যিশু কেনো ঐতিহাসিক। তিনিও তোমার আমার মতো। তিনি ঈশ্বর নন। তবে আমি বুঝলাম আমি যা জানতে চাই তা অন্য জিনিস।’

ওজি যা জানতে চাইতো তা আলাদা। প্রথম দিকে সে রাব্বি বাইন্ডডারের কাছে জানতে চেয়েছিলো যে, তিনি কীভাবে ইহুদিদের ডাকেন ‘নির্বাচিত মানুষ’ হিসেবে যদি স্বাধীনতার ঘোষণায় বলা হয়ে থাকে যে সব মানুষকে সমানভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। রাব্বি বাইন্ডার রাজনৈতিক সমতা ও আধ্যাত্মিকতার বৈধতার পার্থক্য বোঝাতে চেয়েছিলেন। তবে ওজির জানার বিষয় ছিলো অন্য। সে জানার জন্য খুব অস্থির ছিলো। এবং সেই সময়ে প্রথম তার মা তার এই সব বিষয়ে ঢুকে পড়েছিলো।

এই সময় একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিলো। লা গাওরদিয়ায় সেই বিমান দূর্ঘটনায় আটান্ন জন মানুষ মারা যায়। সংবাদপত্র আহত নিহতের যে তালিকা করেছিলো তার থেকে তার মা আটজন (তার নানী সংখ্যাটি নয় বলেছিলো কারণ সে মিলারকে ইহুদি নাম হিসেবে ধরেছিলো) ইহুদির নাম সনাক্ত করেছিলো এবং ইহুদিরা মারা গেছে বলেই সে এটিকে ‘একটি ট্র্যাজেডি’ বলেছিলো। বুধবারের মুক্ত আলোচনায় ওজি রাব্বি বাইন্ডারের কাছে এই ঘটনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলো যে তার কয়েকজন আত্মীয় শুধু ইহুদিদের নামই গণনায় নিচ্ছে। রাব্বি বাইন্ডার সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং অন্য বিষয়ের ব্যাখ্যা দিয়ে এটি বোঝাতে চাইলেন। ওজি তার সিটে দাঁড়িয়ে বলতে চেয়েছিলো যে সে যা চানতে চায় তা অন্যকিছু। রাব্বি বাইন্ডার তাকে বসতে বলেন। তখন ওজি চিৎকার করে বলে নিহত আটান্ন জনই ইহুদি। এসময় দ্বিতীয় বারের মতো তার মা সেখানে হাজির হয়।

‘এবং তিনি যিশু কিভাবে ঐতিহাসিক হয়ে উঠলেন সেই ব্যাখ্যা দিতে থাকেন। কাজে কাজেই আমি তাকে জিজ্ঞাসা করতেই থাকি। কোনো ছেলেমানুষির ব্যাপার নয় ইটজি। তিনি আমাকে গাধা বানাবার চেষ্টা করছিলেন।’

‘তাহলে শেষ পর্যন্ত তিনি কী করেন?’

‘শেষে তিনি চিৎকার শুরু করলেন। আমি সাধারণ মনের মানুষ এবং জ্ঞানী বালক বলতে পারো। এবং শেষ বার মা সেখানে আসেন। আমি ১৩ বছরের বয়সের উৎযাপনে সিনেগগে কখনো যোগ দিইনি। মা চাইলে হতো। আমি দায়িত্ব নিতাম। শোন ইটজি। তখন তিনি মূর্তির মতো কথা বলতে শুরু করলেন,খুব ধীরে এবং গভীরভাবে। এবং ঈশ্বর সম্পর্কে আমি যা বলেছি তা নিয়েও তিনি ভেবেছেন। তিনি আমাকে বললেন, অফিসে যাও এবং এ সম্পর্কে ভাবো।’ ওজি ইটজির শরীরর ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াল। এবং বলল, ‘ইটজি, আমি পুরো এক ঘণ্টা ভাবলাম এবং এখন আমি নিশ্চিত যে ঈশ্বর এটি করতে পারেন।’

ওজি সিদ্ধান্ত নিল যে মায়ের কাছে সে স্বীকার করবে যা সে উত্তেজনাবশত করেছে। সে দ্রুত বাড়ি গেল। তবে এটি ছিলো নভেম্বরের এক শুক্রবারের রাত এবং তখন বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। মিসেস ফ্রিডম্যান ঘরে ঢুকেই তার কোর্টটি ছুড়ে ফেলে দিলেন, দ্রুত ওজির মুখে চুমু খেলেন এবং রান্নাঘরে টেবিলে গেলেন তিনটি হলুদ মোমবাতি জ্বালাতে। দুটো মোমবাতি যিশুর স্যাবাথে এবং অন্যটি বাবার রোগমুক্তির জন্য।

যখন তার মা মোমবাতি জ্বালাল সে তার নিজের হাত দুটো ধীরে ধীরে বাতাসের ওপর ঘোরাতে লাগল। দেখে মনে হবে সে কোনো মানুষকে ধর্মের পথে টেনে নিয়ে আসছে যারা কিছুটা ধর্মবিমুখ। এবং তার চোখ অশ্রুর জলে কাচের মতো চকচক করছিলো। এমনকি তার বাবা যখন বেঁচে ছিলো তখনো তার চোখে অশ্রুজল চকচক করতো। তার মারা যাওয়ার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। মোমবাতি জ্বালিয়ে মা বিশেষ কিছু করতে চাইত।

যখন মা জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি দিয়ে স্যাবাথের একটি মোমবাতি জ্বালাতে যাবে তখন টেলিফোনটি বেজে উঠলো। ওজি ফোনের এক ফুটের কাছে ছিলো। সে ফোনটা তার বুকের কাছে চেপে ধরলো। যখন মা মোমবাতি জ্বালায় তখন ঘরে কোনো শব্দ থাকা চলবে না। এমনকি নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দও না। যদি সেটি করা যায় তবে খুব ভালো হয়। ওজি ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরে রাখে এবং লক্ষ করে তার মা হাত দিয়ে যা টেনে আনার তাই টেনে নিয়ে আসছে এবং সে অনুভব করে তার চোখও স্বচ্ছ অশ্রুজলে সিক্ত হয়ে উঠছে। তার মা গোলাগাল, বিধ্বস্ত, লালচুলো একজন ধূসর রঙের মহিলা। নিজের চেহারা বেশবাস সম্পর্কে খুব সচেতন নয়। এমনকি যখন তিনি ভালোভাবে পোশাক-আশাক পরেন তখনও তাকে পছন্দনীয় কোনো মহিলা মনে হয় না। কিন্তু যখন তিনি মোমবাতি জ্বালান তখন তাকে বেশ সুন্দরী দেখায় সেই মহিলার মতো যে জানে যে ঈশ্বর যা খুশি করতে পারেন।

