Wednesday 7th of December 2016

সদ্য প্রাপ্তঃ

***সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী হত্যাচেষ্টা মামলায় মুফতি আবদুল হান্নানসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ***

Bangladesh Manobadhikar Foundation

Khan Air Travels

UCB Debit Credit Card

দুঃসময়ে পাথরকন্যা জাফলং

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ১৬.০৫.২০১৬

ভারতের মেঘালয় পর্বতের পাদদেশে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাথরকন্যা জাফলং।

সিলেটের সীমান্ত জনপদ গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেশ-বিদেশে বেশ পরিচিত। কিন্তু ভাঙা রাস্তা ও ধূলি-ধূসরতার কারণে দিন দিন পর্যটকবিমুখ হয়ে পড়ছে এই পর্যটন কেন্দ্রটি।
কামরান সিদ্দিকী, ঢাকা ফয়সল আহমদ বাবলু ও জাকির হোসেন, সিলেট

ভারতের মেঘালয় পর্বতের পাদদেশে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাথরকন্যা জাফলং। সিলেটের সীমান্ত জনপদ গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেশ-বিদেশে বেশ পরিচিত। কিন্তু ভাঙা রাস্তা ও ধূলি-ধূসরতার কারণে দিন দিন পর্যটকবিমুখ হয়ে পড়ছে এই পর্যটন কেন্দ্রটি। এতে আর্থিক লোকসানে পড়ছেন এই এলাকার পর্যটন-সংশ্লিষ্ট সহস্রাধিক ব্যবসায়ী। এদিকে পাথরখেকো আর ভূমিখেকোরা লুটে নিয়েছে জাফলংয়ের মাটির নিচের পাথর সম্পদ। সরকারি যথাযথ উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় যত্নের অভাবে এখন ধু-ধু মরুভূমির মতো চেহারা নিয়ে আছে জাফলং। সিলেট শহর থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের সীমান্তঘেঁষা খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়ের কোলে মনোরম পর্যটন কেন্দ্র জাফলং। এ পাহাড় থেকে উৎপন্ন সারি নদী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্তবিচ্ছেদ রচনা করেছে। জাফলং যাওয়ার পথে দেখা মেলে জৈন্তা, রাজবাড়ী, তামাবিল, শ্রীপুর। জাফলংয়ের ওপারে দেখা যায় ভারতের ডাউকি বন্দর। ডাউকি থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার রাস্তা পেরোলেই শিলং। জাফলং মূল পর্যটন কেন্দ্র থেকে নদী পার হয়ে পশ্চিমে ওপারে গেলেই পাওয়া যায় নৃগোষ্ঠী খাসিয়াদের গ্রাম সংগ্রামপুঞ্জি। খাসিয়াদের বিচিত্র জীবণপ্রণালির সঙ্গে পরিচয় ঘটে এখানে। কিন্তু অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলন আর ভাঙা রাস্তায় হারিয়ে যাচ্ছে জাফলংয়ের পর্যটন সম্ভাবনা।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, সিলেটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের সিলেট থেকে জাফলং পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার রাস্তা খানাখন্দে ভরা। বিশেষ করে জাফলংয়ের বল্লাঘাট থেকে জৈন্তাপুর উপজেলা সদর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খুবই নাজুক। রাস্তার পিচ উঠে অনেক জায়গায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে যানবাহন চলাচলের প্রায় অনুপযোগী রাস্তাটি পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। তারপরও এই রাস্তায়অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন চলাচল করছে পর্যটক, কয়লা ও পাথরবাহী কয়েক হাজার গাড়ি। অন্যদিকে জাফলংয়ের তামাবিল শুল্ক স্টেশন এলাকা থেকে শুরু করে মামার বাজার বল্লাঘাট পিকনিক স্পট পর্যন্ত ধুলা আর ধুলা। দিনের বেলাতেই হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। ভারত থেকে এলসির মাধ্যমে আমদানিকৃত পাথর রাখার জন্য তামাবিল শুল্ক স্টেশনের আশপাশ এলাকায় মহাসড়কের পাশে ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। সেই ডাম্পিং স্টেশন থেকে ট্রাকযোগে বিভিন্ন ক্রাশার মিলে পাথরগুলো সরবরাহ করার সময় ধুলার সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে মামার বাজার এলাকায় মহাসড়কের দু'পাশে স্থাপিত ক্রাশার মেশিন থেকে পাথর ভাঙার সময় নির্গত ধুলো রাস্তায় পড়ছে।এদিকে গোয়াইনঘাটের পর্যটন কেন্দ্র বিছনাকান্দি ও কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি থেকে চলছে ব্যাপক পাথর লুটপাট। এতে সেখানকার সৌন্দর্যহানি ঘটছে বলে মনে করছেন পর্যটকরা। অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলন ও সড়কের বেহাল অবস্থা জাফলংয়ে পর্যটক আগমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।টাঙ্গাইল থেকে জাফলং বেড়াতে আসা পর্যটকবাহী বাসচালক হারুন মিয়া জানান, পর্যটক নিয়ে মাঝে মধ্যেই জাফলং আসেন তিনি। ভাঙাচোরা রাস্তা আর ধুলাবালির ছড়াছড়িতে ভোগান্তির শেষ নেই।

