Print

দুর্ভোগ বাড়ছে কাপ্তাই হ্রদে

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ১৫.০৫.২০১৬

কাপ্তাই হ্রদের পানি কমতে শুরু করেছে।

সাধারণত অক্টোবর মাসের পরে তেমন কোনও বৃষ্টিপাত না হওয়ায় হ্রদের রিজার্ভ (সংরক্ষিত) পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ছাড়তে হয়। আবার চাষাবাদের জন্যও হ্রদে প্রচুর পানি ধরে রাখা সম্ভব হয় না। সব মিলিয়ে চৈত্রের পর থেকেই পানি কমে যাওয়া ও হ্রদে প্রচুর পলির কারণে রাঙামাটির সঙ্গে উপজেলাগুলোর নৌপথে যোগাযোগে সমস্যা তৈরি হয়। পণ্য পরিবহনসহ যাত্রীদের প্রচণ্ড দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কাপ্তাই হ্রদে পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় এই দুর্ভোগের মাত্রা আরও বেড়েছে বলে জানা যায়। অতিরিক্ত পলির কারণে সামান্য পানি কমে গেলেই দুর্গম অঞ্চলে চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়।এদিকে, রাঙামাটির সাতটি নৌপথে উপজেলার সঙ্গে সদরের যোগাযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কাপ্তাই, নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়িতে সড়ক পথ থাকলেও বাকি চার উপজেলা বরকল, জুরাছড়ি, লংগদু ও বিলাইছড়ির সঙ্গে সরাসরি নৌপথে আসা-যাওয়া করতে হয়। ইতোমধ্যে জুরাছড়িতে সরাসরি কোনও লঞ্চ বা বোট যেতে পারছে না। বাঘাইছড়িতেও সরাসরি কোনও লঞ্চ যেতে পারছে না। লংগদুরের মাইনি পর্যন্ত যাওয়ার পর ছোট বোটে দুরছড়ি ও বাঘাইছড়ি যেতে হচ্ছে। এছাড়া পানি কমে যাওয়ায় বিলাইছড়িতে পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে।গবেষকদের মতে, আয়তনের দিক থেকে হ্রদটির গভীরতা বর্তমানে অর্ধেকের চেয়ে বেশি কমে গেছে। এতে প্রায় চার মাসেরও বেশি সময় উপজেলাবাসীকে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করতে হয়। বিভিন্ন সময় কাপ্তাই হ্রদে ড্রেজিংয়ের কথা বলা হলেও এখনও কোনও সুসংবাদ পাচ্ছেন না জেলাবাসী।

জানা গেছে, প্রায় ৬৬ বছর আগে বাঁধ নির্মাণের সময় এখানকার বিশাল এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে লক্ষাধিক অধিবাসী ভূমি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়। মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বাঁধ দেওয়া হলেও বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বনজ সম্পদ আহরণ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ, পানিপথ উন্নয়ন, নৌ-যোগাযোগ স্থাপন এবং মৎস্য উৎপাদনের বিষয়টিও তখন থেকেই বিবেচনায় ছিল। হ্রদটির সৃষ্টি এ এলাকার লক্ষাধিক অধিবাসীর জন্য অভিশাপ বয়ে আনলেও এই হ্রদ দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় নতুন এক সোনালী সম্ভাবনার দিগন্ত। পাশাপাশি নৌপথে উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগও সহজ হয়। অপরূপ সৌন্দর্য্য ও নয়নাভিরাম হ্রদটি দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। এই হ্রদ ঘিরেই পর্যটন খাত থেকে আয় হয় কোটি কোটি টাকা। কিন্তু এই হ্রদ ব্যবস্থাপনার জন্য বিগত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ে যেমন সুষ্ঠু কোনও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি, তেমনি এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্ষয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষার জন্য কোনও সমন্বিত উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।

এর মাঝেই পাহাড়ি ঢলের কাদা মাটি, পলি মাটি, বিষাক্ত বর্জ্য, আবর্জনা ফেলে হ্রদটিকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এখনই উদ্যোগ না নিলে আগামী দু’দশকের মধ্যেই হ্রদটি আর কর্মোপযোগী থাকবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।পরিবেশবাদীদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল থেকে অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ নিধন, জুমচাষের ঐতিহ্যবাহী পন্থা পরিহার করে ইচ্ছামত পাহাড় কাটা ও চাষ এবং পাহাড় কেটে বসতি স্থাপনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কাপ্তাই হ্রদের ওপর। পানি প্রবাহ কমে যাওয়ার জন্য প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে মানবসৃষ্ট কারণগুলোকেই সবচেয়ে বেশি দায়ী বলে মনে করেছেন তারা।হ্রদ এলাকার শহর ও বাজারে স্থাপিত স’মিল, ফিলিং স্টেশন, জেটি ঘাট, বাস-ট্রাক টার্মিনাল এবং হোটেল-রেস্তোরাঁসহ আবাসিক এলাকার বর্জ্য ও আবর্জনা হ্রদে ফেলা হচ্ছে। এতে বিভিন্ন স্থানে পলির মাত্রাও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে এলাকার চাষাবাদ, মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।লঞ্চ চালক ও যাত্রীরা জানান, প্রতিবছর চৈত্র থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে পানির অভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত কাপ্তাই হ্রদে ড্রেজিং শুরুর আশ্বাস দিলেও এর কোনও কার্যক্রম চোখে না পড়ায় হতাশা প্রকাশ করেন ভুক্তভোগীরা।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) রাঙামাটির ব্যবস্থাপক ও প্রকল্প পরিচালক কমান্ডার মাইনুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ৫৬ বছরে একবারও ড্রেজিং না হওয়ায় কাপ্তাই হ্রদের নাব্যতা হারিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন কাপ্তাই হ্রদকে বলা হত মৎস্য উৎপাদন ভান্ডার। কিন্তু হ্রদের গভীরতা হ্রাস এবং পানি ও পরিবেশ দূষণের কারণে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন এখন হুমকির মুখে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ হ্রদ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।বিষয়টি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে জেলা প্রশাসক ও হ্রদ পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মো. সামসুল আরেফিন বলেন, কাপ্তাই হ্রদটিকে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা না গেলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। হ্রদটির ড্রেজিং খুব ব্যয়বহুল ব্যাপার। তবে কিছু কিছু জায়গায় ড্রেজিং জরুরি। এ ব্যাপারে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে লেখালেখি চলছে।জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরিফীন বলেন, হ্রদের গভীরতা কমায় চাষাবাদ, পানি সরবরাহ, পর্যটন, নৌ পরিবহন, বিদ্যুৎ ও মৎস্য উৎপাদনসহ হ্রদকে ঘিরে গড়ে ওঠা সবক্ষেত্রে সংকট তৈরি হচ্ছে। সৃষ্টির পর গত ৫৬ বছরে একবারও হ্রদটির ড্রেজিং না হওয়ায় এসব সংকট ক্রমশ বাড়ছে।