Print

ভোলার মহিষের দুধের টকদধি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ১৭.০৩.২০১৬

ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া মধ্যবর্তী চরাঞ্চলের হাজারো মহিষের দুধের তৈরি টকদধি দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

দুধের উৎপাদন কম হলেও এর চাহিদা থাকে অনেক বেশি। তাই বেশ লাভবান দধি বিক্রেতা আর গোয়ালরাও। যে কারণে দেশের বাহিরেও রপ্তানি হচ্ছে মহিষের দুধের তৈরি টকদধি। তবে লবণ পানি, ঘাষের সল্পতা, স্বাস্থ্যসেবা আর চোরের উপদ্রপই হচ্ছে এখন প্রধান সমস্যা।  

মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মাঝখানে সোন্দর্যের রানি হিসেবে আখ্যায়িত এশিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ দ্বীপজেলা ভোলা। আর এসব নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা চরে ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে উঠেছে অন্তত অর্ধশতাধিক মহিষের খামার। যেসব খামারে এক একজন মালিকের রয়েছে শত শত মহিষের পাল। আর তেমনি একটি চর হচ্ছে মু-ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মনপুরার কোল ঘেশা পাতার চর। আর সেই চরে রয়েছে একাধিক ব্যক্তির খামার। যে খামারে রয়েছে শত শত মহিষের পাল।

তবে মজার বিষয় হচ্ছে এসব খামারের প্রতিটি মহিষের রয়েছে আলাদা আলাদা করে নাম। ওই নাম ধরে ডাক দিতেই সারা দেয় মহিষ। এ যেন বাথানদের সাথে মহিষের এক বিশেষ সম্পর্ক। সকালে খামারের বাতানরা ওই মহিষগুলো যখন ছেড়ে দেয় তখন বাথানদের রাখা মহিষের নাম কালাপাখি, কালীকুমার, মধুচাঁন, মধুমালা, লালমনি, বোয়ার্নি ও বর্ষিসহ আরো বাহারি ধরনের রাখা নাম ধরে ডাক দিতেই সারা দেয় আর ওই মহিষের বাচ্চাটি ছুটে যায় তার মায়ের কাছে। এটি যেন বাথানদের সাথে ওই মহিষগুলোর অসাধারণ এক সম্পর্কের প্রতিফলন।

তবে তার আগে বাথানের মহিষের দুধ সংগ্রহ করে নেয়। এজন্য তারা বাঁশের তৈরি বিশেষ এক ধরনের পাত্র ব্যবহার করে থাকে। এক একজনের বাথান ২০০ থেকে ৩০০ করে মহিষ রাখেন। সব কিছুর পরেও লবণ-পানি, ঘাসের সল্পতার পাশাপাশি এসব মহিষের স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ায় বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়া আর অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মহিষ চুরি করে নেওয়ার ঘটনা প্রধান সমস্যা বলে দাবি বাথান ও মহিষ মালিকদের।

এটি খাটি দুধের তৈরি আর বিশুদ্ধ হওয়ায় জনপ্রিয় বলে জানালেন মহিষ মালিক মো. সান্টু চৌধুরী। তিনি আরো বলেন, রাতের অন্ধকারে ডাকাতরা অস্ত্র ঠেকিয়ে গরু, মহিষ ও ভেড়া চুড়ি করে নিয়ে যায়। পুলিশ ও প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না।

আর খামার মালিক আমিরুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, লবণাক্ত পানিও ঘাষ কমের কারণে দুধ কম হচ্ছে। অনেক সময় বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়। সময় মতো ডাক্তার পাওয়া যায় না। ওষুধপত্র পাওয়া খুবই কঠিন। তবে মহিষের দুধের সুনাম দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তাই দধির কদর অনেক বেশি। দুধ বিক্রি করে অনেক লাভবান হচ্ছি আমরা। তবে তিনি সব সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।  

অপরদিকে ওই মহিষের দুধ প্রতিদিন এসব চর থেকে ট্রলারে করে গোয়ালরা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি অথবা দুই হাজার টাকা মণ দরে ক্রয় করে তিন থেকে চার হাজার টাকা দুধের মণ বিক্রি করেন। যে কারণে দুধ কম হলেও দাম বেশি হওয়ায় লাভবান হচ্ছেন গোয়ালরা।  

তবে এসব চর থেকে ঘোয়ালরা ভোলা শহরের ঘোষপট্টি নামক স্থানে প্রতিদিন দুধ নিয়ে আসেন বিক্রি করতে। তখন প্রায় দোকানের সামনেই ব্যস্ত সময় পার করেন ক্রেতা আর বিক্রেতারা। দোকানিরা সেই দুধ ক্রয় করে দধি তৈরি করেন। ভোলার ঘোষপট্টির এক দোকানি মো. শেখ ফরিদ বলেন, ভোলার মহিষের দুধের টকদধি বেশ জনপ্রিয়। সারা বছরই মহিষের দুধ পাওয়া গেলেও শীতে এই দুধের তৈরি টকদধির চাহিদা বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। দুধ কম আর দাম বেশি হলেও চাহিদায় কমতি থাকে না। কারণ এই সময় বিয়েসহ অনুষ্ঠানাদি বেশি থাকে। যে কারণে দধি বিক্রেতারা সব সময় ব্যস্ত থাকেন দধি তৈরির কাজে। আর বেশ লাভবান হচ্ছেন তাঁরা। তবে এখন শুধু ভোলা, ঢাকা নয় রপ্তানি হচ্ছে দেশের বাহিরেও বলে দাবি করেন তিনি।  

ভোলার পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘ভোলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে অনেক গরু ও মহিষের বাথান রয়েছে এবং সেখান থেকে চুরির অভিযোগ আমরা পাচ্ছি। ইতিমধ্যেই চোরসহ বেশ কয়েকটি গরু ও মহিষ লক্ষ্মীপুর থেকেও উদ্ধার করেছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার পুলিশ বিভাগ সচেতন রয়েছে।’  

অপরদিকে মহিষের রোগবালাই,চিকিৎসাসেবা প্রদান আর মহিষের বাচ্চা নষ্ঠ হয়ে যাওয়া সম্পর্কে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার চরাঞ্চলের এসব গবাদি পশুর সেবা ও ওষুধ ঠিক ভাবে দিতে না পারার সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে লোকবল সংকটের কথা বলেন। তবে এসব মহিষের দুধের তৈরি টকদধি উৎপাদন করে দেশ ও বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। একই সাথে পুষ্টির অভাব দূর করে বলেও জানালেন।