Print

দুই মাস ধরে টিকা সংকট: উদ্বেগে অভিভাবকরা

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ১২.০৫.২০১৬

দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বরিশালে নিউমোনিয়া (পিভিসি) আর পোলিও (আইপিভি) ভ্যাক্সিনের সরবরাহ নেই।

এছাড়া যক্ষ্মার টিকা (বিসিজি) দেওয়ার জন্য সিরিঞ্জ-এর সরবরাহ  নেই বলেও টিকা দেওয়া যাচ্ছে না।বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের টিকা প্রদান কেন্দ্রে নির্দিষ্ট তারিখে শিশুদের টিকা দিতে নিয়ে এসে না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে বেশকয়েক জন অভিভাবককে। নির্দিষ্ট সময়ে টিকা দিতে না পেরে তারা উৎকণ্ঠায়।হাসিনা বেগম নামে এক অভিভাবক শিশুকে টিকা দিতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'বাইরে থেকে এই টিকা কেনার সুযোগ নেই। তার সন্তানের সমস্যা হলে কে দেখবে?'জেনারেল হাসপাতালের কনসালটেন্ট (শিশু) ডা. স্বপন কুমার হালদার বলেন, টিকা শিশুর রোগ প্রতিরোধ এবং প্রতিষেধকের কাজ করে। তাই সময়মতো টিকা দেওয়া না হলে সমস্যা হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষ করে পিসিভি টিকা নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করে। এই রোগে শিশুর মস্তিকে ইনফেকশন হয়। এটাই শিশুর বেলায় সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।ভ্যাক্সিন সংকটের নেপথ্যে ইপিআই প্রধান কার্যালয় থেকে যথা সময়ে ভ্যাক্সিন ও সিরিঞ্জ কিনতে না-পারাকে দায়ী করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বাস্থ্য-কর্মকর্তা। 

সংকট হতে পারে জেনেও ইপিআই প্রধান কার্যালয় প্রস্তুতি গ্রহণ ও টিকা কেনেনি এমন অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. তাপস কুমার বলেন, 'এ কথা ঠিক নয়। শিশুদের বেশির ভাগ টিকা জার্মান ও সুইডেন উৎপাদন করে। উৎপাদন কম হওয়াতে আন্তর্জাতিক বাজারেই টিকার সংকট। তাই তারা টিকা পাচ্ছেন না।'জেলা সিভিল সার্জন ডা. এএসএম শফিউদ্দিন জানান, বিসিজি টিকার সিরিঞ্জ সপ্তাহ খানিকের মধ্যেই পাওয়া যাবে। আর যে দুটি টিকার সংকট রয়েছে তারমধ্যে আইপিভি (পোলিও) টিকার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হবে না। কেননা ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ পোলিও মুক্ত বলে ঘোষিত হয়েছে। এশিয়া মহাদেশে কেবল পাকিস্তান আর আফগানিস্তান ব্যতীত অন্য দেশগুলো পোলিও মুক্ত। এই টিকা বাংলাদেশে আর আনা হবে না।তিনি আরও জানান, পিসিভি টিকা (নিউমোনিয়া) নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। এই টিকা এক মাসের মধ্যেই পাওয়া যাবে। তাছাড়া শিশুর জন্মের ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহে ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি এই পাঁচটি রোগের টিকা একত্রে মিলিয়ে দেওয়া হয় এবং এই পেন্টা ভায়েল শিশু পাচ্ছে বলে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বা ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকবে।

সিভিল সার্জন অফিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৮৫ টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে ২৪টি কেন্দ্র থেকে শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। এতে করে জেলায় ২ হাজার ৪০টি টিকা কেন্দ্রে এ বছর ৫৪ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়ার টার্গেট নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বরিশাল সিটি করপোরেশনে ৮৮টি অস্থায়ী এবং ১৩টি স্থায়ী টিকা প্রদান কেন্দ্র থেকে ১১ হাজার ৩৪৫ জন শিশু টিকার আওতায় আসবে। তবে  শিশু জন্মের ১৪ দিন নতুবা ৪৫ দিনের মধ্যে বিসিজি (যক্ষ্মা) টিকা দিতে হয়। আর নিমোকক্কাস নিউমোনিয়া ও ম্যানিনজাইটিস রোগ দুটি প্রতিরোধের জন্য পিসভি-৩ টিকা দিতে হয় ৪৫ দিন বয়স থেকে ১৩৫ দিন বা সাড়ে চার মাস বয়সের মধ্যে।আইপিভি মূলত পোলিও টিকা এটি দিতে হয় ৪৫ দিন থেকে শুরু করে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে। এদিকে, টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা প্রতি বছর অর্জিত গেলেও এবার তা পূরণে কতটুকু সক্ষম হবেন এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সিটি করপোরেশনের ইপিআই সুপারভাইজার মো. কবির।

বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের টিকা প্রদান কেন্দ্রের টিকা প্রদানকারী সেবিকা নাজমা বেগম জানান, গত দু-মাসে পিসিভি ও বিসিজি’র টিকার বেলায় ২৫০ শিশু এবং আইপিভি টিকা পায়নি ২০০ শিশু। আর গড়ে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ শিশু ফিরে যাচ্ছে এই তিনটির মধ্যে যে কোনও একটি টিকা না পেয়ে।এরমধ্যে বিসিজি টিকা এক বছর বয়স পর্যন্ত দেওয়া যায়। তারপরও টিকা সরবরাহে গ্যাপ তৈরি হওয়াতে কিছু শিশু বঞ্চিত হবে। পিসিভি আর আইপিভি ভ্যাক্সিনের বেলায়ও বঞ্চিত হবে শিশুরা।টিকা সংকটের বিষয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মতিউর রহমান বলেন, দেড় মাস আগে তারা ইপিআই’র প্রধান কার্যালয়ে লিখিত জানিয়েছেন। এছাড়াও প্রতিদিন মুঠোফোনে যোগাযোগ করছেন কবে নাগাদ এই টিকা পাওয়া যাবে।

কেবল পোলিও আর নিউমোনিয়া টিকা এবং যক্ষা টিকা দেওয়ার সিরিঞ্জ ছাড়াও ছয় মাস পাড় হলো শিশুদের টিকা কার্ড নেই। এই কার্ড সিটি করপোরেশন থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে।এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ১৯৮৭ সাল থেকে দেশব্যাপী সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর ভ্যাক্সিনের এমন সংকট আর দেখা দেয়নি।এই সংকটের কারণে তাদের ১১ হাজার ৩৪৫ শিশুর মধ্যে পিসিভি (নিউমোনিয়া) টিকা থেকে বঞ্চিত হবে দুই হাজার শিশু এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।