আজ মঙ্গলবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সদ্য প্রাপ্তঃ

*** সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ হত্যা মামলায় আপিল বিভাগের রায় ১০ অক্টোবর * বন্যায় টাঙ্গাইলে সেতুর সংযোগ সড়কে ধস; উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার রেলযোগাযোগ বন্ধ * রাজারবাগে এক নারী কনস্টেবলকে ধর্ষণের অভিযোগে তার এক সহকর্মী গ্রেপ্তার * কোটালীপাড়ায় হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ফায়ারিং স্কোয়াডে ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় * সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ হত্যা মামলায় আপিল বিভাগের রায় ১০ অক্টোবর * বন্যায় টাঙ্গাইলে সেতুর সংযোগ সড়কে ধস; উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার রেলযোগাযোগ বন্ধ * রাজারবাগে এক নারী কনস্টেবলকে ধর্ষণের অভিযোগে তার এক সহকর্মী গ্রেপ্তার * কোটালীপাড়ায় হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ফায়ারিং স্কোয়াডে ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়

Bangladesh Manobadhikar Foundation

Khan Air Travels

ঐতিহাসিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আলামুত

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ০৭.০১.২০১৭

আলামুতের কাজভিন প্রদেশের উত্তর দিকে অবস্থিত এ অঞ্চল।

ঐতিহাসিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই লীলাভূমিতে রয়েছে রূপকথার মতো সবার পরিচিত বেশ কিছু কেল্লা, নির্জলা সুন্দর প্রকৃতি। এগুলোর প্রেমে কে না পড়ে পারে বলুন! বিশ্ব পর্যটকরা তো বটেই ইরানের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজনও এই কাজভিনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বেড়াতে আসে এখানে।আলামুতের খ্যাতি বহু কারণে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা তো বলেছি। কাজভিনের উত্তরাঞ্চলীয় পার্বত্য অংশে অবস্থিত এই আলামুতে যে কেল্লাটি রয়েছে তার কারণেও এই অঞ্চলটি বেশ পরিচিতি পেয়েছে। আরেকটি কারণ হলো এখানে ছিল ইসমাইলিয়া ফেরকার প্রধান ‘হাসান সাব্বাহ’এবং তার পরবর্তী প্রধানের শাসনকার্য পরিচালনার মূল কেন্দ্র। আলামুত কেল্লা ‘ঈগলের বাসা’ নামে পরিচিত। এই কেল্লার উচ্চতা দুই হাজার একশ’ মিটার উপরে। একটি পাহাড়ের ওপরে এই কেল্লাটি গড়ে তোলা হয়েছে। কেল্লার চার দিকই বেশ উঁচু এবং খাড়া রকমের। কেবল উত্তর-পূর্ব দিকের শেষ প্রান্তেই রয়েছে প্রবেশদ্বার।

নুজহাতুল কুলুব নামক ইতিহাস গ্রন্থে লেখক হামদুল্লাহ মুস্তাওফি লিখেছেন, ২৪৬ হিজরিতে এই কেল্লাটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যপঞ্জি অনুযায়ী রাসূলে খোদার বংশধর হাসান বিন যায়েদ আলাভি’র আদেশে আলামুত দূর্গ নির্মিত হয়। চারশ’ তিরাশি হিজরিতে হাসান সাব্বাহ’র হাতে পড়ে কেল্লার দায়িত্ব। ছয়শ’ চুয়ান্ন হিজরিতে ইসমাইলিয়া ফেরকার শাসকদের শাসনকেন্দ্র থাকাকালে মোঙ্গল সম্রাট হালাকু খানের আদেশে কেল্লাটিতে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইসমাইলিয়া ফেরকার অনুসারীরা বছরের পর বছর ধরে এখানে বিশাল একটি লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিল, মোঙ্গলদের হামলার পর ওই লাইব্রেরিটি মোঙ্গলদেরই হাতে পড়ে। হালাকু খান আদেশ দেয় লাইব্রেরিটিকে ধ্বংস করে ফেলতে।

