Monday 5th of December 2016

সদ্য প্রাপ্তঃ

***ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের ছয়বারের মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা মারা গেছেন বলে খবর স্থানীয় টিভির, হাসপাতালের অস্বীকার * আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজের বাবা তসলিমউদ্দিন আহমেদ (৭২) ল্যাবএইড হাসাপাতালে লাইফ সাপোর্টে***

Bangladesh Manobadhikar Foundation

Khan Air Travels

UCB Debit Credit Card

'অপনা মাঁসে হরিণা বৈরী'

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ২৭.০৪.২০১৬

'রানী মা হয়েছে।' নিঝুম দ্বীপ থেকে হাতিয়া হয়ে মনপুরা চলে আসার পর বন বিভাগের কর্মী মাজহারুল ইসলাম মামুন মুঠোফোনে জানালেন এ খবর।

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার বিচ্ছিন্ন চর নিঝুম দ্বীপে হরিণ মানুষের পায়ে পায়ে হেঁটে বেড়ায়, এমন গল্প বহুবার শোনা হয়েছে। কিন্তু গত ১২ ও ১৩ এপ্রিল দু'দিন নিঝুম দ্বীপে কাটিয়ে রানী ও তার এক বাচ্চা ছাড়া আর কোনো হরিণের দেখা পাওয়া যায়নি। বনে বাস করলেও বন বিভাগের বিট অফিসে রানীর রয়েছে নিত্য আনাগোনা। তাই রানীকে একই সঙ্গে বুনো ও পোষা হরিণ বলা চলে। বুনো হরিণ দেখাবার জন্য বন বিভাগের কয়েকজন কর্মী তাদের নৌকায় ১২ এপ্রিল পড়ন্ত বিকেল থেকে শুরু করে রাত ৮টা পর্যন্ত ঘুরিয়েছেন বনের মাঝখান দিয়ে বইয়ে যাওয়া খালগুলোতে। খালে ঘুরে বেড়ানোর সময় ডাক শোনা গেলেও দেখা মেলেনি হরিণের। তবে বুনো কুকুর ও শেয়াল দেখা গেছে যথেষ্ট।

ওই দু'দিন সকালে বন বিভাগের নিঝুম দ্বীপ বিট অফিসে রানী নামে যে হরিণটির দেখা পাওয়া গেছে তার একই সঙ্গে পোষা এবং বুনো হওয়ার পেছনে এই কুকুর ও শেয়ালের ভূমিকা রয়েছে। বন বিভাগের জাহাজমারা রেঞ্জের অধীন নিঝুম দ্বীপ বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা নূরে আলম জানালেন, চার-পাঁচ বছর আগে শেয়াল-কুকুরের আক্রমণে আহত একটি হরিণের বাচ্চা রেখে যান জেলেরা। নিঝুম দ্বীপের খালে মাছ ধরতে গিয়ে তারা বাচ্চাটিকে পেয়েছিলেন। নূরে আলম তখন নিঝুম দ্বীপে ছিলেন না। পরে পুরোনো বনকর্মীদের কাছে শুনেছেন গরুর দুধ খাইয়ে হরিণের বাচ্চাটিকে বড় করেছেন তারা। একটু বড় হওয়ার পর থেকে রানী কখনও বনে কখনও আবার বিট অফিসে রাত কাটায়। গত কয়েক বছরে দু'বার দুটি করে বাচ্চা দিয়েছে। রানীর বাচ্চারা মায়ের সঙ্গে লোকালয়ে এলেও লোকজন দেখলেই ছুটে পালায়। রানীর সঙ্গে ১৩ এপ্রিল সকালে বিট অফিসে আসা তার বাচ্চাদের একটিকেও দেখা গেল। রানী অবশ্য তার বাচ্চাদের মতো নয়। বন বিভাগের কর্মীরা আশপাশে থাকলে রানী পর্যটকদের হাত থেকেও খাবার নিয়ে খায়। সর্বশেষ ১৪ এপ্রিল রানী আবার মা হয়েছে এবং এবার একটিই বাচ্চা জন্ম দিয়েছে।

নিঝুম দ্বীপে হরিণ দেখতে না পেলেও ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যার পর হাতিয়ার কাজীরবাজারে এক পাল হরিণ এবং ১৪ এপ্রিল বিকেলে মনপুরার সাকুচিয়ায় চারটি হরিণের দেখা মিলেছে। স্থানীয়রা জানান, নোয়াখালীর হাতিয়া এবং ভোলার মনপুরায় যে হরিণদের দেখা পাওয়া যায় সেগুলো নিঝুম দ্বীপ থেকে ছড়িয়েছে। নিঝুম দ্বীপে হরিণ এল কীভাবে? নিঝুম দ্বীপের আদি বাসিন্দাদের একজন, নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি খবিরুল হক বেলাল জানান, ১৯৭৮ সালে এখানে চার জোড়া হরিণ ছাড়া হয়েছিল, তখনকার বন প্রতিমন্ত্রী আমিরুল ইসলাম কালামের উদ্যোগে। দ্বীপের মানুষের কাছে বেলাল ডাক্তার নামে পরিচিত এই আওয়ামী লীগ নেতা জানালেন, 'দ্বীপে বনায়ন শুরু হয়েছে তারও সাত-আট বছর আগে। ১৯৭৩ থেকে নিঝুম দ্বীপে জেগে ওঠা চরে বনায়ন শুরু করে বন বিভাগ। চারটি হরিণ থেকে নিঝুম দ্বীপে হরিণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৪০ হাজারের মতো, তবে এখন আবার হরিণের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। বর্তমানে নিঝুমদ্বীপে বন বিভাগের আওতাধীন রয়েছে ১২ হাজার ৫৫০ একর ভূমি। বন বিভাগের এই বনে রয়েছে কেওড়া, গেওয়া, কাঁকড়া, বাইন, বাবুল, করমজা ইত্যাদি ম্যানগ্রোভ বনের গাছ। জলদস্যু ও বন্যকুকুর এখানকার হরিণকুলের বড় শত্রু। শিকারির ফাঁদে প্রায় প্রতিদিন ধরা পড়ছে হরিণ।

