Print
বিভাগঃ রাজনীতি

সরকার ও আদালতের দিকেই তাকিয়ে জামায়াত

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ০৬.০৫.২০১৬

আদালতের আদেশে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন স্থগিত থাকায়

এখনই নতুন নাম ও রাজনৈতিক নতুন কোনও লাইন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি জামায়াতে ইসলামী। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা না থাকায় শিগগিরই শীর্ষ নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসছে না দলটিতে। ‘রুকন সম্মেলন’ (দলীয় কাউন্সিল) করে এখনই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের কোনও প্রয়োজন আছে বলেও মনে করছে না জামায়াত। শেষ পর্যন্ত সরকার জামায়াতের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং নিবন্ধন বিষয়ে আদালতের কী রায় আসে—এ দুটো বিষয়ের ওপরই পরবর্তী সব ধরনের কার্যক্রম নির্ভর করছে। বৃহস্পতিবার দলের ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি বিভাগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ সব তথ্য পাওয়া গেছে।দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের সিনিয়র নেতারা একে একে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত ও দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত হওয়ায় নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে জামায়াত। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার মতিউর রহমান নিজামীর আপিলের রিভিউ খারিজ হওয়ার পর এ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। সবমিলিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আসার আগ পর্যন্ত ‘আছি-নাই’ অবস্থার মধ্য দিয়েই তৎপরতা চালিয়ে যাবে দলটি।
জামায়াতের নায়েবে আমিরদের মধ্যে অধ্যাপক একে এম নাজির আহমাদ মারা গেছেন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দি অবস্থান মারা যান নায়েবে আমির মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসূফ। মৃত্যুদণ্ডাদেশ পেয়েছেন সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সোবহান। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লার। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম ও মীর কাসেম আলী কারাবন্দি। বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। এর বাইরে সিনিয়র নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হয়েছেন। আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ারও পুলিশের করা বিভিন্ন নাশকতার মামলায় কারাগারে।জানা গেছে, দলের বর্তমান ‘ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব’কে ভারমুক্ত করার কোনও চিন্তা আপাতত নেই জামায়াতের। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কারাবন্দি দলের আমির মতিউর রহমান নিজামীর আপিলের রিভিউ নিষ্পত্তি হয়েছে বৃহস্পতিবার। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের পর থেকেই সেক্রেটারি জেনারেল পদটিতে ডা. শফিকুর রহমান ভারপ্রাপ্ত হিসেবে রয়েছেন। নিজামীর রায় কার্যকর হলে ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদও থাকবেন আমিরের দায়িত্বে। এক্ষেত্রে রুকন সম্মেলনের সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ।যদিও নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন স্থগিত থাকায় রুকন সম্মেলনে আইনত কোনও বাধা নেই। তারওপর রুকন সম্মেলনের সুযোগ না থাকলে ‘মেইল বা খামে’ গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তিনজনের প্যানেল থেকে আমির নির্বাচন করা যেতে পারে। ইতোমধ্যে গত বছরের শেষ দিকে এবং চলতি বছরের প্রথম দিকে গঠনতন্ত্র অনুসারে উপজেলা-থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রায় শেষ করে আনা হয়েছে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যারা নিহত হচ্ছেন, তারা আল্লাহর দায়িত্বে যাচ্ছেন। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন এখন তো হবে না। ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে মকবুল আহমাদ, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে ডা. শফিক সাহেব আছেন।ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় এক প্রচার সম্পাদক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জামায়াতের পরবর্তী পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিতই থাকছে। এই মুহূর্তে নেতৃত্ব নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। দলের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় কাউন্সিলের কোনও আইনগত বাধা নেই। তবে সরকার চূড়ান্ত অর্থে জামায়াত বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, এটি এখনও অজানা।
বর্তমানে পেশাজীবী এই নেতা আরও বলেন, সরকারের প্রথম টার্গেট ছিল জামায়াতকে বিএনপি থেকে বের করে আনা। যেহেতু সেটি সম্ভব হয়নি, এ কারণে এখন আর কোনও হিসাব মিলবে না। সম্ভবত, নতুন নামের বিষয়েও ভাবতে হবে। তবে এটি সহসাই হচ্ছে না।জামায়াতের গঠনতন্ত্র থেকে জানা যায়, দলটির আমির নির্বাচনের সময়সীমা তিন বছর। তবে গত বছরের জুনে দলের মুদ্রিত গঠনতন্ত্রের ৫৯তম সংস্করণের ধারা ১৫-এর ৬ এর (ঘ) উপ-ধারায় বলা হয়েছে, ‘কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বিবেচনায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জামায়াতের আমির নির্বাচন অনুষ্ঠান যদি কিছুতেই সম্ভব না হয়, তা হলে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত আমির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার অনুমোদন সাপেক্ষে নিজ পদে বহাল থাকবেন।’ এ কারণে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা তৈরি না হওয়ায় তিন বছরের জায়গায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ দুই সেশন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন।নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদকেই প্রথম পছন্দ দলের এই মুহূর্তের নীতি-নির্ধারকদের। সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে ডা. শফিকুর রহমানের পরিবর্তনের সম্ভাবনা আপাতত কম। এর বাইরে নতুন নায়েবে আমির ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, অধ্যাপক তাসনীম আলম, ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, মাওলানা আবদুল হালিম আলোচনায় আছেন।

জানতে চাইলে জামায়াতের কোনও দায়িত্বশীলই এ নিয়ে পরিষ্কার কোনও মন্তব্য করতে চাননি। দলটির নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এ প্রতিবেদকে বলেন, কেন্দ্রের নির্বাচন তো তিন বছর পর পর। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হয়েছে। শিগগিরই নতুন কমিটির কোনও সম্ভাবনা নেই।এ নিয়ে কোনও মন্তব্যই করতে রাজি হননি দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসা প্রিন্সিপাল মাওলানা যাইনুল আবদীন। তিনি বলেন, এ নিয়ে দায়িত্বশীলরা বলবেন। আমি অসুস্থ।সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ছেলে হাসান ইকবাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জামায়াত একটি ব্যুরোক্রেটিক সংগঠন। নেতৃত্বের সংকট তৈরি হবে না। তবে হ্যাঁ, যদি বলেন, দলের বেশি অভিজ্ঞ, বেশি শিক্ষিত নেতারা চলে যাচ্ছেন- সেটি ঠিক। এক্ষেত্রে যারা নতুন আসবেন, তাদের অভিজ্ঞতা সাবেক নেতাদের চেয়ে কম। তিনি আরও মনে করেন, জামায়াতের নতুন নামে আসা উচিত। এক্ষেত্রে তার বাবা কামারুজ্জামানও পরামর্শ দিয়েছিলেন।যদিও হাটহাজারী জামায়াতের সেক্রেটারি প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম দাবি করেছেন, নতুন নাম নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনও নির্দেশনা এখনও তৃণমূলে যায়নি। তার মতে, কেন্দ্রীয় নেতারা সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার হলেও নেতৃত্বের সংকট নেই। তিনি বলেন, আমাদের দলের নেতৃত্ব মানা ফরজ। কোরআন ও হাদিসে আলোকে আমরা নেতাদের অনুসরণ করি। ফলে, যিনিই নেতৃত্বে আসবেন, আমরা তাকেই মানব।