Print

কবরের সঙ্গেই ঘরবসতি

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ০১.০৫.২০১৬

পুরোনো টিন, কাঠ ও বাঁশ দিয়ে বানানো ভাঙাচোরা খুপরিঘর।

মলিন ঘরগুলোর দৃশ্য বলে দিচ্ছে এগুলোর ভেতরে থাকা মানুষগুলোর মানবেতর জীবনের কথা।এ রকম একটি ঘরের সঙ্গে লাগোয়া একটি কবর। সাদা নতুন মাটির। দেখে বোঝা যায় অল্প দিন আগের কবর এটি। ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার আমুয়া ফেরিঘাটের কাছে হলতা নদীর ধারে ছোট্ট গ্রাম সরদারপাড়া। মাত্র দুই একর আয়তনের গ্রামটিতে এভাবে ঠাসাঠাসি-গাদাগাদি করে কবরের সঙ্গে বসবাস সাড়ে তিন শ পরিবারের অনেকের। এসব খুপরিঘরের কোনো কোনোটির মধ্যে কবরে শুয়ে আছেন পরিবারের মৃত স্বজনেরা। একদিকে ভূমিহীন ও অন্যদিকে কবরস্থানের অভাব। তাই যুগ যুগ ধরে এভাবে মৃত স্বজনদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকছেন এখানকার বাসিন্দারা। তাঁরা পেশায় জেলে। হলতা ও পার্শ্ববর্তী বিষখালী নদীতে মাছ ধরা তাঁদের জীবিকা। সম্প্রতি এক দুপুরে এই গ্রামের গলিপথ ধরে ভেতরে ঢুকতে চোখে পড়ল পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন নারীর ছোট্ট খুপরির এক কোণে বসে রান্নার দৃশ্য। কেমন আছেন—জিজ্ঞেস করলে জবাব দিলেন না। মাথা নিচু করে থাকলেন। পাশের ঘরের এক যুবক এসে বললেন, ‘উনি কথা কইবেন না। এইহানের বাসিন্দারা বাইরের মানুষের লগে তেমন কথা কয় না।’ কেন—জানতে চাইলে তাঁর জবাব, ‘আমাগো জন্মই তো অভিশাপের। কোথাও হোনছেন বাপ-দাদা, আত্মীয়-স্বজন মরলে ঘরের মধ্যে কেউ কয়বর দেয়! সবাই কয়বরকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে, আর মোরা কয়বরের উপরে খাই-দাই-ঘুমাই! কী অদ্ভুত জীবন!’ ‘ওই যে দ্যাহেন, উনি যেহানে রান্ধে, ওইহানে চুলার নিচে ওনার মায়ের কয়বর। পাশের কয়বরটা ওনার বাবার। ওনাগো ঘরের মধ্যে আরও দুইটা কয়বর’—আরও বললেন যুবকটি। জানা গেল, ওই নারীর নাম হাজেরা বেগম। হাজেরার ঘর পেরিয়ে একটু পশ্চিমে এগোতেই চোখে পড়ল বহু খুপরি। আর তাতে মানুষের গাদাগাদি। ‘আমার ঘরের মধ্যে ছয়টা কবর’—বললেন সরদারপাড়ার আরেক বাসিন্দা জালাল সরদার (৫০)। আধা শতক জমির ওপর ঘরে থাকে পাঁচজনের পরিবার। ভিটি (মেঝে) দেখিয়ে বললেন, ‘এইহানে আমার বাবা-মা, দাদা-দাদি, বড় ভাই ও এক ছেলের কয়বর। কয়বরের উপরেই আমাগো জন্ম, এর উপরেই আমাগো মরণ।’ জালালের কথা থামতেই তাঁর স্ত্রী সেলিনা বেগম ঘর থেকে বের হলেন। বললেন, ‘ঘরের মধ্যে ছয়টা কয়বরের উপরে চকিতে আমরা ঘুমাই, চকির পাশেই রান্ধি-বাড়ি-খাই। ঘরের সামনে আছে আরও দুইডা কয়বর। ঘরটুক ছাড়া আমাগো আর কোনো জাগাজমি নাই।’ সেলিনার ঘর থেকে দু-পা এগোতেই নাছিমা বেগমের ঘর। পাঁচ বছর আগে নিজ সন্তানকে ঘরের মধ্যেই কবর দিয়েছিলেন তিনি। এখন সেই কবরের ওপরই চৌকি পেতে থাকেন নাছিমা ও তাঁর পরিবার। তাঁর ঘরেও আছে দুটি কবর। জেলেপল্লির এই দুঃখ-দুর্দশার গল্প যেন ফুরায় না। পল্লির বাসিন্দার জানান, সব মিলিয়ে সাড়ে ৩০০ পরিবারে প্রায় দুই হাজার লোকের বসবাস। এখানকার সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতি বাইরের সমাজ থেকে অনেকটাই ভিন্ন। ছেলেমেয়েদের বিয়েশাদিও হয় নিজেদের মধ্যে। নেই পয়োনিষ্কাশন, স্বাস্থ্য, শিক্ষার ন্যূনতম সুযোগ। পল্লিবাসীর সমস্যা নিয়ে কথা হয় আমুয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আখতার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তাঁদের (পল্লির লোকজন) ব্যাপারে জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন মহলে জানানো হয়েছে। প্রশাসন যদি আলাদা জায়গা দেয়, তবে পরিষদের পক্ষ থেকে কবরস্থান নির্মাণে আমি সার্বিক সহযোগিতা দেব।’ কাঁঠালিয়া উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ বি এম সাদিকুর রহমান বলেন, ‘ওই সম্প্রদায়ের কবরস্থান নির্মাণে জমি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় আমরা এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছি।’