Print

ঘুরে দাঁড়িয়েছে যশোরের পোলট্রি শিল্প

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | ১৬.০৪.২০১৬

 

অফুরন্ত সম্ভাবনার এ শিল্পটির বিকাশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগের কমতি নেই। তার পরও বড় পুঁজির কাছে মার খাচ্ছে স্বল্প পুঁজির মালিকরা। এ ক্ষেত্রে তাদের দাবি সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে তারাও দেখিয়ে দিতে পারে এ খাতের সম্ভাবনাকে কিভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব। যশোরে পোলট্রি শিল্পের বিকাশ শুরু হয় নব্বইয়ের দশক থেকে। ক্রমান্বয়ে তা বেড়েছে। মাঝে মধ্যে বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু, এভিয়েন ফ্লুসহ নানা রমকের রোগ শোকের কারণে হোঁচট খেয়েছে  অপার সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি। পোলট্রি শিল্পের বিকাশের কারণে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছে যশোরের হাজার হাজার বেকার। কেউ একা একা আবার অনেকে সমিতি করে গড়ে তুলেছেন পোলট্রি খামার। বাড়ির বউ ঝিরা নিজেদের মতো করে গড়ে তুলেছেন ছোট ছোট হাঁস মুরগির খামার। এক সময় যেখানে দেশি হাঁস মুরগি ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যেত না সেই অজপাড়া গায়ে এখন পোলট্রির চাষ হচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া দেশি হাঁস মুরগির বাজার দখল করছে পোলট্রি মুরগি আর ফার্মের হাঁস। দেশি ডিমের বাজারও দখল করে নিয়েছে খামারের ডিম। জেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলার ৮টি উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছোট বড় প্রায় ১২শ’ পোলট্রি মুরগির খামার রয়েছে। মুরগির পাশাপাশি হাঁসের খামারও গড়ে উঠছে প্রচুর। নানা রকম অসুখ-বিসুখে দেশি প্রজাতির হাঁস মুরগির চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ায় মানুষ দিন দিন পোলট্রি মুরগি, মুরগির ডিম আর হাঁসের প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যশোর জেলায় প্রতি মাসে ২ মেট্রিক টন মুরগির মাংসের চাহিদা রয়েছে। আর ডিমের চাহিদা রয়েছে কমপক্ষে ৫ কোটি। যার শতভাগ চাহিদা পূরণ করছেন এখানকার খামারিরা। শুধু তাই নয় চাহিদার উদ্বৃত্ত মাংস ও ডিম রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জেলা শহরে রপ্তানি হচ্ছে। যশোর জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান জানান, যশোর জেলা পোলট্রি মুরগি ও মাংস উৎপাদনে সারপ্লাস জেলা। এখানকার খামারিরা যে পরিমাণ পোলট্রি মুরগি ও ডিম উৎপাদন করছেন তা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাইরের জেলার চাহিদা মেটাচ্ছে। তিনি বলেন, দেশি মুরগি আর পোলট্রি মুরগির মাংসে খাদ্যমানের খুব একটা তারতম্য নেই। দেশি মুরগি আর ডিমের মতোই পুষ্টিমান সম্পন্ন পোলট্রি মুরগি ও ডিম। তাছাড়া চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশি মুরগি ও ডিমের আকাল হচ্ছে। দামের দিক দিয়েও প্রায় ডাবল। ফলে মানুষ সহজে হাতের নাগালে কম দামে পাওয়ার কারণে পোলট্রি মুরগির ডিম আর মাংসের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। পোলট্রি মুরগি ছাড়াও, সোনালী, লেয়ারসহ বিভিন্ন প্রজাতির মুরগির চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় দিন দিন এই খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়ছে। দেশের শিক্ষিত বেকার ছেলেরা এ শিল্পের প্রতি ঝুঁকছে। যশোরও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, যশোরে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষিত ছেলে ও মেয়ে নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা সবাই সরকারি বা বেসরকারি চাকরির পেছনে না ঘুরে নিজেরাই নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে পোলট্রি শিল্পকে বেছে নিয়েছেন। এদিকে দিন দিন পোলট্রি শিল্পের বিকাশের কারণে যশোরের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও তার ছোঁয়া স্পষ্ট। গ্রামাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, কেশবপুর, মনিরামপুর, অভয়নগর, বাঘারপাড়াসহ প্রতিটি উপজেলায় এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে ছোট বড় ২-১টি পোলট্রি মুরগির খামার গড়ে ওঠেনি। এর প্রভাবে প্রতিটি হাটবাজারে বসেছে পোলট্রি মুরগি আর ডিমের পাইকারি ও খুচরা বাজার। খামারের পাশাপাশি ডিম ও মুরগির ব্যবসাতেও পুরুষের পাশাপাশি নারীরা কাজ করছে। ফলে পারিবারিক ভাবেও নারী পুরুষ অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন। এদিকে লাভজনক হওয়ায় এ শিল্পের প্রতি ঝুঁকছে বড় বড় পুঁজিওয়ালারা। ডিম আর মাংস ছাড়াও এ জেলার বড় বড় খামারে প্রতি মাসে বিভিন্ন প্রজাতির  প্রায় ৫ লাখ মুরগির বাচ্চা তৈরি হচ্ছে। যা স্থানীয় ছোট ছোট খামারিদের চাহিদার একটা বড় অংশ পূরণে সক্ষম হচ্ছে। বাকি চাহিদা পূরণে খামারিদের বাইরের জেলাগুলোর দিকে হাত বাড়াতে হচ্ছে। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, একটি ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা মাত্র ৩২ থেকে ৩৫ দিনের ব্যবধানে খাওয়ার উপযোগী হয়। এ সময়ের ব্যবধানে যা  ১ থেকে দেড় কেজি সাইজের হয়ে থাকে। বর্তমান বাজার দরে যার মূল্য কমপক্ষে ১৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকার কম নয়। আর এর জন্য ব্যয়  হয় ৮০ থেকে ৯০ টাকার মতো। এতো অল্পসময়ে বিনিয়োগ করে অন্য কোনো খাতে এর চেয়ে বেশি লাভ করা সম্ভব নয় বলে দাবি করেন জেলা  প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান। আর এ কারণে দিন দিন এ শিল্পের বিকাশ ঘটছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে লাভজনক হলেও এ খাতে ঝুঁকি কম নয় বলে জানালেন একাধিক পোলট্রি খামারি। রূপদিয়ার নজরুল ইসলাম ১০ বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি মনে করেন, পোলট্রি শিল্পের মতো লাভজনক শিল্প কৃষি সেক্টরে দ্বিতীয়টি নেই। এ খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্বল্প সুদে  ও সহজ শর্তে ঋণ কার্যক্রম  চালু করতে হবে। যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর পোলট্রি খামারির মালিক ফারুক হোসেন এমএসসি জানান,  একটার পর একটা আঘাত মোকাবিলা করেও জেলার পোলট্রি শিল্প মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। গত বছরগুলোতে নানারকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে এ অঞ্চলের খামারগুলো ঘুরে দাঁড়িয়েছে।