কিছু রহস্যময় মুহূর্তের পর তার কাজ শেষ হলো। ওজি টেলিফোনটি ঝুলিয়ে রাখলো এবং কিচেন টেবিলের কাছে গেলো। মা সেখানে চার প্রকারের স্যাবাথের খাবার সাজাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সে মাকে বললো, আগামি বুধবার চারটে ত্রিশে তোমার রাব্বি বাইন্ডারের কাছে যাওয়া উচিত এবং কেনো যাওয়া উচিৎ তাও সে বললো। জীবনে এই প্রথমবার মা তার মুখে প্রচণ্ড জোরে থাপ্পড় দিল।

ডিনারের সময় স্যুপ বা মাংস খাবার সময় ওজি খুব কাঁদলো এবং তার খাওয়ার কোনো ইচ্ছে হলো না।

বুধবারে সিনেগগের মাটির নিচের তিনটে রুমের সবচেয়ে বড়োটায় রাব্বি মারভিন বাইন্ডার ক্লাস শুরু করেন। তিনি লম্বা, চৌকশ, চওড়া কাধের ত্রিশ বছরের যুবক; তার মাথায় বিস্তৃত কালো চুল। তিনি পকেট থেকে তার ঘড়িটা বের করে দেখলেন চারটে বাজে। কক্ষের পিছন দিকে সত্তর বছরের তত্ত্ববধায়ক ইয়াকোভ ব্লটনিক ধীরে ধীরে বিশাল জানালার গ্লাস পরিষ্কার করছিলো আর বিড়বিড় করছিলো আর সে আদৌ খবর রাখে না তখন চারটে না ছটা বাজে; জানে না সেদিন সোমবার না মঙ্গলবার। ইয়াকোভ ব্লটনিকের বিড়বিড় করা স্বভাব, তার বাদামি কোকড়ানো দাড়ি, বোচা নাক ও দু’গোড়ালি দিয়ে সন্তর্পনে হাঁটা কালো দুটো বিড়াল তাকে সব ছাত্রদের কাছে আশ্চর্য বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছিলো; তাকে বিদেশি, প্রাচীন, ভয়ঙ্কর ও অশ্রদ্ধারও মনে করতো কেউ কেউ। ওজির কাছে এই বিড়বিড়ানি খুব বিরক্তিকর ও কৌতূলোদ্দীপক মনে হতো। বহু বছর ধরে সে বিড় বিড় করে। ওজি মনে করে সে তার হারিয়ে যাওয়া প্রার্থনা স্মরণ করে এবং সে ঈশ্বর সম্পর্কে সব ভুলে যায়।

‘এখন উন্মুক্ত আলোচনার সময়; ইহুদিদের যে কোনো বিষয় নিয়ে যে কোনো কথা বলতে পারো- ধর্ম, পরিবার, রাজনীতি খেলাধুলা…‘ রাব্বি বাইন্ডার বললেন।

সবাই নীরব ছিলো। এটি ছিলো নভেম্বরের একটি ঝড়ো মেঘাচ্ছন্ন বিকেল। এমনটা আগে কখনো হয়নি। হতে পারে বেসবল খেলার দিন। আর এ সপ্তাহে কেউ পুরনো নায়ক সম্পর্কে কোনো কথা বলেনি। হাঙ্ক গ্রীণবার্গই নিয়ে সামান্য আলোচনা হতে পারতো।

এবং আত্মজাগ্রত ওজি ফ্রিডম্যানের ওপর রাব্বি বাইন্ডার নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। যখন ওজির সময় এলো সে হিব্রু বই থেকে পড়া শুরু করলো তবে খুব ধীরে। রাব্বি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, সে কোনো আরো দ্রুত পড়ে না। তার কোনো উন্নতি দেখা গেলো না। ওজি বললো, সে জোরে পড়তে পারে তবে জোরে পড়লে সে যা পড়ছে তা বুঝতে পারবে না। তাছাড়া, রাব্বির বার বার দেয়া উপদেশে ওজি বোঝার চেষ্টা করছিলো এবং প্রতিভার পরিচয়ও দিয়েছিলো তবে বড় একটা অনুচ্ছেদের মাঝখানে সে হঠাৎ থেমে গেলো এবং বললো, সে যা পড়ছে তার একটি শব্দ বুঝতে পারছে না। সে আবার গোড়া থেকে ধীর গতিতে পড়া শুরু করলো। তখন এলো সেই আত্মজাগৃতির পালা।

ঘটনাক্রমে মুক্ত আলোচনার সময় পার হয়ে গেলেও কেউ কোনো কথা বললো না। রাব্বির আমন্ত্রণে শুধু ব্লটনিকই বিড়বিড় করে অংশগ্রহণ করলো।

কোনো কিছু আলোচনা করার ইচ্ছে কারো নেই? কোনো প্রশ্ন? কোনো মন্তব্য? রাব্বি বললেন।

তৃতীয় সারি থেকে মৃদু ফিসফাস আওয়াজ শোনা গেলো। রাব্বি ওজিকে দাঁড়াতে বললেন এবং বললেন, তোমার চিন্তার যে অগ্রগতি হয়েছে তা বাকিদের শোনাও।

ওজি দাড়ালো এবং বললো, ‘আমি এখন ভুলে গেছি।’ সে তার সিটে বসে পড়লো।

রাব্বি ওজির সিটের কাছে অগ্রসর হলেন।এবং একটি ডেস্কের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। এটা ছিলো ইটজির ডেস্ক। রাব্বির শরীর ওর একহাত দূরে। এবং তিনি ইটজির মনোযোগ লক্ষ করছিলেন।

‘উঠে দাঁড়াও, অস্কার’ রাব্বি শান্তভাবে বললো। তোমার চিন্তাভাবনাগুলো গুছিয়ে বলো।

ওজি দাঁড়ালো। তার সব শ্রেণিবন্ধুরা তার দিকে তাকালো এবং দেখলো তার কপালো যেন গভীর খামচানো দাগ।

‘আমি কিছুই গোছাতে পারি না।’ সে ঘোষণা করলো। এবং ধপাস করে নিচে পড়ে গেলো।

‘উঠে দাঁড়াও!’ রাব্বি বাইন্ডার ইটজির ডেস্ক থেকে সরাসরি ওজির সামনে গেলো।

সে পিছন ফিরলে ইটজি তার পিঠে পাঁচ আঙুলের ছাপ দেবার ভঙ্গি করলো; গোটা ক্লাসে চাপা হাসি ছড়িয়ে পড়লো। রাব্বি বাইন্ডার ওজির বোকামি নিয়ে এত বেশি মশগুল ছিলো যে যে চাপা হাসি নিয়ে একদম মাথা ঘামালো না। তিনি বললেন, অস্কার, দাঁড়াও। কী বিষয়ে তোমার প্রশ্ন ছিলো?

ওজি বাতাসে একটি শব্দ ছাড়লো। বেশ সুবিধাজনক শব্দ,‘ধর্ম’

‘ও এখন তোমার মনে পড়েছে?’

‘হ্যাঁ’

‘কী সেটা?’

সে ফাদে পড়ে গেলো। যে বিষয়টি তার মাথায় এলো সেটাই সে বিড় বিড় করতে থাকলো। ‘তিনি যা ইচ্ছে তাই তৈরি করতে পারেন না কেন?’

রাব্বি বাইন্ডার প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, চূড়ান্ত উত্তর। ইটজি, রাব্বির দশ ফুট পিছনে ছিলো সে তার বাম হাতের একটি আঙুল উত্তোলন করলো এবং রাব্বির পিছনে এমন ভঙ্গি করলো যে গোটা ক্লাস আবার হাসিতে ফেটে পড়লো।

কী ঘটেছে তা দেখার জন্য বাইন্ডার দ্রুত পিছনের দিকে গেলেন এবং মানসিক বিপযর্য়ে ওজি রাব্বির পিছনে চিৎকার করে উঠলো। তার সামনে সে এটি করতে পারেনি। এটি ছিলো ভীষণ জোর এবং বিশ্রি চিৎকার। এই গলার জোর যেন সে ছয়দিন ধরে জমা করে রেখেছিলো।

‘তুমি জানো না। তুমি ঈশ্বর সম্পর্কে কিছ্ইু জানো না!’

রাব্বি খুব দ্রুত তার কাছে ফিরে এলো। ‘কী বললে?’

‘তুমি জানো না- তুমি জানো না।’

‘ক্ষমা চাও। অস্কার, ক্ষমা চাও।’ সে তাকে ভয় দেখালো।

‘তুমি কিচ্ছু জানো না।’

রাব্বি বাইন্ডার তার হাত ওজির গলা ধরার জন্য বাড়িয়ে দিলেন। সম্ভবত তার মুখ বন্ধ করার জন্য সে এটি করতে যাচ্ছিল। ওজি নিচু হলো। আর রাব্বির হাতের পাঞ্জার আঘাত সরাসরি লাগলো ওর নাকে।

সঙ্গে সঙ্গে রক্ত বের হলো। ওজির শার্টে রক্তের লাল দাগ ছিটকে লাগলো।

পরের সময় সমস্তটাই ছিলো বিশৃঙ্খলায় ভরপুর। ওজি চিৎকার করে বলতে থাকে- তুই একটা বেজন্মা, তুই বেজন্মা! এবং ক্লাস রুমের দরোজা ভেঙে ফেললো। রাব্বি কাত হয়ে পড়লেন এবং এক ধাপ পিছনে এলেন। তার মনে হলো তার শরীরের রক্ত বিপরীত দিকে ছুটে চলেছে। তিনি আবার এক ধাপ সামনে গেলেন এবং ওজির পরে দরোজার খিল খুললেন। সমস্ত ক্লাস রাব্বির চওড়া নীল কোর্টের পিছনে ছুটতে লাগলো, বৃদ্ধ ব্লটনিককে জানালা খোলার সুযোগ দিলো না কেউ। সবাই ক্ষীপ্রগতিতে সিড়ি অতিক্রম করে ছাদের দিকে ছুটতে লাগলো।

যদি কেউ দিনের আলোর সাথে কোনো মানুষের জীবনের তুলনা করে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত তাহলে বলা যাবে; সুর্যাস্ত মানে হলো জীবনের শেষ প্রান্ত অর্থাৎ মৃত্যু। তখন ওজি ফ্রিডম্যান সর্ব শক্তি প্রয়োগ করে ঝাকুনি দিয়ে ঠেলা দরোজা দিয়ে সিনেগগের ছাদে উঠতে চেষ্টা করছিলো, সে ব্রঙ্কো স্টাইলে রাব্বির হাতে লাথি মারছিলো; ধরুন, এই সময় দিনের বয়স ৫৫ বছর। হিসেব অনুযায়ী ৫০ বা ৫৫ নভেম্বরের অপরাহ্ণকে নির্দেশ করে। কারণ এটা ছিলো সত্যি নভেম্বর মাস, এই সময়ে, কারো পক্ষে কোনো কিছু স্পষ্ট করে না দেখারই কথা। তবে কেউ শব্দ শুনতে পারে বিশেষত টকাস টকাস শব্দ হলে। প্রকৃত ঘটনা, হলো ওজিকে রাব্বি দেখতে পাননি এবং রাব্বির মুখের ওপর সে ঠেলা দরোজা বন্ধ করে দিলো। সে এমন জোরে ওপারের হুড়কো লাগালো যে তার শব্দ গোটা আকাশকে আন্দোলিত করলো।

তার সমস্ত ওজন দিয়ে সে বদ্ধ দরোজা চেপে ধরলো এবং মনে করলে যে কোনো সময় রাব্বি তার চওড়া কাধের ধাক্কায় দরোজা খুলে ফেলতে পারে। সে শক্ত করে দরোজার কাঠে পিঠ চেপে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তবে সে দরোজা সরানোর করো শব্দ পেল না; শুধুমাত্র পায়ের খসখস শব্দ পেল। প্রথমে বেশ জোরে পরে তা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

তার মাথার মধ্যে একটি প্রশ্ন উকি দিল। ‘এই কাজটি কী সে করেছে?’ যার বয়স মাত্র ১৩। সে তার ধর্মীয় নেতাকে বেজন্মা বলেছে। দুবার। দুবার বলাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রশ্নটি বার বার জোরে জোরে তার কানে আসতে থাকে- ‘সে-ই এটি করেছে? আমিই সে-ই?’ সে নিজেকে দেখতে পেল যে সে আর হাঁটুমুড়ে বসে নেই বরং সে দ্রুতবেগে দৌড়ে ছাদের কিনারের দিকে যেতে থাকে। তার চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল পড়তে থাকে, গলা দিয়ে প্রচণ্ড চিৎকার ধ্বনি বের হতে থাকে আর তার হাতদুটো এমন জোরে কাঁপতে থাকে যে মনে হয় সে দুটো নিজের হাত নয়।

‘আমি! আমি করেছি এই কাজ? আমি সেই লোক? আমি? আমি? আমি সেই?’

