Print

নারী দিবসে ‪বীরাঙ্গনা মায়েদের প্রতি থাকলো ভালোবাসা

বিডিনিউজডেস্ক.কম
তারিখঃ ০৮.০৩.২০১৫
তিনি এখন ফেরিওয়ালা। চট্টগ্রামের রাস্তায় নিজের লেখা বই ফেরি করে বিক্রি করে নিজের পেটে এক বেলা ভাত যোগানোর চেষ্টা করেন। যদি বই বিক্রি না হয় তাহলে সেদিন বা আরো কয়েকদিন এই নারীকে না খেয়ে থাকতে হয়। আপনি কি জানেন এই নারীটি কে? আপনি কি জানেন এই নারীই আপনার একজন মা?

আজকে আপনি যে দেশে বুক ফুলিয়ে হেটে বেড়ান, যে দেশের বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়ে আপনি বেচে আছেন, ঠিক সেই দেশের জন্য আপনার এই মা নিজের সম্ভ্রমটা দিয়েছিলো পাকি জারোজদের কাছে। আর সেই মায়ের সম্ভ্রম দিয়ে কেনা আজকের এই দেশ। যে দেশে আপনি বা আপনারা মনের শুখে ঘুরে বেড়ান। কিন্তু আপনি বা আপনারা কি কখনো একবার জানার চেষ্টা করেছেন আপনার সেই সম্ভ্রমহারা মা দিনে এক বেলা খেয়েছে কি না। তার উনাদের থাকার জন্য কোন ঘর আছে কিনা। যাদের ইজ্জতের বিনিময়ে আজ আপনি বিলাষী জীবনযাপন করছেন অথচ একটিবারও খোজ নেন না তাদের। একবার জানার চেষ্টাও করেন না আপনার মা কেমন আছে! আজ আপনার মন একবারো টলে না এই বীরাঙ্গনা নারীর চোখের পানিতে। এমন দেশের জন্যই কি এই তারা নিজের ইজ্জত বিকিয়ে দিয়েছিলো....?
রমা চৌধুরী একজন একাত্তরের বীরাঙ্গনা। মুক্তিযুদ্ধের ঝাপটায় ঘরবাড়ি, তিন শিশু সন্তান, স্বামী হারিয়ে এখন রাস্তার বই ফেরিওয়ালা। রমা চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে শুধু নিজের সম্ভ্রমই হারাননি, সামাজিক গঞ্জণা, বঞ্চনা, টিটকিরি শুনতে শুনতে এখন তিনি পাগল প্রায়। রমা চৌধুরী'র দুই সন্তান মুক্তিযুদ্ধের চরম অসময়ের বলি। রমা চৌধুরী'র মত অসংখ্য মায়েদের মহান আত্মত্যাগেই একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে আমাদের মহান স্বাধীনতা এসেছিল। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও রমা চৌধুরীদের পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হয়। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স করা রমা চৌধুরী পেশায় ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়ায়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একাত্তরের ১৩ মে তিন শিশু সন্তান নিয়ে পোপাদিয়ায় গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন রমা চৌধুরী। আর স্বামী ছিলেন তখন ভারতে। ওইদিন সেই এলাকার পাকিস্তানি দালালদের সহযোগিতায় হানাদার বাহিনীর লোকজন রমা চৌধুরীদের বাড়িতে হানা দেয়। নিজের মা, পাঁচ বছর ৯ মাস বয়সি ছেলে সাগর ও তিন বছর বয়সি ছেলে টগরের সামনেই তাকে ধর্ষণ করে এক পাকিস্তানি খানসেনা। পাকসেনারা রমা চৌধুরীকে শুধু ধর্ষণেই ক্ষান্ত হয়নি, তাদের বাড়িও পুড়িয়ে দেয় তখন। হানাদারদের হাত থেকে কোনমতে মুক্ত হয়ে রমা চৌধুরী পুকুরে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন পুনরায় ধর্ষণের ভয়ে। চোখের সামনে গান পাউডার দিয়ে তাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় পাকসেনারা। ঘরের মূল্যবান মালামাল, নিজের লেখা সাহিত্যকর্ম চোখের পলকেই পুড়ে যেতে থাকল। কিন্তু হানাদারের ভয়ে কেউ আগুন নেভাতে সেদিন এগিয়ে যায়নি। এক পর্যায়ে রমা চৌধুরী নিজেই ঝোপের আড়াল থেকে বের হয়ে প্রাণপন চেষ্টা করেন ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ছিঁটেফোটা কিছু রক্ষা করার, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন।
তারপর শুরু হয় আরেক লাঞ্চনা আর অপবাদ। সমাজের চোখে সে একজন ধর্ষিতা নারী। পাকিস্তানি হানাদারের হাতে সম্ভ্রম হারানোর পর কেউ কেউ হয়ত সহযোগিতার হাত নিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু নিকটজন সহ সমাজের কাছে শুরু হল তার দ্বিতীয় দফা লাঞ্চিত হবার পালা। পাক-হানাদারদের কাছে নির্যাতিত হবার পর সমাজের লাঞ্চনায় এবং ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়লেন রমা চৌধুরী। পোড়া দরজা-জানালা বিহীন ঘরে শীতের রাতে বস্রহীন থাকতে হয়েছে মাটিতে। গরম বিছানাপত্র নেই। সব পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। দিনান্তে ভাত জুটে না। অনাহারে, অর্ধহারে ঠান্ডায় দু`সন্তান সাগর আর টগরের অসুখ বেঁধে গেল।

