মুদ্রণ

বিডিনিউজডেস্ক.কম
তারিখঃ ৩১.০৫.২০১৫
১৯৯৪ সালের ১১ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন দুই মার্কিন জন হারসেনি ও জন ন্যাশ এবং একজন জার্মান রিনহার্ড সেলটেন।

 

বলা হয়, খেলা নিয়ে গবেষণায় ‘গেম থিওরি’ উদ্ভাবন করেই নোবেল পেয়েছেন এ অর্থনীতিবিদরা। খেলাধুলার জগতে তখন তুমুল আলোচনা, এমন গবেষণা নিয়ে তো টেলিভিশনে বোদ্ধারা প্রতিদিনই গলা ফাটিয়ে যাচ্ছেন, এ আর নতুন কি!

২৩ মে এক সড়ক দুর্ঘটনায় সস্ত্রীক না ফেরার দেশে চলে গেলেন এ গেম থিওরির অন্যতম উদ্ভাবক ও ‘ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামের’ স্রষ্টা জন ফোর্বস ন্যাশ। কিন্তু মাত্র এক বাক্যে তত্ত্বটির গুরুত্ব প্রকাশ করা যাবে না। খেলাধুলা তো বটেই; অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ছাড়িয়ে এমনকি জীববিজ্ঞানে গেম থিওরিকে এতটাই সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে যে, অনেকের দৃষ্টিতে এটি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক উদ্ভাবন। বিশেষ করে অর্থনীতির খোলনলচে পাল্টে দিয়েছে এ তত্ত্ব। আধুনিক যুগে বিষয়টিতে কোনো জ্ঞান অর্জন করতে না পারলে একজন অর্থনীতির শিক্ষার্থী কোনোভাবেই তার শিক্ষা সমাপ্ত হয়েছে বলে দাবি করতে পারবেন না।

বর্তমানে একটু উদ্ভট শোনালেও সত্য, গেম থিওরি আসার আগে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করতেন, একটি প্রতিষ্ঠান অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের কার্যক্রমের প্রভাবকে বেশ অগ্রাহ্য করতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এভাবে কাজ চালানো যায়, যখন একটি প্রতিষ্ঠান বা ভোক্তার পদক্ষেপে বাজারটিতে কোনো প্রভাব সৃষ্টি হয় না। একচেটিয়া বাজারেও এটি সম্ভব, যখন প্রতিদ্বন্দ্বী নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে কোনো চিন্তা করতে হয় না।

অনেক ক্ষেত্রেই ধারণাটি ভুল। অনেক শিল্প আছে, যেখানে একটি প্রতিষ্ঠান তার পণ্যের দাম কমিয়ে দিলেই তা ওই শিল্পের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলতে বাধ্য। আর শুধু শিল্প খাতেই নয়, একটি দেশ কী পরিমাণ আমদানি শুল্ক বসাবে বা সুদের হার কমাবে না বাড়াবে, তাতেও প্রভাবিত হয় তার বাণিজ্যিক অংশীদার আরেকটি দেশ। আর এ উদাহরণের প্রত্যেকটিই খেলাধুলার মতো; প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের শক্তিমত্তা বিচার না করে কোনো ফুটবল কোচই নিজ দলের কৌশল প্রণয়ন করেন না।

তবে সত্য হলো, ১৯৪৪ সালে ‘থিওরি অব গেমস অ্যান্ড ইকোনমিক বিহেভিয়ার’ নামে একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে তত্ত্বটিকে প্রথম হাজির করেছেন বিখ্যাত গণিতবিদ জন ভন নিউম্যান ও অর্থনীতিবিদ অস্কার মরগানস্টার্ন। হারসেনি, ন্যাশ ও সেলটেন এটিকে আরো ঝালাই করেছেন মাত্র। পঞ্চাশের দশকে ন্যাশ একটি ধারণা তুলে ধরেন, যেখানে তিনি দেখান, খেলোয়াড়রা কোনোভাবে অবদান রাখতে ব্যর্থ হলে একটি খেলা কীভাবে এবং কোন পর্যায়ে গিয়ে শেষ হতে পারে। খেলার অন্য পক্ষগুলোর কৌশল ও শক্তিমত্তা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান থাকার পরও কোনো খেলোয়াড় নিজের কৌশল বদলাতে না চাইলে ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামের আগমন হয়।

এ ব্যাপারে ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামের একটি বিখ্যাত উদাহরণ টানা যেতে পারে। ধরা যাক, একটি শিল্পে দুটি প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের প্রতিটি ‘সর্বোচ্চ’ ও ‘সর্বনিম্ন’ মূল্য নির্ধারণ করতে পারে। যদি উভয়েই সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে তাহলে তারা সর্বোচ্চ মুনাফা পকেটে পুরতে পারবে। ধরা যাক, এক্ষেত্রে পণ্যপ্রতি ৩ টাকা সর্বনিম্ন দাম ধার্য করলে উভয়ের মুনাফা হবে ২ টাকা করে। কিন্তু যদি একটি প্রতিষ্ঠান উচ্চমূল্য এবং অন্যটি নিম্নমূল্য ধার্য করে, তাহলে নিম্নমূল্য ধার্যকারীর মুনাফা হবে ৪ টাকা এবং উচ্চমূল্য ধার্যকারীর ১ টাকা। যদি প্রতিষ্ঠান দুটো সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে তাহলে মুনাফা যথাসম্ভব বাড়াতে তারাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে বাস্তবে তা হয় না। যদি একটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে তাহলে অন্যদিকে উদ্দেশ্য থাকবে তার চেয়ে কম দামে বাজারে পণ্য ছাড়া। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ১ টাকার বদলে ২ টাকা লাভ করতে পারে। তাই দুটো প্রতিষ্ঠানই শেষ পর্যন্ত সর্বনিম্ন মূল্য বেঁধে দেয় এবং প্রত্যেকে পকেটে পুরে ২ টাকা করে।

