Bangladesh Manobadhikar Foundation

Khan Air Travels

Premier Bank Ltd

বিডিনিউজডেস্ক.কম | তারিখঃ ৩০.০৮.২০১৫

কিডনি বিকল হলে ডায়ালিসিস সাধারণত হাসপাতালে করতে হয়-এটা অনেকের ধারণা।

কিন্তু ডায়ালিসিস বাড়িতেও করা সম্ভব। লিখেছেন কিডনি ফাউন্ডেশন ও হাসপাতাল, ঢাকার চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশীদ 

দেশে প্রায় দুই কোটি লোক কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত, যার প্রধান কারণ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি প্রদাহজনিত নেফ্রাইটিস ইত্যাদি। এর সঙ্গে পাথরজনিত কিডনি রোগ ও বিভিন্ন ধরনের বংশানুক্রমিক কিডনি রোগও জড়িত।

কিডনি অকেজো রোগ

যখন কোনো মানুষের দুটি কিডনির কার্যকারিতা ৯০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়, তখন তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমতে থাকে। আস্তে আস্তে শরীর ফ্যাকাশে ও নিস্তেজ হয়ে যায়। ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা, শরীর ঝিমিয়ে পড়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা, চুলকানি ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। এ অবস্থায় ডায়ালিসিস অথবা কিডনি সংযোজনের মতো পদ্ধতি বেছে নিতে হয়। কিডনি অকোজো রোগীর দুই ধরনের ডায়ালিসিসের পদ্ধতি রয়েছে। একটি হেমোডায়ালিসিস ও অন্যটি পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিস।

হেমোডায়ালিসিস

মেশিনের মাধ্যমে রক্তকে পরিশোধিত করার পদ্ধতিটির নাম হেমোডায়ালিসিস। এটি তুলনামূলক জটিল প্রক্রিয়া, যা করার আগে রোগীর ডান হাতের কব্জির ওপরে বা কনুইয়ের মধ্যে শিরা বা রক্তবাহী নলের সংযোগ স্থাপন করা হয়, যাকে এ-ভি ফিস্টুলা বলা হয়। এ-ভি ফিস্টুলার মাধ্যমে রক্ত বের করে মেশিনের মাধ্যমে রক্ত পরিশোধন করা হয় এবং পরিশোধিত রক্ত আবার শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রতিবার তিন থেকে চার ঘণ্টা হিসাবে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন করতে হয়।

পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিস বা সিএপিডি

পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিসে এ-ভি ফিস্টুলার প্রয়োজন হয় না। এটা শুরুর আগে শুধু পেটের ভেতর একটি রাবার ক্যাথেটার প্রতিস্থাপন করা হয়। এ ধরনের ইমপ্ল্যান্ট ডাক্তারই করেন। পেটের ভেতর ওই রাবার ক্যাথেটার দিয়ে দুই লিটার বিশেষ ধরনের বিশুদ্ধ তরল (যা রক্তের ঘনত্বের সঙ্গে তুলনীয়) ছয় থেকে আট ঘণ্টা রাখা হয়। এরপর ওই পানি অন্য একটি নলের সাহায্যে বের করে দেওয়া হয়। এই ছয় থেকে আট ঘণ্টায় পেটের ভেতর পেরিটোনিয়ামের আচ্ছাদন রক্তের ফিল্টারের কাজ করে। এ ধরনের সাইকেল বা চক্র চলতেই থাকে। এ সময় পেটের ভেতরের আচ্ছাদিত মেমব্রেন পানি দিয়ে শরীরের দূষিত রক্তকে পরিশোধন করে, যা একটি সুস্থ-স্বাভাবিক কিডনি করে থাকে। তবে দুই লিটার পানি সব সময় পেটে রাখতে হয়। রাতে আট ঘণ্টা ঘুমানোর সময়ও তাকে পানি পেটে নিয়ে ঘুমাতে হয়; যদিও এতে ঘুমের কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। পানি থাকা অবস্থায় রোগী দৈনন্দিন নানা কাজকর্মও করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকেই কন্টিনিউয়াস অ্যামবুলেটরি পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিস বা সিএপিডি বলে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সিএপিডি ব্যাপক জনপ্রিয়। মেক্সিকো ও হংকংয়ে ৮০ শতাংশ ডায়ালিসিস সিএপিডির মাধ্যমে করানো হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান ও চীনেও এখন এ পদ্ধতিতে বেশি ডায়ালিসিস হচ্ছে।

যাদের ক্ষেত্রে কার্যকর

কিডনি ফেইলিউর হয়েছে এমন শিশু বা অল্প বয়স্ক রোগী, অধিক বয়স্ক ও হার্টের রোগীর জন্য সিএপিডি বেশি কার্যকর। যেসব কিডনি ফেইলিউর রোগী ঘন ঘন হাসপাতালে আসতে চান না, যাঁরা ঘরে বসে চিকিৎসা নিতে ইচ্ছুক অথবা যেসব স্থানে হেমোডায়ালিসিসের ব্যবস্থা নেই, তাঁদের জন্য সিএপিডি সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি। ঘরে বসেই চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি রোগী চাকরি বা ব্যবসাসহ তাঁর দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারেন, যা হেমোডায়ালিসিসের ক্ষেত্রে কঠিন। তা ছাড়া সিএপিডি রোগীদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, ঘন ঘন রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, খাবারের তেমন বাধ্যবাধকতা নেই এবং রোগীরাও শারীরিকভাবে ভালো থাকেন।

হেমোডায়ালিসিসের জন্য মেশিন, ডায়ালিসিস বেড, একটি নির্দিষ্ট জায়গা, কৃত্রিম কিডনি পরিশোধিত পানির প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া ডাক্তার, নার্স ও বিদু্যুতের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিসে আনুষঙ্গিক কিছুই প্রয়োজন হয় না। রোগী ঘরে বসেই এ ধরনের ডায়ালিসিস ডাক্তারের দেখানো উপায়ে নিজে নিজেই করতে পারে।

সিএপিডির অসুবিধা

সিএপিডির বড় অসুবিধা হলো পেটের আচ্ছাদিত মেমব্রেনের ইনফেকশন। তবে পেটের ভেতর পরিশোধিত পানি দেওয়ার সময় রোগী যদি হাত পরিষ্কারসহ সতর্কতা অবলম্বন করে পানি প্রবেশ করান, তবে ইনফেকশন হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘরে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করলে ইনফেকশন বা সংক্রামক জীবাণু পেটে প্রবেশ করতে পারে না। আর সংক্রামক জীবাণু প্রবেশ করলেও তা জীবাণুনাশক ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে নির্মূল করা যায়। আবার প্রবেশকৃত পানি বের করতেও জীবাণুমুক্ত সেট ব্যবহার করা হয়, যা ইনফেকশনের ঝুঁকি কমায়। তবে সিএপিডি ব্যবহারকারী রোগীদের রক্তে চর্বির মাত্রা বেড়ে যেতে পারে এবং ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে ইনসুলিন বা ওষুধের পরিমাণ বাড়াতে হতে পারে।

চিকিৎসার খরচ

হেমোডায়ালিসিসের খরচ তুলনামূলক কিছু বেশি, তবে তা নির্ভর করে হাসপাতালের ওপর। বিভিন্ন হাসপাতালে হেমোডায়ালিসিসের খরচ বিভিন্ন ধরনের। সাধারণত হাসপাতালে ডায়ালিসিসের খরচ তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকার মতো। মাসে লাগে ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিসে এ খরচ কম। প্রতিদিন দুইবার করতে হয়। প্রতিবার খরচ হয় ৩৬০ টাকা। মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। হেমোডায়ালিসিসের তিন ভাগের দুই ভাগের মতো। আশা করা যায়, পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিসের ব্যবহার যত বাড়বে এর খরচ তত কমবে। এ ছাড়া সরকারিভাবে তরলের দাম কমালেও খরচ কমবে।