Print

উচ্ছেদের পরেই ফিরে ফিরে আসে সংযোগ!

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ২০.০৪.২০১৬

বাখরাবাদের গ্যাসের অবৈধ পাইপলাইন উচ্ছেদে কুমিল্লার মুরাদনগরে ৪র্থবারের মতো অভিযান পরিচালনা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক হাসানুজ্জামান কল্লোলের নির্দেশে মঙ্গলবার দিনভর মুরাদনগরের মধ্যনগর থেকে কামাল্লা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করা হয়।ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন, কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফিরোজ আল মামুন। অভিযানকালে উপস্থিত ছিলেন- বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির উপব্যবস্থাপক ও দেবীদ্বার অফিসের ইনচার্জ মো. বাপ্পী শাহরিয়ার, সহকারী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন আহাম্মদ, সহকারী প্রকৌশলী অতুল কুমার নাগ, মুরাদনগর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। এ সময় ৬ হাজার ফুট অবৈধ পাইপ লাইন উত্তোলন করা হয়। বাখরাবাদ গ্যাসের কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দালাল চক্র অনেকদিন ধরেই উপজেলার কামাল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে গ্যাসের আবাসিক সংযোগ দেয়ার কাজে লিপ্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় কোটি কোটি টাকা।

এর আগে গত বছর ১৩ অক্টোবর জেলার চান্দিনায় ৪ হাজার ফুট অবৈধ পাইপ লাইন বিচ্ছিন্ন করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া ২০১৫ সালের ১৯ অক্টোবর ও ৫ নভেম্বর মুরাদনগরে দ্বিতীয়বারের মতো ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ গ্যাস লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোলের নির্দেশে মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিনের নেতৃত্বে উপজেলার করিমপুর থেকে কামাল্লা বাজার পর্যন্ত ২ হাজার ২শ ফুট লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ সময় ১১০টি ২ ইঞ্চি পাইপ জব্দ করা হয়। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গ্যাস লাইন নির্মাণে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ নিয়ে এলাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখা দেয়। এ নিয়ে মোট ৪ দফা অভিযানে ১২ হাজার ফুট অবৈধ পাইপ লাইন উত্তোলন করা হয়।  এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ‘কুমিল্লায় গ্যাসের অবৈধ সংযোগের মহোৎসব!’ ও ২২ সেপ্টেম্বর ‘অবৈধ গ্যাস সংযোগে রমরমা বাণিজ্য’ শিরোনামে দুটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন অবৈধ ওইসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেয়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ অক্টোবর মুরাদনগরের কামাল্লায় গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। ওইদিন উপজেলা সদর থেকে কামাল্লা গ্রাম পর্যন্ত ১২ হাজার ফুট অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। দ্বিতীয় দফা অভিযানে ২ হাজার ২শ ফুট লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। অভিযানকালে উপস্থিত ছিলেন- সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলী আজগর, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির উপব্যবস্থাপক বাপ্পী শাহরিয়ার, ব্যবস্থাপক (বিক্রয়-উপজেলা) জিয়াউল হক চৌধুরী, সহকারী প্রকৌশলী অতুল কুমার নাগ, জসিম উদ্দিন আহাম্মদ, মনতুজ মধু, পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন, এএসআই মাহফুজ প্রমুখ। এ সময় স্থানীয় জনগণ মুরাদনগর উপজেলার সব এলাকার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে দাবি জানান। ওই সময় মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিন জানান, ১ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ থেকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে ২ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করায় গ্যাসের প্রেসার কমে যাবে। এর ফলে বৈধ-অবৈধ গ্রাহক সবাই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ ছাড়াও মাটি থেকে সাড়ে ৩ ফুট গভীরে গ্যাসলাইন স্থাপনের নিয়ম থাকলেও অনেক স্থানে সরাসরি রাস্তার ওপর এবং রাস্তার সর্বোচ্চ ৬ ইঞ্চির ভেতরে গ্যাসলাইনের পাইপ স্থাপন করায় যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিচ্ছিন্ন করা গ্যাসলাইনের অবশিষ্ট পাইপগুলো অপসারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ডিজিএমকে চিঠি দেয়া হয়েছে বলেও সে সময় জানিয়েছিলেন ইউএনও মনসুর উদ্দিন। সূত্রমতে, কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দালাল চক্র বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন দেবীদ্বার জোনাল অফিস, কুমিল্লার বাখরাবাদ গ্যাস অফিসের বেশকিছু সংখ্যক অসাধু কর্মকর্তা, কিছু সংখ্যক নামধারী সাংবাদিক ও পুলিশ কর্মকর্তার যোগসাজসে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে গ্যাসের আবাসিক সংযোগ দেয়ার কাজে লিপ্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ ও নিরীহ গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সড়ক ও জনপথ বিভাগের মুরাদনগর-রামচন্দ্রপুর সড়কের প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের সামনে থেকে সড়ক কেটে ১ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ থেকে ২ ইঞ্চি পাইপের মাধ্যমে কামাল্লা গ্রাম পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈধভাবে টানা হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার ফুট লম্বা পাইপলাইন, যেখানে ২ ইঞ্চি পাইপের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগের কোনো ধরনের বৈধতা না থাকলেও বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের কুমিল্লা অফিস ও দেবীদ্বার জোনাল অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এসব লাইন নির্মাণে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের সড়ক কেটে অবৈধভাবে পাইপ লাইন নেয়া হলেও দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়ে এ বিষয়ে চুপ থাকায় জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অভিযোগ আছে, একে তো ভাঙা সড়ক, তার ওপর আবার সড়ক কেটে পাইপ লাইন নেয়ায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।  জানা গেছে, গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে মুরাদনগর উপজেলার কামাল্লা গ্রামে প্রায় ৩ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সিন্ডিকেটটি দিনের বেলায় বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিডিসিএল) নিজস্ব পাইপলাইন থেকে অবৈধ প্রায় ২০ হাজার ফুট গ্যাস লাইন সংযোগের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জানা থাকলেও অদৃশ্য কারণে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। 