ঠিক বিজয়ের আগের রাতে ১৫ ডিসেম্বর থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় সাগরের। ছেলেকে সুস্থ করতে তখন পাগলপ্রায় দশা রমা চৌধুরী'র। গ্রামের এক সাধারণ কক-ডাক্তার চেষ্টা চালালেন। সেই চেষ্টায় কোনো কাজ হল না। ২০ ডিসেম্বর রাতে সাগর মারা গেল। প্রথম সন্তানকে হারিয়ে রমা চৌধুরী তখন প্রায় পাগল হয়ে গেলেন। একই অসুখে আক্রান্ত হল দ্বিতীয় সন্তান টগরও। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অর্ধউন্মাদিনী রমা চৌধুরী নিজের ছেলে টগরকে ওষুধ খাওয়াতে গেলেন। নিজের অসাবধানতায় কখন যে ছেলে টগরের শ্বাসরোধ হয়ে গেল, টের পেল না রমা চৌধুরী। এভাবে টগরও মারা গেল।

রমা চৌধুরী'র পরের ইতিহাস আরও বিপর্যয়ের, আরো করুণ। মুক্তিযুদ্ধে নিজের সম্ভ্রম হারানোর পর দু`সন্তান হারানো রমা চৌধুরী তখন অর্ধপাগল। তার মধ্যে সমাজের লাঞ্চনা, গঞ্জনা, অভাব, জীবন সংগ্রাম ইত্যাদি সব মিলিয়ে এক সময় রমা চৌধুরী'র প্রথম সংসারেরও পরিসমাপ্তি ঘটল। পরে দ্বিতীয় সংসার বাঁধতে গিয়ে হলেন প্রতারণার শিকার। দ্বিতীয় সংসারের ছেলে টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেল। হায় কি দুর্ভাগা কপাল রমা চৌধুরী'র! বাংলাদেশে রমা চৌধুরীদের জীবন এমনই।

রমা চৌধুরী জীবনে আর জুতা পড়েননি। হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে শবদেহ পোড়ানোতে বিশ্বাস করেন না রমা চৌধুরী। তাই তিন সন্তানকেই দেয়া হয়েছে মাটিচাপা। প্রথমদিকে মুক্তিযুদ্ধের পর টানা চার বছর জুতো পড়েননি রমা চৌধুরী। এরপর নিকটজনের পীড়াপিড়িতে অনিয়মিতভাবে জুতা পড়া শুরু করলেও তৃতীয় সন্তান মারা যাবার পর আবার ছেড়ে দিয়েছেন পায়ে জুতা পরা। তারপর গত ১৫ বছর ধরেই জুতা ছাড়া খালি পায়েই পথ চলছেন রমা চৌধুরী।
এরকম অসংখ্য রমা চৌধুরী রয়েছে আমাদের আসেপাশে। আমরা কতটা অকৃতজ্ঞ বাঙ্গাল হলে তাদের জীবনের এহেন কষ্টকর দৃশ্য আজ চোখের সামনে জেগে থাকে.......!!!
নারী দিবসে ‪সকল বীরাঙ্গনা ‬ মায়েদের প্রতি থাকলো ভালোবাসা.........!!!

আজ বিশ্ব নারী দিবস। আমাদের বর্তমান বিপ্লবী বা সচেতন নারীরা তাদের অধিকার আদায়ে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছে যা বেশির ভাগই পুরুষের সাথে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। বাংলাদেশে একটা মুক্তি যুদ্ধ হয়েছিলো এবং সেই যুদ্ধে আমাদের দেশের অসংখ্য নারী দেশের জন্য নিজের সম্ভ্রম হারিয়েছিলো সেটা সম্ভবত আমাদের বর্তমান নারি সমাজ জানেন না বা জানার চেষ্টাও করেন না। তারা অধিকার আদায়ের আন্দোলন কথা বলে কিন্তু কখনো ওই বীরাঙ্গনা নারীদের নিয়ে কথা বলেছেন বা তাদের জন্য রাস্তায় মিছিল করেছেন কি? আমার চোখে পড়ে না! তারা সমঅধিকার নামক একটা অযাচিত আন্দোলন এবং অপসংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে পুরুষের উপরে উঠতে চায়। অথচ এই নারীরা কখনোই সেই সব বীরাঙ্গনা মায়েদের অধিকার আদায়ে রাস্তায় একটা মিছিল ও করেনি অথচ তারাও নারী। আজ এই নারীদিবসে আমি সেই সব নারীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি যাদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ। এবং সেই সাথে এই আশা রাখছি বর্তমান নারীরা আমাদের বীরাঙ্গনা মায়েদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শামিল হবেন।



রিপন রাফি
কবি ও সাংবাদিক