Print

ঢাকায় অনৈতিক সম্পর্ক বাড়ছে

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ২৫.০৪.২০১৬ 

রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় বাস। বয়স ৪০ পার হয়েছে। উচ্চশিক্ষিতা মমির সংসার জীবনে প্রবেশ উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময়। স্বামী মিজানুর রহমান একটি বীমা কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

সংসার জীবনে প্রবেশের পর উচ্চতর শিক্ষা জীবন শেষ করেন মমি। প্রথম কন্যার বয়স যখন দুই বছর তখন মমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বছর দুয়েক চাকরিও করেছেন। এরপর জন্ম নেয় দ্বিতীয় মেয়ে। দ্বিতীয় মেয়ের জন্মের পর আর চাকরিতে ফেরা হয়নি মমির। সংসার-সন্তান নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। এরপর আবারো মা হন মমি। বর্তমানে মিজানুর-মমির সংসারে তিন মেয়ে। বড় মেয়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। মেজ মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। আর সবচেয়ে ছোটটি পড়ছে মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণীতে। শেওড়াপাড়াতে নিজেদের ফ্লাটেই বসবাস করেন মমি-মিজানুরের পরিবার। বাইরে থেকে এই পরিবারটিকে সুখি মনে হলেও ভেতরের অবস্থা খুবই নাজুক।

মমির ভাষ্যমতে, বিয়ের পর প্রথম দু বছর স্বামীর সঙ্গে স্মৃতিময় আনন্দঘন কিছু মুহূর্ত থাকলেও বাকি জীবনটা ‘বিষাদময়’। বিয়ের এক বছরের মধ্যেই স্বামীর একাধিক ‘পরকীয়া’ প্রেমের প্রমাণ আসতে থাকে মমির কাছে। যখন স্বামীর সব ‘কুকীর্তি’ প্রকাশ হয়ে গেল তখন আর মমির ভালো-লাগা খারাপ লাগার ‘ধার ধারেননি’ মিজানুর। পরকীয়া প্রেমিকাদের একেকজনকে একেক সময় সঙ্গে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটেই সময় কাটাতে শুরু করেন মিজানুর। সন্তানদের কথা চিন্তা করেই অনেকটা মুখ বুজে এ সব সহ্য করেন মমি।

তবে একটা সময়ে এসে মমি তার জীবনটাকে পাল্টাতে শুরু করেন। সংসার জীবনের বাইরে গড়ে তোলেন নিজের জগৎ। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে যার শুরু। ছোট মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, সেখানে সময় কাটানো, বাসায় নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে তার দ্বিতীয় জীবন শুরু হলেও আস্তে আস্তে সে পরিধি বাড়তে থাকে। প্রথমদিকে স্কুলের অন্য সব শিক্ষার্থীর মায়েদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হলেও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ছেলে বন্ধুর সংখ্যা। আর এই ছেলে বন্ধুদের মধ্যে অধিকাংশেরই বয়স তার বড় মেয়ের চেয়েও কম। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পরে একপ্রকার পরকীয়ায় রূপ নেয়।

সম্পর্কগুলো বর্তমানে অনৈতিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মমির সঙ্গে পরিবর্তন প্রতিবেদকের পরিচয় হয় তারই বান্ধবী হ্যাপির মাধ্যমে। হ্যাপির দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। আর ছোট মেয়ে পড়ে মমির ছোট মেয়ের সঙ্গেই একই স্কুলে। হ্যাপি থাকেন কাজীপাড়াতে। স্বামী অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য। উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর পড়ালেখা হয়নি হ্যাপির। স্বামীর পেশার জন্য দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে এলাকায় থাকতে হয়েছে তাকে। বয়সের ব্যবধানে হ্যাপির স্বামী তার চেয়ে প্রায় ১৮ বছরের বড়। হ্যাপির সঙ্গে তার স্বামীর সংসার জীবনটা সব সময়ই ভালো চলেছে। তবে বয়সের ব্যবধানের কারণে হ্যাপি মানসিকভাবে সুখি নয় এমন দাবি তার বান্ধবী মমির। হ্যাপির সঙ্গে পরিবর্তন প্রতিবেদকের পরিচয় ২০১১ সালে ফেসবুকের মাধ্যমে। পরে হ্যাপির সঙ্গে দেখা ও হ্যাপির মাধ্যমে মমির সঙ্গে পরিচয়।

মমির কাছ থেকে জানা যায় হ্যাপিসহ এমন অনেক নারীর অজানা গল্প। মমি বলেন, আমি যেটা করছি সেটা ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে অনৈতিক। কিন্তু আমার স্বামী বছরের পর বছর যেটা করে এসেছে, সেটা মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছে। নিকটজনদের কাছে বলেও কোনো লাভ হয়নি। বরং মেয়েদের জীবনে এগুলো মেনে নিয়েই চলতে হয় বলে সান্ত্বনার বাণী শুনিয়েছেন বাবা-মা আত্মীয় স্বজন। অনেকটা স্বামীর অবহেলা থেকে মুক্তি পেতেই নিজের দ্বিতীয় জীবনের শুরুটা করেছি। পরে ধীরে ধীরে মনের অজান্তেই বহু দূর চলে গেছি।

মমি আরো বলেন, ‘এখন আমার কাছে মনে হয়- আমি প্রতিশোধ নিচ্ছি, নিজের না পাওয়া-চাওয়াগুলো পূরণ করছি।’ ‘কিন্তু এটা কি কোনো সমাধান হলো?’- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, জানি না।

মমি জানান, তার বান্ধবী হ্যাপির সঙ্গে স্বামীর বয়সের পার্থক্যটা বেশি হওয়ায় সে অনেকটা অসুখি। তারপরও মেনে নিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কবে কীভাবে হ্যাপিও পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়েছেন সেটা বুঝতে পারেননি। মমির মত হ্যাপিরও রয়েছে বহু ছেলে বন্ধু। তবে পারিবারিকভাবে ঘর-সংসার নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকার জন্য অনেক ছেলে বন্ধুকে সময় দিতে পারেন না হ্যাপি। তাই ছেলে বন্ধুকে সন্তুষ্ট করতে মমির সঙ্গে বন্ধু ‘লেনদেনও’ করেন হ্যাপি।

মমির সঙ্গে কথা হলে জানা যায়, মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুটো শাখাতেই তার বান্ধবী রয়েছে। এদের অনেকেই কোনো না কোনোভাবে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িত।

মমি বলেন, ‘বলতে গেলে বলতে হয় অনেক মায়েরাই যারা সন্তান নিয়ে এখানে অপেক্ষা করছেন, তারা পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেকে আছেন সন্তানকে স্কুলে রেখে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ঘুরতে চলে যান। আবার অনেকে এখানেই আড্ডা দেন। স্কুলগুলোর সামনে বেশ গোপনীয়ভাবে বসার ব্যবস্থা রেখে রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুডের দোকানও গড়ে উঠেছে। পুরো স্কুল সময়টা এখানে আড্ডা চলে।’

মমি বলেন, ‘বলতে খারাপ শোনা যায়, আমাদের মধ্যে বয়ফ্রেন্ড লেনদেন হয়। আসলে আমাদের সঙ্গে যারা সম্পর্ক করছে, তাদের বয়সের পার্থক্য আমাদের তুলনায় অনেক কম। এই সম্পর্কের কোনো ভিত্তি বা ডেস্টিনেশন নাই। আমরাও জানি তারাও জানে একটা সময় এই সম্পর্কটা টিকবে না। সেভাবেই আমরা সম্পর্কটা গড়ে তুলি।’

তিনি বলেন, ‘এমন একটা সময় ছিল এসব সম্পর্কের বিষয় ভাবতেও পারতাম না। কিন্তু ফেসবুক আসাতে এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। আমরা যেমন টার্গেট করে সম্পর্ক করি। ঠিক ছেলেরাও আমাদের টার্গেট করে সম্পর্ক করে।’

রাজধানীর ভিকারুন নিসা নূন স্কুলের (ধানমণ্ডি শাখা) অভিভাবক আয়শা কবির পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, মেয়ে-মেয়ে গল্প করলে সমস্যা নেই। ছেলে-মেয়ে গল্প করলেই সমস্যা। আমরা আসলে সময় কাটানোর জন্য এটা করি। এর মধ্যে কেউ কেউ পরকীয়ায় জড়িয়ে যেতেই পারে। যুগটাই তো ভালোবাসার! আমার নিজের কথা যদি বলেন, তাহলে বলব- সকালে স্কুলে কতক্ষণে যাব, এরপর মেয়েকে নিয়ে কতক্ষণে বাসায় পৌঁছাব সেই চিন্তাতেই থাকি। পাশে একটা কোচিং সেন্টার আছে সেখানে বসে সময় কাটাই।

তিনি আরো বলেন, সত্যি বলতে কী স্কুলগুলোর বাইরে অভিভাবকদের বসারও জায়গা নেই। যদি কোনো গার্ডিয়ান অন্য কোনো গার্ডিয়ানের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে এতে তো সমস্যা নেই। আর আপনি যে সম্পর্কের কথা বলছেন, সেটা যেকোনো কর্মক্ষেত্রেই হতে পারে, শুধু বাচ্চার স্কুলের সামনে নয় নিশ্চয়। তবে এটা ঠিক আমাকে দু-একজন বান্ধবী (অভিভাবক) তাদের প্রেমের সম্পর্কের কথা জানিয়েছে।

সামাজিক এমন অবক্ষয়, অনৈতিক সম্পর্কের কারণ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আমান উল্লাহ ফেরদৌস পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘প্রথমত তথ্য প্রযুক্তির অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তারের কারণে এমনটা ঘটছে। এ ছাড়া বৈদেশিক বিশেষ করে ভারতীয় চ্যানেলগুলোর অপসংস্কৃতি আমাদের আটকে ধরেছে। এ সব চ্যানেনের প্রধান দর্শকই হলো গৃহিণীরা। কর্মজীবী নারীদের সেভাবে এ সব চ্যানেল আকৃষ্ট করতে পারেনি।’

আমান উল্লাহ ফেরদৌস বলেন, ‘চ্যানেলগুলো এমনভাবে তাদের সিরিয়াল তৈরি করে সেখানে পারিবারিক ক্ষুদ্র সমস্যাটাকে বড় করে দেখানো হয়। অবাক হই- এসব সিরিয়ালে নায়কের ভূমিকায় থাকেন কোনো এক রমণীর পরকীয়া প্রেমিক। অথবা কোনো একজন স্বামীর পরকীয়া প্রেমিকা-ই এসব নাটকের প্রধান চরিত্র। তাদের চরিত্রগুলোকে এমনভাবে ইতিবাচক দেখানো হয়, তখন চরিত্রের স্বামী বা স্ত্রী হয়ে যায় ভিলেন। আর দর্শক সব সময় ইতিবাচকেরই পক্ষে থাকে। দর্শক চাই- নায়ক-নায়িকার মিলন, ভিলেনের পতন। এখানে মনের অজান্তেই একজন দর্শক অসামাজিক ও অনৈতিক সম্পর্কটাকে সমর্থন দিচ্ছেন। আর এসব চরিত্রের কাল্পনিক কাহিনীগুলো দর্শকের মনের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে। অনেক রমণীর কাছে স্বামীর ক্ষুদ্র অবহেলাটা অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়, যেটা তার স্বামী মনের অজান্তে কিংবা সময়-বাস্তবতার জন্য করেছে।’

এই সমাজ বিজ্ঞানী বলেন, ‘পর্ণ মুভি কেন নিষিদ্ধ হয়, কারণ পর্ণ মুভি মানুষের রুচি বোধ ও মনের চাওয়া-পাওয়াটাকে আগ্রাসী-অনৈতিকভাবে গড়ে তোলে। ঠিক ভারতীয় চ্যানেলগুলোর নাটক প্রচণ্ড কুপ্রভাব ফেলছে নারী দর্শকদের মধ্যে।’

‘নিজেরা করি’ সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ও সমাজকর্মী খুশী কবির পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবার হয়ে যাওয়া, নাগরিক জীবনের যান্ত্রিক ব্যস্ততা, অপসংস্কৃতি, বিষন্নতা, নারী শুধুমাত্র ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে এমনটা ঘটছে। একটা মানুষ সারাদিনের একটা অংশে সঙ্গী-সঙ্গীনীর সঙ্গে সময় কাটাতে চায়। কিংবা আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে চায়। কিন্তু নগর জীবনের ব্যস্ততায় সেটা কতটুকু সম্ভব। স্বামী সকালে অফিসে বা কর্মস্থলে চলে যাচ্ছেন আবার রাতে ফিরছেন ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে। তখন স্ত্রীর সঙ্গে মানসিক সম্পর্কটা উন্নত করতে অনেক সময় তারা পারছেন না। ফলে তাদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। একটা সময় তারা ঢুকে পড়ছে দ্বিতীয় জীবনে।’

সামাজিক এমন অবক্ষয় রোধ করতে, পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি জোর দিয়েছেন এই সমাজকর্মী। তিনি বলেন, ‘ধর্ম শুধুমাত্র বেহেশত-দোজখের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য না। মানুষের পার্থিব জীবনের অনেক দিক-নির্দেশনা নৈতিক বা ধর্মীয় শিক্ষায় রয়েছে। এছাড়া পরিবারের সকল সদস্যকেই একে অপরকে বুঝতে হবে, সময় দিতে হবে। মানুষ তার মানসিক শান্তির জন্যই অনেক কিছু করে সেটা ন্যায় কি অন্যায় একটা পর্যায়ে এসে তা বুঝতেও পারে না। আর এ কারণেই নগরজীবনে অনৈতিক সম্পর্ক বাড়ছে।’

আমান উল্লাহ ফেরদৌসের মতে, অপসংস্কৃতিকে রোধ করতে হবে, গণমাধ্যমগুলো শিক্ষণীয় নাটক, অনুষ্ঠান প্রচার করলে সেখান থেকে মানুষ কিছু শিখবে। পারিবারিক ক্ষুদ্র দ্বন্দ্বগুলোকে বড় করে না দেখিয়ে, বড় সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান হয় সে বিষয়গুলো নাটকে ফুটিয়ে তুলতে হবে। তথ্য প্রযুক্তি অবাধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হলে, এর কুফল সম্পর্কে সামাজিক শিক্ষা সবাইকে দিতে হবে।’