তবে এখন কুকুরের চেয়ে শেয়ালের উপদ্রব বেশি বলে জানালেন জাহাজমারা রেঞ্জে রেঞ্জ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্বে নিযুক্ত মো. আবদুল হামিদ। স্থানীয় প্রভাবশালীরা অতিথি আপ্যায়নে খাবার টেবিলে রাখেন হরিণের মাংস। তারা হরিণ শিকারেও নিয়ে যান এই অতিথি-পর্যটকদের। এমনই একটি ঘটনার কথা গত বছর ১৮ মার্চ হাতিয়া থানায় সেই সময় নিঝুম দ্বীপে দায়িত্বরত বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা হাসান আল তারিকের দায়ের করা একটি সাধারণ ডায়েরি থেকে জানা যায়। নিঝুম দ্বীপের ছোয়াখালীতে ঢাকা থেকে আসা কয়েকজন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাকে নিয়ে হরিণ শিকার করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের এক চেয়ারম্যান। দুটি আগ্নেয়াস্ত্রও আটক করা হয়েছিল তখন। অবশ্য তার দাবি, এটা ছিল তার বিরুদ্ধে বন বিভাগের ষড়যন্ত্র। পরে তদন্তে ঘটনাটি প্রমাণিত হয়নি।

বন বিভাগের দুই কর্মকর্তা নূরে আলম ও মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, নিঝুম দ্বীপের বনে প্রায় সাত প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির পাখি ও ১৬ প্রজাতির সাপ রয়েছে। বনের অভ্যন্তরে সর্বত্রই হরিণের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ে। দ্বীপের একটি মা হরিণ বছরে দুই বার কমপক্ষে দু'টি করে চারটি বাচ্চার জন্ম দেয়। প্রায় ১০ হাজারের মতো মা হরিণ রয়েছে এই দ্বীপে। এ হিসাবে প্রতি বছরে ৪০ হাজার হরিণের বাচ্চা জন্মানোর কথা, যাদের এক-চতুর্থাংশ হরিণ বেঁচে থাকলেও বছরে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার।

বেলাল ডাক্তারের ধারণা, হরিণ যতটা প্রাকৃতিক কারণে মারা পড়ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি মারা পড়ছে চোরা শিকারিদের হাতে। নিঝুম দ্বীপের আশ্রয়টা যে হরিণদের জন্য আর নিরাপদ নেই, এটা বুঝতে পেরে হরিণ ছড়িয়ে পড়ছে হাতিয়া ও মনপুরাসহ সংলগ্ন সব চরাঞ্চলে। এখানে মিঠাপানির অভাব তীব্র। বানর না থাকায় হরিণগুলো চাইলেও কেওড়া পাতা খেতে পায় না।

হরিণের ছড়িয়ে পড়ার এমন যুক্তি সঠিক নয় বলে জানালেন প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আনিসুজ্জামান খান। তিনি বলেন, মানুষের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করে হরিণগুলোর বিস্তার ও বেঁচে থাকা। নিঝুম দ্বীপসহ দক্ষিণের ওই দ্বীপগুলোতে যে ম্যানগ্রোভ বন গড়ে উঠেছে, সেসব বনের কোনোটাই প্রাকৃতিকভাবে হয়নি, হয়েছে বনায়নের ফলে। হরিণও সেখানে ছাড়া হয়েছে। তবে নিঝুম দ্বীপ থেকে হরিণ এতদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কম। তিনি বলেন, যেভাবেই হোক, হরিণগুলো দ্বীপাঞ্চলের আকর্ষণ বাড়িয়েছে। মাংসলোলুপদের হাত থেকে হরিণগুলোকে রক্ষা করতে হবে।

স্থানীয় শিকারিদের সঙ্গে নিঝুম দ্বীপে এখন খুলনার একটি শিকারিী দলও জড়িত। তারা হরিণের খোঁজে ট্রলারে করে বনের চারপাশের নদীতে ঘুরে বেড়ায়। তাদের হাতে প্রতিদিনই হরিণ নিধন হচ্ছে। খুলনার এমন একজন শিকারির সঙ্গে হাতিয়ার ওচখালীতে পরিচয় করিয়ে দিলেন স্থানীয় এক সাংবাদিক। শিকারি অবশ্য নিজেকে পোনা আহরণকারী বলে পরিচয় দিয়ে সরল স্বীকারোক্তি করলেন, 'হঠাৎ হরিণ পেয়ে গেলে খাওয়ার জন্য শিকার করি।' তার কথা শুনে মনে পড়ল, 'অপনা মাঁসে হরিণা বৈরী'- 'চর্যাপদে'র এ পঙ্ক্তিটি। হরিণের শত্রু যেমন তার নিজের মাংসের স্বাদ, শিকারি ভুসুকু তা সামনে পেয়েও কি লোভ ছাড়তে পারে? সেকালে যেমন, একালেও এই কথা সমান সত্য। সবখানেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই হরিণ শিকারিদের আশ্রয়দাতার ভূমিকা পালন করছেন। মনপুরায় গিয়ে এমন একজন জনপ্রতিনিধি রামনেওয়াজ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন হাওলাদারের কথা জানা গেল, যার বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের দিকে সেই সময়কার একজন যুগ্মসচিবকে হরিণ শিকার করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই যুগ্মসচিব এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব