Print

চট্টগ্রামে পাহাড়ে বসতিরা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ১৯.০৪.২০১৬

বৃষ্টির পানির তোড়ে পাহাড়ধসের নির্মম চিত্র বহুবার দেখেছে চট্টগ্রামের মানুষ।

তবে এর চেয়েও নির্মম ও ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে ভূমিকম্প। গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামে একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প হলেও তাতে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেনি বটে, তবে্ সেসব ভূমিকম্প যে অন্তঃপ্রভাব রেখে যাচ্ছে, তাতে চট্টগ্রামের পাহাড়ে বসবাসরত মানুষজন রয়েছে ভূমিকম্পের চরম ঝুঁকিতে। এমন কথাই বলেছেন চট্টগ্রামের পরিবেশ ও আবহাওয়াবিদরা। গত বছর চালানো দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট পারফরমেন্সের (সিডিএমপি) সমীক্ষায়ও এমন তথ্য উঠে এসেছে। আবহাওয়া ও পরিবেশবিদরা গত শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় জাপানে ৬ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে সে দেশের পার্বত্যাঞ্চল ধসে পড়ার চিত্র তুলে ধরে বলেন, জাপানে এর আগে ৭-এর চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। তখন বহুতল ভবন ভেঙে পড়াসহ নানা ভয়াবহ বিপর্যয় হয়েছে। কিন্তু এবারের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেনি। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ জ্যোতির্ময় খীসা বলেন, ছোট ছোট ভূমিকম্পগুলো মানুষের তৈরি স্থাপনা ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে ক্রমেই দুর্বল করে তোলে, যা মানুষের নজরে আসে না। ফলে পরে বড় ভূমিকম্প ছাড়াই অকল্পনীয় বিপর্যয় নেমে আসে। জ্যোতির্ময় খীসা বলেন, “গত বুধবার রাত ৭টা ৫৫ মিনেটে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ঘটে যাওয়া ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম মহানগরে ১০টি ভবন হেলে পড়লেও মানবিক বিপর্যয় হয়নি। তবে গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের যে অদৃশ্য প্রভাব রয়েছে, পরবর্তী যেকোনো কম মাত্রার ভূমিকম্পেও ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে আমাদের।” চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মনিরুল হক বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার এক-তৃতীয়াংশ পাহাড়ে ঘেরা। সেখানে হাজার হাজার পরিবার বসবাস করছে। বসতি গড়তে গিয়ে এসব মানুষ পাহাড় কেটে নষ্ট করেছে।  ফলে প্রতিবছর বৃষ্টিতে পানির তোড়ে নগরীর কোথাও না কোথাও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এসব পাহাড়ে বসবাসরত ৬৬৬ পরিবারকে ইতিমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিতও করা হয়েছে। যদিও ভূমিকম্পের কথা মাথায় রেখে সে রকম কোনো কিছু হয়নি।  তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি সূত্রে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন ভূমিকম্পের কারণে এক সমীক্ষা চালানো হয়েছে। এতে শক্তিশালী ভূমিকম্পে যেকোনো মুহূর্তে মহানগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থিত নগরীর ১৩টি পাহাড় ধসে পড়তে পারে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির এক প্রতিবেদনেও নগরীর ৩০টি পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট পারফরমেন্সের (সিডিএমপি) সমীক্ষায়ও বলা হয়েছে, শুধু বর্ষণে নয়, ভূমিকম্পেও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ব্যাপক জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত। চট্টগ্রাম মিয়ানমার সীমান্তবর্তী। ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেট প্রতিবছর ৬ সেন্টিমিটার এবং বার্মাপ্লেট ২ সেন্টিমিটার করে  বাংলাদেশকে ধাক্কা দিচ্ছে। সিডিএমপির সমীক্ষায় জানা গেছে, চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারে টেকটোনিক প্লেটের অবস্থান। এই প্লেটটি কক্সবাজার থেকে ৩০ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই প্লেট থেকে ১৭৬২ সালে রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। এ পর্যন্ত ওই ফল্ট লাইনে আর কোনো বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়নি। এই ফল্ট লাইনে ২৪৮ বছর ধরে শক্তি সঞ্চিত থাকায় যেকোনো মুহূর্তে চট্টগ্রামে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। এতে  মুহূর্তে ঘটতে পারে পাহাড়ধস। এতে ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হবে। বৃষ্টির সময় ভূমিকম্প হলে কাদামাটির কারণে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে বহুগুণ।  সমীক্ষায় চট্টগ্রাম মহানগর এবং সংলগ্ন এলাকার পাহাড়গুলোর মধ্যে যে ১৩টি পাহাড় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলো হলো- বাটালি হিল, টাইগারপাস ইন্ট্রাকো সংলগ্ন পাহাড়, বিআইটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, ইস্পাহানি পাহাড়, শেরশাহ মীর পাহাড়, এ কে খান পাহাড়, টাইগারপাস জেলা পরিষদ পাহাড়, লেকসিটি আবাসিক এলাকার সংলগ্ন পাহাড়, সিডিএ অ্যাভিনিউ পাহাড়, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট পাহাড়, চট্টেশ্বরী জেমস ফিনলে পাহাড়, কবইল্যাধাম পাহাড় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পাহাড়। সমীক্ষায় আরো জানা যায়, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতে বালির পরিমাণ বেশি। বৃষ্টির সময় বালিতে পানি ঢুকে নরম হওয়ার পর ধসে পড়ে পাহাড়। বাটালি হিলের বর্তমান অবস্থান সমতলের সঙ্গে ৭৫ ডিগ্রিতে। কোনো দেয়াল নির্মাণ করে এ পাহাড় রক্ষা করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দরকার আধুনিক এবং সঠিক পরিকল্পনা। অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, নেপাল, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সঠিক নিয়মে পাহাড় সংরক্ষণ করছে। তাতে তারা সুফলও পাচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগর পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর প্রতিটিতে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ পরিবার বসবাস করছে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা। এসব স্থাপনায় রয়েছে অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ। দুর্গম অঞ্চল বলে বিশেষ করে রাতে পাহাড় ধসে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকাজ শুরু করা যায় না, ফলে প্রাণহানি বেশি ঘটে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সদ্য বিদায়ী  ভিসি ড. এম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “চট্টগ্রামে ভূমিকম্পে পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানির শঙ্কা আছে। সমীক্ষা অনুযায়ী শুধু ১৩টি নয়, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর সব পাহাড়ই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি রোধে পাহাড়কে পাহাড়ের স্বরূপে থাকতে দিতে হবে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়গুলো যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে  না পারলেও অন্তত ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে।” পাহাড়ধস রোধে বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “অনেক সুপারিশ করা হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটছেই।” ড. জাহাঙ্গীর বলেন, “জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রস্তুতির কারণে বিভিন্ন দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছে। আমাদের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ, সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা, পিডিবি, স্বাস্থ্য বিভাগসহ কারো কোনো প্রস্তুতি আছে বলে আমার জানা নেই। তাই যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা আমাদের জন্য দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।” জনসাধরণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সবচেয়ে বড় কাজ বলে মনে করেন এ বিশেষজ্ঞ। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সচিব ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম আব্দুল কাদের বলেন, “পাহাড়ে যারা অবৈধভাবে বসতি স্থাপন করেছে, তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া পাহাড়ধস ঠেকাতে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে।”