Print

সবার জন্য পেনশন প্রসঙ্গে

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ১৭.০৩.২০১৬

আমাদের সবাই কেন যেন চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি সব সময়। এটা শুধু ব্যক্তিগত বা সামাজিক নয়, আর্থিকও বটে। এতো টানাপোড়নের মাঝেও উন্নয়ন আর নিরাপত্তা আমাদের ভাবায়।

আজকের ভাবনাটি এলো যখন পত্রিকার খবরে দেখলাম, বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের খবরে বলা হয়েছে যে, ‘দেশে কোটিপতির সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ২৬৫ জন। অথচ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন মাত্র ৬ হাজার ১৭৫ জন’। এর অর্থ হলো ‘ব্যক্তিপর্যায়ের করদাতাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর শেষ হয়েছে। এই সময়ে সারাদেশে এনবিআর’র কর অফিসগুলোতে জমা পড়া আয়কর রিটার্নে ১ কোটি টাকার বেশি দেখিয়েছেন মাত্র ৬ হাজার ১৭৫ জন করদাতা’।
বাস্তবে কোটিপতির সংখ্যা কিন্তু অনেক বেশি। আয়কর থেকে বাঁচতে বা টাকা বাঁচাতে অনেকেই সত্য গোপন করেন বা সত্য পাস কাটিয়ে যান। কিংবা সম্পদের যে মূল্য ১০ বছর আগে দেখিয়েছেন যার ভিত্তিতে তাকে এখনো লাখপতি বলা হচ্ছে, আসলে তারাও অনেক আগে থেকেই কোটিপতি। ঢাকা শহরে বাড়ি বা প্লট আছে যাদের তাদের সংখ্যা কতো? তারা কি কেউ কোটিপতির নীচে? কাগজে-কলমে যাই দেখানো হউক না কেন, বাস্তবে কী?

কেন এই লুকোচুরি খেলা?

নানা কারণে মানুষ তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের সঠিক হিসাব দিতে চান না। তার মধ্যে অন্যতম কিছু কারণ এখানে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা যাক।

এক. সম্পদ থেকে আয় বেশি হলে বেশি আয়কর দিতে হয়, যা থেকে পরে তেমন কোন বেনিফিট সরকারের কাছ থেকে আসে না, বরং আরো ঝামেলা বাড়ে।

দুই. বাড়ির মতো স্থাবর সম্পত্তির জন্য বেশি হল্ডিং ট্যাক্স দিতে হয়।

তিন. সম্পদ থেকে আয় বেশি হলে পরিবারের অন্য গরীব সদস্যদের চাপ বেড়ে যায়।

চার. দৃশ্যমান সম্পদে প্রতিবেশিদের হিংসার স্বীকার হয়, নানাভাবে পরিবারের সদস্যগণ অহেতুক নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন।

পাঁচ. আয়কর বিভাগের কর্মকর্তাদের হয়রানি বাড়ে; ইত্যাদি।

আয়করের বেনিফিট ও দুর্নীতি

আমাদের দেশের বিভিন্ন সেক্টরের দুর্নীতির অন্যতম কারণ হচ্ছে, সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা। লুকোচুরি খেলার এক নম্বর কারণে বলেছি যে, সম্পদ থেকে আয় বেশি হ’লে বেশি আয়কর দিতে হয়, যা থেকে পরে তেমন কোন বেনিফিট নেই। আয়কর দেয়ার বদলে যদি রাষ্ট্র আমাদের অবসরকালীন বেনিফিট দিতো তা হ’লে এই সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা অনেকাংশেই কমে যেত, কমে যেত বিভিন্ন সেক্টরের লাগামহীন দুর্নীতি। কিভাবে তা অন্য একটা দেশের উদাহরণ থেকে দেখে নেবার চেষ্টা করবো।

আমাদের পাশের দেশ জাপান আর দুরের দেশ আমেরিকা। আমেরিকায় বলা হয় যে, দুটো জিনিস আমেরিকায় এড়ানো যায় না; এক. মৃত্যু, দুই. আয়কর। আমেরিকানদের সবাই আয়কর দেন, সাধারণ মানুষও। কারণ তারা তাদের দেয়া করের হারের বদলে অবসরকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অবসরকালীন আর্থিক সুবিধা পান, তা তিনি যে ধরণের চাকরি বা ব্যবসা করেন না কেন। যেমন ঘটে আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারি-কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে। জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ করের টাকায় বেতন পান আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারি-কর্মকর্তাগণ, যেখানে তাদেরও কন্ট্রিবিউশন আছে। কিন্তু দেশের রাজস্বে আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারি-কর্মকর্তাগণের অবদান কতটুকু আর অবসরকালীন সুবিধা পান কতটুকু? সেটাই বড় প্রশ্ন।

করের টাকায় কী হয়?

দেশের সব উন্নয়ন হয় করের টাকায়। রাস্তা, ব্রিজ, সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি, আর তার পরিচালনা ব্যয় নির্বাহ করা হয় করের টাকায়। উন্নয়নের জন্য দাতাদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের টাকার কিস্তিও দেওয়া হয় এই টাকায়। এই টাকা আসে জনগণের উপর চাপানো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে। পরোক্ষ কর দেশের সবাই দেন। কিন্তু প্রত্যক্ষ কর যারা যত বেশি দেন, কোনো দেশের উন্নয়নে তাদের অবদান ততো বেশি বলে ধরে নেয়া যায়। করের টাকায় আরো যা হয় তা হ’লো, সরকারি চাকুরেগণের বেতন ভাতা, অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা, ইত্যাদি। মজার কথা হ’লো, সরকারি দপ্তরে যারা খুব ছোট্ট চাকরি করেন, তাদেরও অবসরের পরে বাকী জীবন, এমনকি স্ত্রী, পুত্র-কন্যাগণ পেনশনের টাকা পান, যদিও তারা প্রত্যক্ষ কর দেন না। কিন্তু ব্যবসা বা বেসরকারি চাকরি করে যারা মাসে গড়ে ৪০/৫০ হাজার টাকা আয়কর দেন তারা কিন্তু ১ টাকাও পেনশন পান না, অবসরে। তাই ঘুষ দিয়ে হলেও সরকারি চাকরি নেবার প্রবণতা থাকে সাধারণ মানুষের মাঝে অনেক বেশি। আর যারা ঘুষ নেন তারা তাদের টাকা বৈধ করতে নানাভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নেন। আর ঘুষ গ্রহীতাদের যাতে আটকানো না যায় তার জন্য আইনের ফাঁক-ফোঁকর রেখে অধস্তন আইন তৈরি করেন বা করতে প্রভাব খাটান। অপরদিকে যারা টাকা ঘুষ দিয়ে চাকরি নেন, তারা চাকরি পাবার পরেই ঘুষের টাকা উঠানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন—এসব সবারই জানা। এই ঘুষ দিতে আর নিতে গিয়েই শুরু হয় নানা চক্র, আসে নৈতিক অবক্ষয়, নানামুখী। যা আমাদের মতো সমাজের এখন খুব বড়, জটিল সমস্যা।

কেন ঘুষের লেন দেন?