এই প্রশ্নটি রাতের বেলা কোনো চোর নিজেকে করতে পারে যখন সে জিম্মিকে মুক্তি দেবার জন্য প্রথম জানালা খুলতে যায় এবং এই প্রশ্ন বিয়ের সময় বেদীতে ওঠা বরের মনেও উদিত হতে পারে।

কয়েক সেকেন্ড খুব উদ্ভিন্নভাবে সে কাটায়। তারপর তার দেহ উড়ে চলে যায় ছাদের কিনারে। নিজের প্রতি চালানো তার পরীক্ষা যেন ঝাপসা হয়ে আসে। সে সড়কের দিকে একদৃষ্টিতে তাকায়। প্রশ্নের পিছনে কী সমস্যা আছে তা সে ভেবে কুল কিনারা পায় না; আমি ছিলাম সেই লোক যে বাইন্ডারকে বাস্টার্ড বলেছে? অথবা আমি সেই লোক যে ছাদে ছুটোছুটি করছি? যা হোক, সব কিছু এখন নির্ভর করছে নিচে জড়ো হওয়া অজস্র মানুষের ওপর। সেখানে এখন যে কোনো কিছু ঘটতে পারে আপনার ওপরে বা অন্য কারো ওপরে বা কোনো পণ্ডিতের ওপরে। চোর লোকজনের পকেটের টাকা নিজের পকেটে ঢোকাচ্ছে খুব সন্তর্পনে আর পালিয়ে যাচ্ছে জানালা দিয়ে। বর এখন হোটেলে দুটো রুম ভাড়া করছে। আর বালকটি দেখছে রাস্তায় লোকজন পরিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। মানুষের ঘাড় কাত হয়ে গেছে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, মুখ উর্দ্ধমুখি যেন হাইডেন প্লানেটারিয়ামের ছাদ। হঠাৎ মনে হবে আপনিই ছাদ।

‘অস্কার! অস্কার ফ্রেডম্যান!’ জনতার মধ্য থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল। এটা দেখানোও যেত যদি কেউ স্ক্রোলিং নিউজের মতো লিখে রাখত। ‘অস্কার ফ্রিডম্যান শিঘ্রি নেমে এসো’ রাব্বি বাইন্ডার তার একটি হাত ওজির দিকে দেখাচ্ছিল এবং হাতের একটি আঙুল তাকে ভয় দেখাচ্ছিল। এটি আসলে একজন একনায়ক শাসকের আচরণ। তবে তার চোখ সব কিছু স্বীকারোক্তি দিচ্ছিল যে তার নিজের ভৃত্য তার মুখে সুন্দর করে থুতু ছিটিয়ে দিচ্ছিল।

ওজি কোনো উত্তর দেয় না। একবার শুধু দূর থেকে তার দিকে পলক ফেলে। তার পরিবর্তে সে তার নিচের পৃথিবীকে ভালো করে দেখে, বিভিন্ন যায়গায় কত রকম মানুষ, বন্ধু থেকে শত্রু, অংশগ্রহণকারী থেকে দর্শক। সে সব দেখতে থাকে। রাব্বি বাইন্ডারের চারপাশে তার বন্ধুরা তারকাগুচ্ছের মতো দাঁড়িয়ে আছে। শুধু রাব্বি এখনো নির্দেশ দিচ্ছে। তারকারাজির সবার ওপরে কোনো ফেরেশতাকে দেখা যাচ্ছে না তবে পাঁচজন বয়ঃসন্ধিকালের বন্ধুদের মধ্যে ইটজিকে দেখা যাচ্ছে। কী অদ্ভুত পৃথিবী। সব তারারা নিচে, রাব্বি বাইন্ডার নিচে... ওজি কিছুক্ষণ আগেও ওর শরীর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলো না সে এখন নিয়ন্ত্রণ শব্দের অর্থ অনুভব করছে। সে অনুভব করছে শক্তি ও ক্ষমতা।

‘অস্কার ফ্রিডম্যান, আমি তিন পর্যন্ত গুনবো, তার মধ্যে নেমে এসো।’

খুব কম একনায়ক আছে তার প্রজাদের এরকম তিন গোনার মধ্যে কিছু করতে বলে। রাব্বি বাইন্ডারকে একমাত্র একনায়ক মনে হলো।

‘তুমি প্রস্তুত, অস্কার?

ওজি হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ালো যদিও পৃথিবী নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। সে যেন ভূতলে বা আকাশে এইমাত্র প্রবেশ করেছে। রাব্বি বাইন্ডার তাকে মিলিয়ন টাকা দিলেও সে নামবে না।

‘ঠিক আছে’ রাব্বি বাইন্ডার বললেন। তিনি কালো স্যামসন চুলের ওপর একটা হাত চালান করে দিলেন ক্ষিপ্র গতিতে যেন এটি তার আদেশের একটি মুদ্রা। অন্য হাত দিয়ে তার চারপাশে শূন্যে একটি বৃত্ত তৈরি করলেন এবং মুখে বললেন, ‘এক!’

কোনো বজ্রপাত হলো না। বরং এই সময়ে ‘এক’ ধ্বনির জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন। পৃথিবীর সবচেয়ে কম ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি যেন অন্ধকারের মধ্যে সিনেগগের সিঁড়িতে আবির্ভূত হচ্ছে। তিনি দ্রুত দৌড়ে গিয়ে দরোজার হাতল ধরলেন।

‘কী হলো!’

