Print
বিভাগঃ রাজনীতি

সরকার উৎখাতে ‘মোসাদ ষড়যন্ত্রে’ জড়িত কে এই আসলাম চৌধুরী ?

জাতীয় ডেস্ক | তারিখঃ ১২.০৫.২০১৬

সরকার উৎখাতে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ’এর সঙ্গে ‘পরিকল্পনা’ করছেন বিএনপির নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক আসলাম চৌধুরী।

খুব অল্প সময়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা বনে যাওয়া আসলাম চৌধুরী সম্প্রতি ভারতে রাজধানী দিল্লিতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সেখানে ইহুদি কট্টরপন্থী দল লিকুদ পার্টির এক নেতার সঙ্গে বৈঠকের একাধিক ছবিও তুলেছেন।
এ নিয়ে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এরপর থেকেই মঙ্গলবার রাত থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও বিএনপির এই নেতা। তাকে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা হন্যে হয়ে খুঁজেছে।
তবে মঙ্গলবার বিকেলে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আমাদের সময় ডটকমকে বলেছেন, ‘মোসাদ’এর সঙ্গে সরকার উৎখাতের তৎপরতার খবর ভিত্তিহীন ও কল্পকাহিনী ছাড়া কিছুই না। আমি ব্যবসায়িক কাজে ভারতে গিয়েছিলাম। সেখানে শিপন বাবুর সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি আমাকে একটি অনুষ্ঠানে নিয়ে যান। যেখানে তেল আবিব-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে একটি সেমিনারের পর চা চক্রে গিয়েছিলাম এবং একটি গ্রুপ ছবিতে অংশ নিয়েছিলাম। ওই ছবি দিয়ে যে সংবাদ উপস্থাপন করা হয়েছে তা ভিত্তিহীনভাবে আমাকে সরকার উৎখাতের ঘটনার সঙ্গে জড়ানোর অপচেষ্টা করা হয়েছে।’
এদিকে আসলাম চৌধুরীর ‘মোসাদ’ কানেকশন নিয়ে সরকারের অন্দর মহলে নানা বিশ্লেষণ চলছে। খোদ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, মোসাদকে ব্যবহার করে বিএনপি ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রযেছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও তাকে খুঁজছেন। সরকার উৎখাতে এ নেতার সম্পৃক্ততার খবরে তোলপাড় চলছে খোদ বিএনপিতেও। দলের এমন একজন নেতার ‘মোসাদ’ কানেকশন নিয়ে বিস্মিত দলের নেতাকর্মীরাও।
দলীয় একটি সূত্র জানায়, টাকার জোরে ১৪ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বিএনপির তারকা নেতা বনে গেছেন তিনি। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা আসলাম চৌধুরী ২০০২ সালে জিয়া পরিষদের মাধ্যমে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তিনি তখন জিয়া পরিষদ, চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি।
এর দুই বছরের মাথায় জেলার সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন তিনি। পাশাপাশি জায়গা করে নেন কেন্দ্রে ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদে। পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ২৬ এপ্রিল জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর কাছ থেকে কেড়ে নেন সভাপতির পদ। তার দুই বছর পর এখন দলের যুগ্ম মহাসচিবের মতো পাওয়ারফুল পদে আসীন হয়েছেন নানা সময়ে বিতর্কিত ও সমালোচিত এ বিএনপি নেতা।
জানা গেছে, রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরুর আগে এ বিএনপি নেতা বিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে কলেজের শিক্ষকতায় যোগ দেন। শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে ১৯৯৬ সালে তিনি এফসিএ পাস করেন। এরপর একটি সিমেন্ট কোম্পানির অর্থ ব্যবস্থাপক পদে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে আরেকটি সিমেন্ট কোম্পানিতে সিএফও (হিসাব বিভাগের প্রধান) পদে কর্মরত ছিলেন। চাকরিতে থাকা অবস্থায় তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।
এর মধ্যেই তিনি ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে আসলাম চৌধুরী বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং শিল্পপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। এসব প্রতিষ্ঠানের নামেই তিনি সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন।
আসলামের ব্যাংক ঋণ হাতিয়ে নেওয়ার কৌশলও বেশ চমকপ্রদ। তা হলো রুগ্ন শিল্প কারখানা। জোট সরকার আমলে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বেশ কয়েকটি রুগ্ন শিল্প কিনেন আসলাম। পরে সেগুলো চালু করার নামে দেশের একাধিক ব্যাংক থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা ঋণ হাতিয়ে নেন। যার অধিকাংশ এখনও অনাদায়ী।
ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়ে অল্প সময়ে গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। রাইজিং গ্রুপ নামে গড়ে তোলেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সীতাকু- ও দেশের বিভিন্ন স্থানে তার রয়েছে একাধিক সিএনজি ফিলিং স্টেশন। বোয়ালখালীতে আছে কনফিডেন্স সল্ট নামে একটি অত্যাধুনিক লবণ কারখানা। কক্সবাজারে তার রয়েছে বিপুল পরিমাণ জমিজমা। চকরিয়ার হারবাংয়ের অবস্থিত ইনানী রিসোর্ট এর মালিকও তিনি।
নগরের নাসিরাবাদ ও সাগরিকা সড়কে তার রয়েছে ফিশ প্রিজার্ভার্স নামে দুটি মৎস্য সংরক্ষণ কারখানা। বিএনপি নেতা আসলামের ব্যাংকঋণের পরিমাণ ঠিক কত, তা জানা না গেলেও বিয়য়টি নিয়ে শিগগির তদন্তে নামবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবি আর)। একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
খুব অল্প সময়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা বনে যাওয়া আসলাম চৌধুরী ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চট্টগ্রামের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুন্ড উপজেলায় ধারাবাহিক সহিংসতার মূল ম“দাতা হিসেবে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে এসব সহিংসতার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা দায়ের হয়।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি ইসরায়েল ভিত্তিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘জেরুজালেম অনলাইন ডট কম’ একটি সংবাদ প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোমেসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি’র প্রধান মেন্দি এন সাফাদি সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন। সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করছেন তিনি। সেখানে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। নতুন সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে।’ওই বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ থেকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকশেষে একটি গ্রুপ ছবি তোলেন সবাই। সেখানে ছবিতে বাম দিকে আসলাম চৌধুরীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আর সামনেই বসে আছেন মেন্দি এন সাফাদি।