সবাই জানেন এবং বিশ্বাস করেন যে, পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে প্রায় রাতারাতি তার পরিবারের সদস্যগণ রাস্তার ভিখারি হয়ে যাবে যদি তাদের নগদ টাকা আর স্থাবর সম্পত্তি বেশি না থাকে। অর্থাৎ সবাই তাদের পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা চান তাদের অবর্তমানে। তাই যেনতেন উপায়ে টাকা আয় করে তৈরি করেন বাড়ি, কেনেন জমি, খোলেন মেয়াদি হিসাব ব্যাংকে, ইত্যাদি। কারণ সবাই জানেন, বিরাট বড় কোম্পানির মালিক মরে গেলেও তার পরিবারকে সরকার সাহায্য করবে এমন কোন সিস্টেম আমাদের দেশে নেই। সরকারি চাকুরে মারা যাবার পরে পেনশনের টাকা তুলতে কতদিন লাগবে তার নিশ্চয়তা নেই। পরিবারের প্রিয় সদস্যদের আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবে তাই সাদা-কালো যাই হোক তারা টাকার পাহাড়(!) জমান, ঝুঁকি নিয়ে হলেও। মানে আমাদের দেশের সিস্টেম আমাদের দুর্নীতির দিকে ধাবিত করাচ্ছে, এমন বলা দোষের না।

কর দাতাদের সম্মান দেওয়া যায় কী?

সব দেশেই যারা যত বেশি কর দেন তাদের সম্মান ততো বেশি। একটা বড় কোম্পানির চেয়ারম্যান বা এমডিকে একেবারে সচিব পর্যন্ত স্যার ডাকেন বা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখান। তার কারণ হলো বড় বড় কোম্পানি বেশি কর দেন ব্যক্তির চেয়ে; আর সেই করের টাকায় চলে উন্নয়ন। তাই যিনি যত বেশি কর দেবেন, তিনি ততো দেশপ্রেমিক বা দেশের সম্মানী ব্যক্তি হবেন। তাই তাকে উৎসাহিত করতে পারলে বা সম্মান দেখালে বেশি করে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ কর পাওয়া যাবে। এছাড়া একজন উদ্যোক্তা ইচ্ছা করলে বছরে বছরে শত শত মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন, দেশে-বিদেশ। কিন্তু সরকার তা পারে না। তাই যে সব দেশ উন্নতি করতে চায়, তারা করদাতাদের সম্মান বেশি দেখায়। এমন অনেক উদাহরণ আছে, বড় বড় কোম্পানির স্বার্থে সেই কোম্পানির দেশ অন্য দেশের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক ইরাক, লিবিয়া যুদ্ধ বা আইএস যে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’ করছে তাও কয়েকটি দেশের বড় তেল আর অস্ত্র নির্মাতার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে প্রমাণিত।

কী করা দরকার বলে মনে হয়?

একবারে এই অবস্থার পরিবর্তন হবে, সেই দাবি কেউ করে না। তবে এটা থামাতে শুরু করতে হবে কিছু দিয়ে। আর সেটা হলো দেশের মানুষের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনী তৈরি করা। দেয়া করের টাকার হারের উপর ভিত্তি করে সরকারি বেসরকারি চাকুরে বা ব্যবসায়ী নির্বিশেষে করদাতাদের পেনশনের ব্যবস্থা করা খুব কঠিন কাজ না। যিনি যে পরিমাণ ট্যাক্স/কর দেবেন, তিনি সেই হারে অবসরকালীন সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ সবার জন্য পেনশন (যারা আয়করের আওতায় পড়েন না, তাদেরও, অন্য সিস্টেম আছে)। এই যদি হয় নীতি তবে করের টাকা রাখার জায়গা পাবে না সরকার। কারণ আমরা সবাই আমাদের প্রিয় সন্তানদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা চাই, আমাদের জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরেও।

করের আওতা বাড়িয়ে সব নাগরিকের আর্থিক/সামাজিক নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত করা যাবে তেমনি পদ্মা সেতুর মতো সেতু তৈরি করতে আর ভিক্ষার ঝুলি হাতে নিতে হবে না। আমি অনেক বছর ধরেই ব্যবসায়ী আর বেসরকারি চাকুরেদের জন্য আমেরিকা বা উন্নত দেশের আদলে পেনশন চালুর পক্ষে কথা বলে যাচ্ছি বিভিন্ন ফোরামে। ইদানীং কিছু কানাঘুষা শোনা গেলাও কিছুই হচ্ছে না বাস্তবে।

সায়েদুল আরেফিন : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট।
This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.