বৃদ্ধ ইয়াকোভ ব্লটনিকের বয়স্ক মনে বিষয়টি ঠিক মতো ধরা পড়েনি সে ধীরে ধীরে নেমে এল যেন ক্রাচে ভর দিয়ে নামছে। ছাদের ওপর বালকটি কী করতে যাচ্ছে সে ঠিক অনুমান করতে পারেনি। তবে সে জানে কাজটি ভালো নয় অর্থাৎ ইহুদিদের জন্য কাজটি মোটেও ভালো নয়। কোনটা ইইহদির জন্য ভালো আর কোনটা ভালো নয় এই নিয়ে তার জীবনটা কয়েকভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে।

সে তার মুক্ত হাত দিয়ে তার বসা কপোলে আস্তে আঘাত করলো- ‘হায় ঈশ্বর’ । এবং যত দ্রুত পারে তার মাথা নামিয়ে আনল এবং রাস্তার দিকে তাকালো। সেখানে রাব্বি বাইন্ডার (সে এমন একজন মানুষের মতো নির্দেশনা দিচ্ছিল যার পকেটে মাত্র ৩ ডলার এবং এই মাত্র ২ ডলার উচিয়ে ধরছিল) ছিলো; ছাত্ররা ছিলো এবং সবাই ছিলো। কিন্তু কোনো একজনকে আগে বালককে নামিয়ে আনতে হবে। সমস্যা হলো বালককে ছাদ থেকে কিভাবে নামাতে হবে?

যে লোকের একটি বিড়াল আছে সে জানে বিড়ালটিকে কীভাবে ছাদ থেকে নামাতে হয়। তুমি সংশ্লিষ্ট বিভাগে ফোন কর। অথবা তুমি প্রথমে অপারেটরকে বলো এবং তাকে তার বিভাগে কথা বলতে বলো। এবং তারপর নানা যন্ত্রপাতি, দড়ি ব্রেক কষা, চিৎকার চেচামেচি এবং তারপর ছাদ থেকে বিড়াল নামানো হবে। তুমি বালককে নামানোর জন্যও সেরকম ব্যবস্থা করতে পারো।

যদি তোমার একটি বিড়াল ছাদে আটকা পড়ে আর তুমি ইয়াকোভ ব্লটনিক হয়ে থাকো তাহলে তোমার জন্য এই ব্যবস্থাই ভালো।

যখন চারটে ইঞ্জিনের সবগুলো এসে পৌঁছালো। রাব্বি বাইন্ডার চতুর্থবারে মতো ওজিকে নেমে আসার জন্য ৩ গণনা করলো। বড় হুক, মই চার দিক থেকে লাগানো হলো এবং সিনেগগের সামনে রাখা হলুদ ফায়ার হাইড্রান্টের দিকে একজন ফায়ারম্যান দৌঁড়ে গেল। বিশাল রেঞ্চ দিয়ে সে টপ নজলের মুখ খুলতে শুরু করলো। রাব্বি বাইন্ডার দৌঁড়ে গিয়ে কার কাধ টেনে ধরল।

‘এখানে তো আগুন লাগেনি।’

ফায়ারম্যান তার কাধের দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করলো এবং খুব শক্তি নিয়ে নজলের মুখ খুলতে লাগল।

‘কিন্তু এখানে তো আগুন লাগেনি, কোনো আগুন লাগেনি’ বাইন্ডার চিৎকার করে বললেন। যখন ফায়ারম্যান আবার বিড়বিড় করল তখন বাইন্ডার ছুটে গিয়ে দুই হাত দিয়ে তার গলা ধরলেন এবং ছাদের দিকে উঁচু করে তুললেন।

ফিলিপ রথছাদ থেকে ওজির মনে হল রাব্বি বাইন্ডার বোতলে ছিপি খোলার মতো ফায়ারম্যানের মাথাটা শরীর থেকে ছিড়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। তাদের তৈরি করা দৃশ্য দেখে সে মুখ চেপে হাসতে থাকে। সে দেখল এটি একটি পারিবারিক ছবি- রাব্বি মাথায় একটি কালো হাড়ের ক্যাপ, ফায়ারম্যানের মাথায় মাথায় লাল হ্যাট এবং খাটো হলুদ রঙের লোকটা উবু হয়ে বসে আছে বালকের মতো, তার মাথায় কিছু নেই। ছাদের কিনারা থেকে ওজি ছবিটি দোলা দিতে থাকে, একহাতে বেশ জোরে জোরে। এই করতে গিয়ে তার ডান পা ছলকে যায়। রাব্বি বাইন্ডার হাত দিয়ে তার চোখ ঢেকে রাখে।
ফায়ারম্যান দ্রুততার সাথে কাজ করল। ওজি ওর ব্যালান্স ফিরে পাবার আগেই সে একটা বড় হলুদ নেট সিনেগগের চত্বরে ধরে ফেলল। নেট ধরে সে ওজির দিকে গভীরভাবে আবেগশূন্য হয়ে তাকিয়ে রইল।
একজন ফায়ারম্যান রাব্বি বাইন্ডারের দিকে তার মাথা ঘোরাল- এটা কী জিনিস, বাচ্চার নুনু? নাকি অন্য কিছু?’
রাব্বি চোখের ওপর থেকে তার হাত ধীরে ধীরে সরালেন যেন তার হাত বাধা ছিল টেপ দিয়ে। তখন তিনি ভালোভাবে নিরীক্ষণ করলেন। সাইডওয়াকে কেউ নেই, নেটের মধ্যেও কিছু নেই।
‘সে কী লাফ দিচ্ছে? নাকি অন্য কিছু করছে?’ ফায়ারম্যান চিৎকার করে উঠল।

রাব্বি বাইন্ডার এবার মূর্তির মতো বললেন, না। তিনি বললেন,‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার তো তাই মনে হয়। তাছাড়া সে এখন ভয় পাচ্ছে।’

ভয়ও পাচ্ছে? কেন সে ছাদের ওপর। ওজির মনে পড়ল সে পালিয়ে যাচ্ছিল, সে লাফ দেবার কথা চিন্তাই করিনি। সে দৌঁড়ে পালাবার চেষ্টা করেছিল। প্রকৃত ব্যাপার হলো সবাই যেভাবে তাকে নিয়ে যা ভাবছে তা ঠিক নয়। সে ছাদে গিয়ে মরতে চাইনি।

‘বালকের নাম কী?’

