মুদ্রণ

ধর্ম যেমন ছিল তেমনই আছে, মানুষ পাল্টেছেঃ তসলিমা নাসরিন

বিডিনিউজডেস্ক.কম
তারিখঃ ২৯.০৫.২০১৫
দেশের খবর নিতে গেলেই আজকাল দেখছি শিশু ধর্ষণ বাড়ছে। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে এক শিশুকে ধর্ষণ করেছে ইমাম। সাতকানিয়ায় মুয়াজ্জিন ধর্ষণ করেছে আট বছর বয়সী এক শিশুকে। সিলেটের মৌলভীবাজরে এক প্রিন্সিপাল নবম শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে।

আগে আমরা ভাবতাম মসজিদ-মাদ্রাসার মৌলভীদের বিজ্ঞানবোধ না থাকলেও নীতিবোধ থাকে। এখন দেখছি ওদের কারো কারো সেটিও নেই। বাবা মা'রা নির্দ্বিধায় নিজেদের সন্তানকে সঁপে দেন ওদের হাতে। ওদের কেউ কেউ অসহায় নিরীহ শিশুদের ধর্ষণ করতে দু'বার ভাবে না। শিশুদের শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার করে নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায়। অনুমান করতে পারি কতটা বর্বর হলে, কতটা কুৎসিত হলে, কতটা নৃৃশংস হলে শিশু ধর্ষণে উদ্যোগী হয় পুরুষরা! অথচ ওরা নাকি দিনরাত আল্লাহর নাম জপে, আল্লাহর কালাম পড়ে, আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত।

কী যুগ এসেছে? আল্লাহর কালাম পড়া আল্লাহর নাম জপা পরহেজগার মুসলমানদের হাতে এখন ধারালো চাপাতি, তাদের হাতে এখন পিস্তল, রাইফেল, তাদের হাতে অস্ত্র, মারণাস্ত্র। কিছুদিন আগে খবরে পড়লাম, আইএস নাকি এক বছরের মধ্যে পাকিস্তানের কাছ থেকে পারমাণবিক বোমা কিনছে। যেভাবে সিরিয়া আর ইরাকের প্রাচীন ঐতিহ্য আর ইতিহাস ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, সেভাবেই পৃৃথিবীটাকে পারমাণবিক বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে ওরা। মানুষ খুন করতে করতে, যা পাচ্ছে হাতের কাছে সব ধ্বংস করতে করতে, ধ্বংসের নেশায় পেয়েছে এদের। এরা যতদিন বাঁচে ততদিন ধ্বংস করবে, আর ধর্ষণ করবে। বোকা হারাম তো অগুনতি শিশুকে ধরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণ এরা ধর্মের নামেই করছে। ধর্ম কি ধর্ষণের কথা বলে? উত্তরে বেশির ভাগ মানুষ বলবে, না। তবে ধর্ষণের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক না থাকলেও, ধর্ষণের সঙ্গে নারীবিদ্বেষের সম্পর্ক আছে, এ ব্যাপারে কোনও দ্বিধা নেই।

বাংলাদেশে সেদিন ধরা পড়েছে একটি কোম্পানির আইটি প্রধান আমিনুল ইসলাম বেগ। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, লোকটি প্রকৌশলীর আড়ালে একজন দুর্ধর্র্ষ জঙ্গি নেতা। জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) বর্তমান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন। কোম্পানির চাকরি তার ওপরের লেবাস। প্রকৃতপক্ষে তিনি বাংলাদেশের জঙ্গি জেএমবি ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস-এর বাংলাদেশের সমন্বয়কারী। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের দিয়ে 'জিহাদ' করানোর উদ্দেশ্যে তিনি কাজ করছিলেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে ইরাক ও সিরিয়ায় পাঠিয়েছেন। আরও যারা যেতে ইচ্ছুক তাদের পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পাশাপাশি বাংলাদেশেও 'ইসলামী খেলাফত' প্রতিষ্ঠায় 'জিহাদ' করার জন্য আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের উদ্বুদ্ধ করছেন। অবাক লাগে, ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কার দূর করার জন্য বিজ্ঞানশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলি, অথচ সবচেয়ে বেশি যারা ধর্মান্ধ-জিহাদি হিসেবে আত্দপ্রকাশ করছে, তারা বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত লোক। বিজ্ঞানশিক্ষা এরা কোনও ভালো কাজে খাটায় না। যদি আদৌ খাটায়, তবে ধ্বংস করার জন্য, নির্মাণ করার জন্য নয়। আইএস-এর গণহত্যা কেউ রোধ করতে পারছে না। সিরিয়ার পালমিরা অঞ্চলটি দখল করার পর ৪০০ জনকে ওরা হত্যা করেছে, যাদের বেশির ভাগই নারী আর শিশু। ওরা আল্লাহর দোহাই দিয়ে নারী আর শিশুকে ধর্ষণ করছে, হত্যা করছে।