কিন্তু ইরানের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক আতা মুল্ক জোভেইনি হালাকু খানকে অনুরোধ করে লাইব্রেরির গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিতে। হালাকু খানের অনুমতিক্রমে ওই সাহিত্যিক লাইব্রেরি থেকে কুরআনসহ সাহিত্য, ইতিহাস, জ্যোতির্বিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাচীন বইগুলো সরিয়ে নেন। তবে বাদবাকি বইগুলোসহ লাইব্রেরির সরঞ্জামাদি আগুনে পুড়ে ফেলা হয়। তারপর থেকে ওই কেল্লা কারাগার এবং নির্বাসন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হয়ে এসেছে। এ অবস্থা সাফাভি বাদশা শাহ তাহমোসেবের হুকুমত পর্যন্ত চলে। তবে আলামুত বহু বছর গিলান এবং মযান্দারনের শাসকদের অধীনে ছিল। সে সময় কেল্লা স্থাপনার মেরামত করা হয়েছিল। কিন্তু দু:খজনক ব্যাপারটি হলো কাজারি শাসনামলে আলামুত কেল্লায় গুপ্তধন অনুসন্ধানের জন্য যে খননকাজ চালানো হয়েছিল ওই খননকাজের ফলে কেল্লা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।আলামুত দুর্গ এলাকার লোকজন এই কেল্লাকে ‘হাসান কেল্লা’ নামে ডেকে থাকেন। কেল্লাটি দুই ভাগে বিভক্ত। পশ্চিম অংশের উচ্চতা পূর্বের অংশের চেয়ে কিছুটা বেশি। এই অংশকে বলা হয় উচ্চ দূর্গ এবং বৃহৎ দূর্গ। আর পূর্বের অংশকে বলা হয় নীচু এবং ছোটো অংশ। লম্বায় দূর্গটি ১২০ মিটারের মতো আর প্রস্থে কোথাও ১০ মিটার কোথাও আবার ৩৫ মিটারের মতো। সারাবছর ধরেই এখানে বহু মানুষের বসবাস থাকায় ব্যাপক পরিমাণ পানির প্রয়োজন পড়তো। তাই কেল্লা নির্মাণ করার সময়েই নির্মাণ শিল্পী বা স্থপতিরা বিশেষ উপায়ে সেখানে পানি জমিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। অনেক দূর থেকে পাথর কেটে কেটে নালা তৈরি করে ওইসব জলাধারে পানি জমানোর আয়োজন করা হয়েছিল। দূর বলতে কেল্লার উত্তরাঞ্চলীয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ‘কালদার’ ঝরনা বা ফোয়ারা থেকে আনা হয়েছে ওই পানি।

দূর্গের পূর্ব অংশে ছিল সেনাসহ তাদের পরিবার পরিজনদের আবাসিক ব্যবস্থা। পশ্চিম অংশে তিনটি ছোটো ছোটো জলাধার তৈরি করা হয়েছে পাথুরে পাহাড়ে কেটে কেটে। বেশ কটি রুমও বানানো হয়েছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেগুলো এখন নষ্ট হয়ে গেছে। তবে কেল্লার উঁচু এবং নীচু অংশের মাঝখানে একটা মাঠ বা স্কোয়ার বানানো হয়েছিল। ওই স্কোয়ারের চারপাশে যে উঁচু দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল ওই দেয়াল কার্যত দূর্গটিকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। স্কোয়ারের মাঝখানে এখনো তার ধ্বংসাবশেষ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু কেল্লার টাওয়ারগুলো এখনো তাদের অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল বৃহৎ টাওয়ার ছাড়াও আরও তিনটি টাওয়ার আছে কেল্লাতে। একটি উত্তর কোণে, আরেকটি দক্ষিণ কোণে এবং পূর্বকোণেও একটি টাওয়ার রয়েছে।

লাম্বেসার নামে আরেকটা কেল্লা আছে কাজভিনে। আলামুত কেল্লার পর ইসমাইলিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ কেল্লাগুলোর মধ্যে এই লাম্বেসার বেশ নামকরা। জাওয়ামেউত তাওয়ারিখ নামক গ্রন্থে লেখক খাজা রাশিদুদ্দিন ফাজলুল্লাহ হামেদানি লিখেছেন, সালজুকি বাদশা মালেকশাহ সালজুকির ছেলে সুলতান মুহাম্মাদ যখন ইসমাইলিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল তখন এই লাম্বেসার কেল্লা এবং আলামুত কেল্লা ১১ বছর পর্যন্ত সুলতান মুহাম্মাদের বাহিনী অবরোধ করে রেখেছিল। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এতো দীর্ঘ সময় ধরে অবরুদ্ধ থাকার পরও কেল্লাবাসী ইসমাইলিয়ারা সুলতানের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে নি। এমনকি হালাকু খানের হামলার সময়ও কেল্লার অধিবাসীরা মাসের পর মাস প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। অবশ্য একটা সময় রোগ-ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ফলে নিরুপায় হয়ে আত্মসমর্পণ করে।
কাজভিনের আলামুত অঞ্চলে দেখার মতো আরও বহু নিদর্শন রয়েছে। প্রাকৃতিক নিদর্শনের মধ্যে একটি হলো ‘এভন’ হ্রদ। পাহাড়ের পর পাহাড়ের মাঝখানে ফিরোজা রঙের রত্নের মতো এই হ্রদ অসম্ভব সুন্দর। এই হ্রদের পানি মিষ্টি। প্রায় সাড়ে পাঁচ হেক্টর জায়গা জুড়ে হ্রদের অবস্থান। হ্রদের পানির গভীরতা বিশ মিটারের মতো। হ্রদের পানির উৎস হলো বৃষ্টিপাত। সহজেই তাই বুঝতে পারা যায় যে এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক বেশি।
কাজভিনে বহু মনীষীও জন্মগ্রহণ করেছেন। নাস্তালিক ফন্টের ওস্তাদ মির আম্মাদ হাসানি এখানেই জন্মেছেন। মির্যা হোসাইন আম্মাদ আলকুত্তাব কাজভিনি, মির্যা মুহাম্মাদ আলি খিয়ারজি কাজভিনি, আবদুল মজিদ তালেগানি এবং মালেক মুহাম্মাদ কাজভিনিসহ আরও অনেক বড়ো বড়ো মনীষী এই কাজভিনে জন্মগ্রহণ করেছেন। হস্তশিল্পের জন্যও এই কাজভিন প্রদেশটি বেশ সমৃদ্ধ।