ফ্রিডম্যান, অস্কার ফ্রিডম্যান, রাব্বি বাইন্ডার বললেন।

ফায়ারম্যান ওজির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার ব্যাপারটা কী অস্কার? লাফ দেবে, নাকি অন্য কিছু করবে?’

ওজি কোনো উত্তর দিল না। সত্যি বলতে কী প্রশ্নটা তার কাছে প্রথম এলো।

‘দেখ , অস্কার তুমি লাফ দিতে চাইলে দেবে, না চাইলে না দেবে তবে আমাদের সময় নষ্ট করো না। ঠিক আছে ‘

ওজি ফায়ারম্যানের দিকে তাকাল এবং একই সাথে সে রাব্বি বাইন্ডারকেও অনেকবার দেখতে চাইল।

‘আমি লাফ দিতে যাচ্ছি।’

এবং সে তখন ছাদের কিনারা বরাবর লাফাতে শুরু করল, যেদিকটায় কোনো নেট ছিলো না। এবং সে হাতদুটো নাচাতে শুরু করল এবং আকাশের দিকে উত্তোলিত করতে থাকল। আর হাতের করতল প্যান্টের সাথে জোরে ঘষতে শুরু করল। সে হু য়ি… হু য়ি… শব্দ করে চিৎকার করতে থাকল। মনে হলো যেন কোনো এঞ্জিন থেকে শব্দটি আসছে। আর শরীর উর্দ্ধাংশ ছাদের কিনারের সাথে লাগিয়ে রাখল। ফায়ারম্যান সমস্ত চত্বরটা নেটে ঢাকতে চেষ্টা করল। রাব্বি বাইন্ডার নিচুস্বরে কয়েকজনকে কিছু বললেন এবং তার চোখ ঢেকে ফেললেন। সব কিছু ঘটতে থাকল দ্রুত,মনে হলো যে শব্দহীন ছায়াছবি ফায়ার এঞ্জিনের সাথে যে সব লোক এসেছিলো তারা ভেগে গেছে। জুলাই দ্য ফোর্থ ফায়ার ওয়ার্কস উহ! আহ! এই উত্তেজনার মধ্যে এই লোকদের দিকে কারো মনোযোগ ছিলো না। তবে ইয়াকোভ ব্লটনিক ওপরের দরোজার কাছ থেকে তাদের মাথা গুনছিল… চার পাঁচ ছয় সাত… ও মাই গড! এটা সেই বিড়াল ছাদে ওঠার মতো ব্যাপার তো নয়।

রাব্বি বাইন্ডার তার আঙুল তুললেন। সাইডওয়াক ও নেট চেক করলেন। সব খালি। কিন্তু অন্য প্রান্তে ওজি দৌড়াদৌড়ি করছে। ফায়ারম্যান তার সাথে সাথে দৌড়াচ্ছে তবে নাগাল পাচ্ছে না। ওজি যখন কোনো যায়গা থেকে তড়িঘড়ি করে লাফ দেবার জন্য দৌঁড়ে যাচ্ছে ফায়ারম্যানরা ও নেট নিয়ে সেই যায়গায় যাবার জন্য দৌঁড়াচ্ছে তবে কাজটি কঠিন কারণ সে এক জায়গায় থিতু হচ্ছে না।

‘হু য়ি… হু য়ি…’

‘হেই, ওস্কার, ক্ষীপ্ত ফায়ারম্যান চিৎকার করে বলে, কি মুণ্ডুটা করছ ওখানে, খেলা কর?’

‘হু য়ি… হু য়ি…’

‘হেই, ওস্কার-’

কিন্তু সে তখন অন্য প্রান্তে, সে তার হাত দিয়ে পাখার মতো খুব জোরে ঝাপটা দিচ্ছে। রাব্বি বাইন্ডার এসব আর সহ্য করতে পারছিলেন না- ফায়ার এঞ্জিন, আত্মহত্যার জন্য চিৎকার করা বালক, নেট। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন,বিধ্বস্ত; দুই হাত দিয়ে নিজের বুকটাকে পেচিয়ে ধরলেন, তিনি মিনতি করে বললেন, ‘অস্কার এটা বন্ধ কর, প্লিজ নেমে এসো…দয়া করে ঝাঁপ দিও না।

এবং আবার জনতার মাঝ থেকে একটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল। এবং এত জোরে বলল যে ছাদের বালকের কাছে তা পৌঁছে গেল।

‘ঝাঁপ দাও।’

এই কথা বলছিল ইটজি। সে তার লম্ফঝম্ফ বন্ধ করল।

‘এগিয়ে যাও, ওজি- ঝাঁপ দাও!’ ওজি তারকার অবস্থান থেকে সরে এল এবং সাহস ও অনুপ্রেরণা দেখাল তবে বুদ্ধিমান বালকের মতো নয়। শিষ্যের মতো করল কাজটা। সে দাঁড়াল একা এবং বলল, ‘ ঝাঁপ দাও,ওজি, ঝাঁপ!’

তখনো রাব্বি হাঁটু গেড়ে এবং তার হাত দুটো বুকে কুঞ্চিত করে বাধা। তিনি তার শরীরটা পিছন দিকে ঘোরালেন। তিনি ইটজিকে দেখলেন। তারপর আবার ওজির দিকে অগ্রসর হলেন।

‘অস্কার, ঝাঁপ দিও না প্লিজ, ঝাঁপ দিও না প্লিজ… প্লিজ প্লিজ…’

‘ঝাঁপ দাও’ এই সময় ইটজি বলল না। তবে তারকাদের মধ্যে কেউ একজন বলল। এই সময় মিসেস ফ্রিডম্যান রাব্বি বাইন্ডারের কাছে চারটে ত্রিশের সাক্ষাতের জন্য সেখানে প্রবেশ করল; সামনে অগ্রবর্তী সবাই চিৎকার করছে এবং অনুরোধ করছে ওজিকে ঝাঁপ দেবার জন্য এবং রাব্বি বাইন্ডার আর ঝাঁপ না দেবার জন্য অনুরোধ করছেন না। কিন্তু হাতের গম্বুজের আড়ালে কাঁদছেন।

তার ছেলে ছাদের ওপর কী করছে তিনি বুঝে উঠতে না পেরে তিনি বললেন:

‘ওজি, আমার ওজি, তুমি ওখানে কী করছো? আমার ওজি, এটা কী হচ্ছে?’