নির্মাণাধীন এ লাইন থেকে প্রায় ৩ হাজার গ্রাহককে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে একটি চক্র। এজন্য গ্রাহকপ্রতি নেয়া হচ্ছে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা, যা থেকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। আর মাঝখান থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে সিন্ডিকেট ও দালাল চক্রগুলো।  উল্লেখ্য, গত ১৯ অক্টোবর মুরাদনগরের কামাল্লায় গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অভিযান চালায় মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসন। এছাড়া ৩ নভেম্বরও ৪ হাজার ফুট অবৈধ পাইপ লাইন বিচ্ছিন্ন করে চান্দিনা উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নেতৃত্বাধীন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন, সরঞ্জাম জব্দ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি এলাকায় আরেকটি অভিযান চালানো হয়। এ সময় ২ ইঞ্চি ব্যাসের ৬১ পিস পাইপ, একটি জেনারেটর, একটি গাড়ি ও কিছু যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়। তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। ময়নামতি ইউনিয়নের জিয়ারপুর থেকে মোকাম ইউনিয়নের বারকোট গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবৈধভাবে গ্যাস লাইন স্থাপন করা হচ্ছে, এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় অবৈধ পাইপ অপসারণ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি।  জেলা প্রশাসনের নির্দেশে বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফজলুল জাহিদ পাভেলের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়।

ময়নামতি এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ সিন্ডিকেটের কিছু সদস্যের নাম উল্লেখ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এদের মধ্যে রয়েছেন- ময়নামতি ইউনিয়নের নামতলা গ্রামের শফিকুর রহমান, আওরঙ্গ সম্রাট, ঝুমুর গ্রামের মৎস্যজীবী লীগ নেতা আ. জলিল ভূঁইয়া, জিয়ারপুর গ্রামের মনিরুল, মোকাম ইউনিয়নের বারকোট গ্রামের আবু মেম্বর এবং ময়নামতি ইউনিয়নের গণেশপুর গ্রামের আব্দুর রশিদ। তাদের নেতৃত্বে অবৈধভাবে গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যে ময়নামতির জিয়ারপুর থেকে মোকাম ইউনিয়নের বারকোট গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২শ ফুট এলাকায় পাইপ স্থাপন করা হয়। তবে তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, জানতে চাইলে বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফজলুল জাহিদ পাভেল জানান, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় তারা পালিয়ে গেছেন। সে কারণে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে সাজা দেয়া যায়নি। তবে তাদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এক ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ থেকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে দুই ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করায় গ্যাসের চাপ কমে যাবে। ফলে, বৈধ গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এছাড়াও মাটি থেকে সাড়ে ৩ ফুট গভীরে গ্যাস লাইন স্থাপনের নিয়ম থাকলেও অনেক স্থানে সরাসরি রাস্তার ওপর এবং রাস্তার সর্বোচ্চ ৬ ইঞ্চির ভেতর পাইপ স্থাপন করায় যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।