এক্ষেত্রে ন্যাশের তত্ত্বকে আরো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রথমত. এ তত্ত্বের পূর্বশর্ত হচ্ছে, খেলাটি মাত্র একবার সম্পন্ন হবে এবং এতে খেলোয়াড়রা একসঙ্গে স্থান ও কৌশল বদল করবে। কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক খেলাগুলোয় খেলোয়াড়রা প্রতিনিয়ত একে অন্যের সঙ্গে যে কৌশল ও সম্পর্কে মিলিত হয়, তা এ তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। ন্যাশের কাজকে কিছুদূর এগিয়ে নিয়ে গেলেন রিনহার্ড সেলটেন। এখান থেকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা জন্ম নিল: অন্য পক্ষগুলো অবগত থাকলেও একজন খেলোয়াড় তার রণকৌশল কখনই বদলাবে না।

যেমন— প্রতিদ্বন্দ্বীদের দূরে সরিয়ে রাখতে একটি একচেটিয়া রাজত্বকারী প্রতিষ্ঠান মূল্যযুদ্ধের হুমকি দিতে পারে। এতে স্বাভাবিকভাবে ধরে নেয়া যায়, নতুন আগমনকারী প্রতিষ্ঠান লোকসানেরই সম্মুখীন হবে। কিন্তু এ যুদ্ধে একচেটিয়াকারীরও লোকসান হতে পারে। যদি তার লোকসানের মাত্রা খুব বেশি হয় তখন সে বাধ্য হবে নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাজার ভাগাভাগি করতে। এক্ষেত্রে মূল্যযুদ্ধের হুমকি মোটেই যৌক্তিক নয়। অর্থাত্ রাজত্বকারী প্রতিষ্ঠান পাল্টা আক্রমণ চালাতে পেরে জেনেও একটি নতুন প্রতিষ্ঠান সে বাজারে এগিয়ে যাবেই।

তাছাড়া আরেক পক্ষের মনে কী আছে, তা প্রতিটি খেলোয়াড়ই জানে— এমন আন্দাজ করা মোটেই বাস্তবসম্মত হবে না। যেমনটি হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অ্যাডাম ব্র্যানডেনবার্গার বলেছেন, ‘প্রতিটি খেলাই হয় কুয়াশার মাঝে।’ আর এ কুয়াশাই কাটিয়ে ফেলার প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন হারসেনি। তিনি দেখিয়েছেন, যেসব খেলায় প্রতিপক্ষরা পরস্পরের সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত নয়, সেখানেও আর সব খেলার মতো গেম থিওরির ব্যাখ্যা কাজ করবে।

যদি একটি পক্ষ এমন তথ্য পায়, যা অন্যাদের কাছে নেই, তাহলে সে পক্ষটি নিজের সুবিধার জন্যই তার কৌশল পরিবর্তন করবে। যেমন— মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় একটি সরকার সুদের হার বৃদ্ধি করে বাজারে যে ইঙ্গিত দেয়, তা এ ধরনের উদাহরণের মধ্যে পড়ে। অথবা এখানেও সেই একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানের কথা ধরা যেতে পারে। লোকসানের কথা মাথায় রেখেও প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় পাইয়ে দিতে এটি সবসময়ই নিজেকে মূল্যযুদ্ধকারী হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

অর্থনীতিতে এ তত্ত্ব অনেক অবদান রাখলেও সব অর্থনীতিবিদ কিন্তু এটিকে সাদরে বরণ করেননি। এর মূল কারণ তত্ত্বটি বেশ কঠিন, এটি বোঝার জন্য প্রচুর গাণিতিক জ্ঞান প্রয়োজন। বিশ্ব এখন আরো জটিল বলেই কিন্তু তত্ত্বটির জটিলতা ফুটে উঠেছে। তবে এর বাইরে তত্ত্বটির বিপক্ষে আরেকটি বড় আপত্তি আছে: এটি একটি তত্ত্ব মাত্র। এখনো এ তত্ত্বে খুব কমই বাস্তব জগতের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ব্যাখ্যা প্রদান সম্ভব হয়েছে।

এত সব সমালোচনা ও বিরোধিতাও কিন্তু গেম থিওরির গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দিতে পারছে না। চলতি বছর রেডিও তরঙ্গের নিলামের ডিজাইন করার জন্য গেম থিওরিস্টদের নিয়োগ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন। আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো তো প্রতিনিয়তই এ জটিল বিদ্যা আয়ত্তে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যেমন— ব্র্যানডেনবার্গার নিজেই হার্ভার্ডে এমবিএ শিক্ষার্থীদের গেম থিওরি পড়ান। তার মতে, ‘গেম থিওরির সময় চলে আসছে। সামনে এমন দিন আসবে যখন অর্থনীতির শিক্ষার্থীরা এ তত্ত্ব ছাড়া শিক্ষাজীবনই শেষ করতে পারবে না।’