জাফলং পিকনিক সেন্টারের ইজারা গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সিরাজ আহমেদ জানান, রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কারণে পর্যটকের সমাগম দিন দিন হ্রাস পাওয়ায় পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।পর্যটকদের জন্য জাফলংয়ে গড়ে উঠেছে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনকেন্দ্রিক নানা ব্যবসা। ব্যক্তিমালিকানায় কয়েকটি আবাসিক হোটেল ছাড়াও এখানে রয়েছে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো, সড়ক ও জনপথ বিভাগের গেস্ট হাউস। সিলেটের হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউস ওনার গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক তাহমিন আহমদ সমকালকে বলেন, সিলেটে রেল, সড়ক ও নৌপথ সবই রয়েছে। কিন্তু ভাঙাচোরা সড়কের কারণে দিন দিন পর্যটকের সংখ্যা কমছে। হাজার হাজার টাকা বিনিয়োগ করে প্রতি মাসে লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। তিনি বলেন, প্রায় প্রতিদিনই ভারতের শিলং যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন। সিলেটের সৌন্দর্য তুলে ধরা হলে ভারত থেকেও অনেক পর্যটক আসবেন এখানে। এ জন্য সিলেট-শিলং একটি সেতুবন্ধ তৈরি করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান তিনি।বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুুল করিম কীম বলেন, সিলেটের পরিবেশ এখন আর আগের মতো নেই। জাফলংয়ের স্বচ্ছ পানিতে এখন আর মাছের খেলা দেখা যায় না। ভূমিখেকোরা পাহাড়, টিলা কেটে সাবাড় করে দিয়েছে।

সিলেট সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মনিরুল ইসলাম সিলেট নগরী ও নগরীর বাইরে অনেক সড়কের বেহাল অবস্থার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, সিলেট-জাফলং সড়কে সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড়কের কাজের জন্য নতুন করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। শিগগির সিলেটের মহাসড়ক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সড়কের কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।এদিকে সিলেট শহরতলির লাক্কাতুরা, মালনীছড়া, খাদিম, বরজানসহ বিভিন্ন চা বাগানে পর্যটকের সংখ্যা কমছে বলে জানা গেছে। লাক্কাতুরা চা বাগানের পাহারাদার নিতেশ মাহালী জানান, সিলেটের অনেক স্থানে টিলা কাটা হয়ে গেছে। কিছু টিলা কোনো রকমে টিকে আছে। আগে প্রতিদিন ৫-৬শ' লোক এলেও এখন আর আগের মতো লোকজন এখানে আসে না। তিনি বলেন, এখন চা বাগানের ভেতর গড়ে উঠছে আবাসিক এলাকা; হারিয়ে যাচ্ছে বনাঞ্চল। এ কারণেও পর্যটকের সংখ্যা কমছে বলে তার মত।

দেশের প্রধান প্রধান পর্যটন কেন্দ্রের বেহাল যাতায়াত ব্যবস্থা নিয়ে পর্যটন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান বলেন, পর্যটনের প্রথম প্রতিবন্ধকতাই হলো ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকা। রাস্তা না থাকলে আপনি পছন্দের জায়গায় যাবেন কীভাবে? থাকা-খাওয়ার সমস্যাকে দ্বিতীয় প্রধান সমস্যা হিসেবে মনে করেন তিনি।