বাংলাদেশ আজও প্রতিভাবান ব্লগারদের যারা খুন করেছে, তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি। শাস্তি দেওয়া দূরের কথা। এদিকে আবার আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্তত এতদিনে একটা ভালো কাজ করেছে সরকার। অবশ্য নিষিদ্ধ করে কী ছাই হবে যদি না খুনিদের গ্রেফতার করা না হয়। একটি নিষিদ্ধ দলের লোক যুক্তিবাদীদের জবাই করে চলে যাবে, দিনে দুপুরে গর্দানে কোপ মেরে চলে যাবে, পুলিশ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, ওপরের নির্দেশ না এলে খুনিকে ধরবে না। এরকম যদি নিয়ম হয়, তবে আনসারুল্লাহর নিষিদ্ধ হওয়া না হওয়ায় নিশ্চয়ই কিছু যায় আসে না।

সেদিন শুনি গরু ধর্ষণ হয়েছে। নারী ধর্ষণ, কিশোরী ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণের পাশাপাশি গরু ধর্ষণ চলছে। নীতি আদর্শ সমস্তই লোপ পেয়েছে! অথচ আমরা এরকমই শিখেছি ছোটবেলা থেকে, যত বেশি ধর্ম বাড়বে, তত বেশি অনাচার কমবে। আমি হিসেব মেলাতে পারি না। ধর্ম কি তবে মন্দ লোকরাই বেশি পালন করে? নাকি মন্দ কাজ করার জন্য ওপরে একটা ধার্মিকের লেবাস লাগানো হয়, যেন কারও সন্দেহভাজন হতে না হয়? আমার তো মনে হয়, লেবাস দেখলেই আজকাল ধর্ষক আর খুনি বলে অনেকের সন্দেহ হয়।

আমার নানা, আমার মা ছিলেন ধার্মিক। ধর্মের অর্থ তাঁরা বুঝতেন কারও অনিষ্ট না করা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, বরং অন্যের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানো, অন্যের অভাব দূর করা। ছোটবেলায় ওঁদের মতো অনেক ধার্মিকের দেখা আমি পেয়েছি। কিন্তু এ বেলায় এসব কী দেখছি দেশে? আগে ধর্ম মানে মানুষ বুঝতো সহিষ্ণুতা, উদারতা, মানবতা। আর এখন হিংস্রতা, রমজান মাসে বিশাল খানাপিনা, ঈদে বড়াই করে গরু জবাই-এর ধুম। ভাগ্যিস আমার নানা বেঁচে নেই, মা'ও বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে ধর্মের এই রূপ দেখে ওঁরা নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পেতেন। আসলে ধর্ম যেমন ছিল, তেমনই আছে। মানুষ পাল্টেছে। বর্বর লোকরা ধর্মকে বর্ম হিসেবে রেখে যত বীভৎস হতে পারে হচ্ছে।

ধর্মকে আবার মানবিক করার সময় এসেছে। মাদ্রাসার ক্লাসঘরে মগজধোলাই হচ্ছে কি না লক্ষ্য রাখতে হবে। ইমামদের, মাদ্রাসার শিক্ষকদের চোখে চোখে রাখতে হবে যেন তারা ছেলেদের জঙ্গি হিসেবে তৈরি না করে। ধর্ম করতে এসে অধর্ম করলে চলবে কেন!

পুরুষরা অহরহই ধর্ষণ করছে। ইমাম জাতও পুরুষের জাত। কিন্তু ইমামের গুরুত্বটা অনেক। ইমামকে দেখে শেখে পুরুষরা। ইমামের পেছনে দাঁড়িয়ে পুরুষরা নামাজ পড়ে। ইমামের কথা এবং কাজকে তারা মান্য করে, ইমামের উপদেশ পরামর্শ মতো জীবনযাপন করে। সুতরাং ইমাম যদি ধর্ষক হয়, তবে সমাজের পুরুষরা তার কাছ থেকে ধর্ষক হওয়ার প্রেরণা পাবে। সুতরাং ইমামদের চরিত্র নষ্ট হলে চলবে না। ইমামদের গতিবিধি নজর রাখার ব্যবস্থা না হলে সমূহ বিপদ।

দেশে দিন দিন দুঃসংবাদের পাহাড় গড়ে উঠছে। কী ভালোই না হতো যদি দেশটি থেকে ধর্ষণের খবর না আসতো। সেদিন একটা গারো মেয়েকে গণধর্ষণ করা হলো বাংলাদেশে। মাইক্রোবাসের ভেতর। ভারত থেকে ভালো অনেক কিছু তো শেখার আছে। শিখলো শিখলো গণধর্ষণটাই শিখলো? যে লোকগুলো মেয়েটাকে ধর্ষণ করেছে, ওদের জিজ্ঞেস করুন, ওরা ধর্মে বিশ্বাস করে কি না, সবাই, আমি নিশ্চিত, বলবে, করে। আল্লাহকে মানে? বলবে, মানে। তোমরা কি নাস্তিক? জিজ্ঞেস করুন। ওরা ফুঁসে উঠবে। এত বড় অসম্মান! আমাদের নাস্তিক বললো? ওরা তীব্র প্রতিবাদ করবে, বলবে যে ওরা আস্তিক। মাঝে মাঝে মনে হয়, নাস্তিক হওয়ার পথই বোধহয় সহিষ্ণু হওয়ার, উদার হওয়ার, মানবিক হওয়ার সঠিক পথ।


সুত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন