Print

বেতনাপারের বেদনা

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | ২৯.০৩.২০১৬

একটা সময় বেতনা নদী ছিল সাতক্ষীরার মানুষের প্রাণ। নৌকা চলত, বাণিজ্য হতো।

এখন সব ইতিহাস। বেতনা ভরাট হয়ে গেছে। পানি না সরায় প্রতিবছর ছয় মাস এলাকায় জলাবদ্ধতা থাকে। বেতনাতীরে এখন আর কোনো ফসল নেই, মরে গেছে গাছ-গাছালি। যে বেতনাতীরে একসময় কাজকর্মে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, এখন সেখানে রাজ্যের দুঃখ, বেদনা। মানুষ চলে যাচ্ছে বেতনার তীর ছেড়ে।

বেতনা নদী ও তার তীরবর্তী নারী-শিশুর প্রাণপ্রবাহের দাবিতে আয়োজিত এক গণমাধ্যম সংলাপে ভুক্তভোগী মানুষ এভাবেই প্রকাশ করেছেন তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা। আজ মঙ্গলবার সকালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাছখোলা মাঝের পাড়ায় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্য রক্ষা টিম আন্তর্জাতিক পানি দিবস উপলক্ষে এই গণমাধ্যম সংলাপের আয়োজন করে।

সংলাপে উঠে আসে নদীর সঙ্গে নারী ও শিশুর সম্পর্কের কথা। ভুক্তভোগী নারীরা জানান, জলাবদ্ধতার সময় নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি বিপদাপন্ন হয়ে পড়ে। সে সময় জন্ম নেওয়া শিশু প্রতিবন্ধী, অথবা পুষ্টির অভাবে হাড় জিরজিরে হয়ে যায়। মা ও শিশুসহ সব বয়সের মানুষ চর্মরোগে আক্রান্ত হয়। জলাবদ্ধতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। সচরাচর মা ও শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকে।

বেতনাপারের মানুষের জলাবদ্ধতা একটা বড় সমস্যা। এ নিয়ে রাজনীতিও আছে। এলাকাবাসীই জানান, যে যখন ক্ষমতায় আসে, তারা শুধু প্রতিশ্রুতিই দেয়। কিন্তু কাজ আর করে না। বছর তিনেক আগে বুজে যাওয়া বেতনা খনন শুরু করেছিল সরকার। আশাবাদী হয়েছিল মানুষ। কিন্তু খননের কিছুদিনের মধ্যেই আবারও পলিতে ছাপিয়ে গেছে বেতনা। বর্ষা মৌসুমের আগে এই খননকাজ চালালেও বর্ষার শুরুতেই দুই পাশের মাটি ধসে পড়ে বেতনা সেই বিকৃত চেহারায় ফিরে গেছে।

গ্রামবাসী আরো বলেন, বেতনার দুই তীর প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। চরজুড়ে তারা বাড়িঘর, ইটভাটা তৈরি করে পানিপ্রবাহ বন্ধে সহায়তা করেছে। এখন নদীতে মৃদু জোয়ারভাটা থাকলেও তা পানিপ্রবাহের জন্য অপ্রতুল।

বেতনাপারের বৃদ্ধ মোকছেদ আলী। তিনি বলেন, ছাগলার গেটসহ কয়েকটি স্লুইসগেট দিয়ে এখন আর পানিনিষ্কাশন হয় না। নদীর তলদেশ গেট অপেক্ষা উঁচু হয়ে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন চারপাশে ছোট ছোট পকেট ঘের করে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া ও পয়োনিষ্কাশন একটি বড় সমস্যা উল্লেখ করে ভুক্তভোগীরা বলেন, এলাকায় কোনো স্থায়ী পাকা পায়খানা নেই। বিশেষ করে নারীদের সমস্যা খুব বেশি। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা ও ইউনিয়ন পরিষদ কিছু কিছু কাজ করলেও তা চাহিদা মেটাতে পারেনি। পানির কবল থেকে বেঁচে থাকার জন্য নিজ নিজ উদ্যোগে ভিটেমাটি উঁচু করেছে অনেকে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারগুলো তা পেরে উঠছে না।

বেতনা পাড়ের শিশুরা পারিবারিক দারিদ্র্য, যোগাযোগ সংকট এবং অন্যান্য কারণে স্কুল ছেড়ে কাজের সন্ধানে এদিক-ওদিক চলে গেছে। এখন এলাকায় কর্মসংস্থানের খুবই অভাব। ক্ষেত নেই, ফসলও নেই। পেয়ারা, পেঁপে, সজিনা, কাঁঠালসহ নানা ধরনের ফলফলাদির গাছ অকালে মারা গেছে।

বেতনা খনন করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি তুলে গ্রামবাসী বলেন, খননের মাটি ফেলতে হবে নদীর মূল সীমানার বাইরে। তাহলে বৃষ্টিতে ধুয়ে আবার নদীতে পড়বে না। এ ছাড়া বেতনার সঙ্গে সংযুক্ত সব খাল উন্মুক্ত করে স্লুইসগেটগুলো সচল করতে হবে। বেতনাপারে সুপেয় পানির চরম সংকট রয়েছে। টিউবঅয়েলগুলোতে নোনাপানি ওঠে। ফলে তাদের খেতে হয় পুকুরের পানি।

সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে ও সাংবাদিক শেখ তানজির আহমেদের সঞ্চালনায় মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এম কামরুজ্জামান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সুভাষ চৌধুরী, কল্যাণ ব্যানার্জি, মিজানুর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জ্বল, মো. আসাদুজ্জামান, হাফিজুর রহমান মাসুম, বেতনাপারের বাসিন্দা রহিমা খাতুন, হাসিনা খাতুন, অঞ্জলি বিশ্বাস, নাজমা বেগম, আয়েশা খাতুন, রাবেয়া, জেসমিন প্রমুখ।