ওজি হুয়ি হুয়ি শব্দ করা বন্ধ করল এবং তার দুই বাহু ধীর গতিতে ঝাপটানো শুরু করল যেমন পাখিরা মৃদুভাবে পাখা সঞ্চারিত করে। তবে সে কোনো উত্তর দিল না। সে নিচু মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকার আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকল- আলো এখন বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে এবং খুব ধীরে তা নিচের দিকটা আলোকিত করছে বিশেষ করে যেখানে তার মা দাঁড়িয়ে ছিল।

‘তুমি কী করছ, ওজি?’ তিনি হাঁটু মুড়ে বসে থাকা রাব্বি বাইন্ডারের খুব কাছাকাছি ছুটে গেল যেন তাদের দূরত্ব এক সুতোর মতো। মনে হচ্ছিল তার পেট রাব্বির ছুঁয়ে যাচ্ছে।

‘আমার ছেলে কী করছে?’

রাব্বি আরো তার কাছে গেল তবে নীরব থাকল। শুধু তার হাত দুটো দুর্বল রুগির মতো এদিক ওদিক নড়াচড়া করছিল।

‘রাবিব! ওকে নামিয়ে নিয়ে আসুন! সে তো নিজেকে খুন করে ফেলবে। তাকে নামিয়ে আনুন। আমার একমাত্র সন্তান...’

‘ আমি পারি না, না আমি পারি না।’ রাব্বি বললেন। সে তার সুদর্শন মুখটা জনতার দিকে ঘুরিয়ে বললেন, ‘এটা ওদের কাজ। ওদের কথা শুনুন।’

এবং প্রথম বারের মতো মিসেস ফ্রিডম্যান তার পিছনে বালকদের দঙ্গল দেখতে পেলেন। এবং তিনি শুনতে পেলেন তার পিছনে বালকেরা চিৎকার করছে।

‘সে ওদের জন্য করছে। সে আমার কথা শুনছে না। এটা ওদের কাজ।’ মনে হলো তিনি যে কবর থেকে কথা বলছেন।

‘তাদের জন্য?’

‘হ্যাঁ।’

‘কেন তাদের জন্য?’

‘তারা ওর কাছে এটা চায়।’

মিসেস ফ্রিডম্যান তার দুই হাত উপরে দিকে তুললেন মনে হলো তিনি আকাশের সাথে কথা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘তাদের জন্য সে এটা করছে?’ তিনি তখন এমন এক ভঙ্গি করলেন যা পিরামিড বা কোনো নবীর চেয়ে পুরনো। হাত দুটো ওপর থেকে পাশে আনলেন। ‘দেখ, একজন শহীদের মৃত্যু!’ তিনি ছাদের দিকে মাথা উঁচু করলেন। তখনো ওজি ধীরে ধীরে তার হাত ঝাপটচ্ছিল। ‘আমার শহীদ পুত্র।’

‘অস্কার, প্লিজ নেমে এসো’ তার কণ্ঠ আর্তনাদের মতো শোনাল।

খুব নরম মায়াবি স্বরে মিসেস ফ্রিডম্যান ছাদের ওপর তার ছেলেকে বললেন, ‘ওজি, নেমে এসো, ওজি, শহীদ হয়ে যেও না, বাবা।’

এটি প্রার্থনার মতো শোনাচ্ছিল। কাজেই রাব্বি বাইন্ডারও বললেন, পুত্র আমার, শহীদ হয়ে যেও না, শহীদ হও না।

‘ওজি, এগিয়ে যাও, একজন মার্টিন হও! একজন মার্টিন হও।’ ইটজি বলতে থাকে। তার সাথে সবাই যোগ দিয়ে কোরাসের মতো গাইতে থাকে- মার্টিন হও, মার্টিন হয়ে যাও।

যখন তুমি ছাদের ওপর এবং চারদিকে ঘন অন্ধকার তখন সব কিছু কম শুনতে পাবে। ওজি জেনেছিল যে দুই দল দুটো ভিন্ন জিনিস চাচ্ছিল: তার বন্ধুরা খুব আবেগী হয়ে গান গাওয়া শুরু করেছে তাদের দাবী নিয়ে। আর তার মা ও রাব্বি তাদের দাবী নিয়ে খুব করুণ সুরে কথা বলছে। রাব্বির কথার মধ্যে কান্নার সুর থাকলেও চোখে জল নেই কিন্তু মা কাঁদছিল।

বড় জালটা ওজির দিকে ধরা আছে মনে হবে যেন দৃষ্টিহীন কোনো চোখ। বিশাল মেঘযুক্ত আকাশ নিচের দিকে নেমে আসছে। নিচ থেকে আকাশকে ধুসর রঙের চাদর মনে হচ্ছে। হঠাৎ নির্মম আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো তার বন্ধুদের আবদার কত আশ্চর্য, তাকে নিচে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছে, তাকে হত্যা হয়ে যাবার অনুরোধ করছে; এর পক্ষে তার গান গাইছে এবং তার এসব করে খুশি হচ্ছে। এ ছাড়া আরো মহান এক আশ্চর্যের ব্যাপার হলো রাব্বি বাইন্ডার তার হাঁটুর ওপর মুখ গুজে বসে আছেন, তির তির করে কাঁপছেন। যদি এখন কোনো প্রশ্ন করা হয় ‘এটা কী আমি’ বরং সেটা হবে ‘এটা কী আমরা?’

ছাদের ওপর এই ব্যাপারটি এখন শেষ করা উচিৎ। এটি খুব জটিল একটি ব্যাপার। যদি সে ঝাঁপ দেয় তাহলে যারা গান করছে তারা কী নাচতে শুরু করবে? এটি কী হবে? ঝাঁপ দেওয়া কী বন্ধ করা যায়?

ওজি আকুলভাবে আকাশটা ছিঁড়ে ফেলতে চায়, তার মধে ঢুকিয়ে দিতে চায় তার হাতটা। আর তুলে আনতে চায় সূর্যটাকে এবং দেখবে সূর্যের ওপর কয়েন দিয়ে লেখা আছে; ঝাঁপ দাও অথবা ঝাঁপ দিও না।

ওজির হাঁটু মেঝের সাথে লেপটে আছে এবং যে ভঙ্গি নিয়ে সে বসে আছে তা দেখলে মনে হবে সে ঝাঁপ দেবার জন্য প্রস্তুত। তার হাত দুটো বাধা এবং তার কাঁধ থেকে আঙুলের নখ পর্যন্ত শক্ত এবং বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সে অনুভব করলো তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ মতামত দিচ্ছে সে ঝাঁপ দেবে কী দেবে না তা নিয়ে। প্রতিটি অঙ্গকে তার স্বাধীন মনে হচ্ছে।

হঠাৎ করে অন্ধকারের মধ্যে আলো জ্বলে উঠলো। মনে হলো কেউ যেন মস্করা করছে। বন্ধুদের গান এবং মা রাব্বির প্রার্থনায় ছেদ পড়ল।

ওজি ভোট গণনা বর্ণনা বন্ধ করল। এবং খুব জোরে, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই চিৎকার করে উঠল।

‘মাম্মা?’

‘হ্যাঁ, অস্কার।’

‘মাম্মা’ রাব্বি বাইন্ডারের মতো হাঁটু গেড়ে বসো।’

‘অস্কার-’

তোমার হাঁটু ভাজ করে বসো, সে বলল। ‘আমি ঝাঁপ দেবো।’

ওজি ঘ্যানঘ্যানে আওয়াজ শুনতে পেল। তারপর খুব অন্য জোর আওয়াজ। সে নিচের দিকে তাকাল এবং মায়ের মাথা দেখতে পেল; মাথার নিচে বৃত্তাকার পোশাক। তিনি বাইন্ডারের পাশে হামাগুড়ি দিয়ে বসলেন।

সে আবার বলল, ‘সবাই হাঁটু গেড়ে বসো।’ সবাই হাঁটু গেড়ে বসার শব্দ হল।

ওজি চারদিকে তাকাল। সে তার এক হাত দিয়ে সিনেগগের প্রবেশ পথের দিকে ইঙ্গিত করল।’ সিনেগগকে হাঁটু গেড়ে বসাও।’

বেশ শোরগোল শোনা গেল তবে হাঁটু মোড়ার শব্দ নয় সেটা। শরীর ও পোশাকের ঘসটানির শব্দ।

ওজি শুনতে পেল রাব্বি বাইন্ডার ফিসফিস করে বলছে ‘... সে নিজেকে হত্যা করবে।’ এবং সে পরে দেখল দরোজার হাতলের কাছে ইয়াকভ ব্লটনিককে। জীবনের প্রথম বারের মতো সে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসল।

ফায়ারম্যানের জন্য জাল ধরে রেখে হাঁটু গেড়ে বসা খুব কষ্টকর নয় বোধ হয়।

ওজি আবার চারদিকে দেখল এবং সে রাব্বিকে উদ্দেশ্য করে বলল।

‘রাব্বি?’

‘হ্যাঁ, অস্কার।’

‘রাব্বি বাইন্ডার, তুমি কী গডে বিশ্বাস করো?’

‘হ্যাঁ।’

‘তুমি কী বিশ্বাস করো গড যা কিছু করতে পারে?’ ওজি অন্ধকারের ভেতর তার মাথা রেখে বলে, ‘সব কিছু?’

‘অস্কার, আমি তাই মনে করি-’

দ্বিতীয়বার আশঙ্কা দেখা দিল তার মনে : ‘গড যা খুশি করতে পারে?’

‘আমাকে বলো, সহবাস ছাড়াই গড একটি শিশুর জন্ম দিতে পারে?’

‘তিনি পারেন।’

‘আমাকে বলো!’

রাব্বি বাইন্ডার আবার বললেন, ‘ গড সহবাস ছাড়াই শিশুর জন্ম দিতে পারেন।’

মাম্মা, তুমি আমাকে বলো।

‘সহবাস ছাড়াই ঈশ্বর সন্তান জন্ম দিতে পারেন।’ মা বললেন।

‘তাকে আমার সাখে কথা বলতে বলো।’

কিছুক্ষণ পরে সে শুনল বিদ্রুপাত্মকভাবে অন্ধকারে কেউ গড সম্পর্কে কথা বলছে।

পরে সে সবার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নিল যে সবাই যিশু খ্রিস্টকে বিশ্বাস করে। প্রথমে একাকি, পরে সবাই একসাথে।

যখন এই প্রশ্ন উত্তর পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছিল তখন সন্ধ্যা শুরু। রাস্তায় এমন শব্দ ছিল যে ছাদের ওপর বালকের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়।

‘ওজি? তুমি এখন নেমে আসবে?’ অন্ধকারে একটি নারী কণ্ঠ শোনা গেল।

কোনো উত্তর এল না। কিন্তু মহিলা অপেক্ষা করল। শেষ পর্যন্ত একটি কণ্ঠ স্পষ্ট হলো এবং কাঁদতে থাকল। তাকে বিধ্বস্ত মনে হলো বৃদ্ধ মানুষের মতো।

‘মাম্মা, তুমি দেখ না- আমাকে তোমার আঘাত করা উচিৎ নয়। তারও উচিৎ নয় আমাকে আঘাত করা। ঈশ্বর বিষয়ে আমাকে তোমরা আঘাত করতে পারো না। মাম্মা, ঈশ্বর বিষয়ে কাউকে তোমাদের কষ্ট দেওয়া ঠিক না-’

‘ওজি, দয়া করে এখন নেমে এসো।’

‘প্রতিশ্রুতি দাও, প্রতিশ্রুতি দাও ঈশ্বরকে নিয়ে তুমি কাউকে কষ্ট দেবে না।’

সে শুধুমমাত্র তার মাকে বলল। তবে সবাই হাঁট গেড়ে বসেছিল সে কারণে সবাই প্রতিশ্রুতি দিল যে তারা ঈশ্বরকে নিয়ে কাউকে আঘাত করবে না।

আবার একবার নীরবতা নেমে এলো।

‘মাম্মা, আমি এখন নেমে আসতে পারি’ ছাদের ওপর থাকা বালক শেষ পর্যন্ত বলল। সে মুখ উভয়দিকে ঘোরাল; মনে হলো সে ট্রাফিক বাতি পরীক্ষা করছে। ‘আমি এখন নামতে পারি।’

এবং সে নামলো, ঠিক হলুদ নেটের মাঝখানে; এক মহিমাময় উজ্জ্বল বর্ণময় সন্ধ্যার আলোর সাথে।