Sunday 11th of December 2016

সদ্য প্রাপ্তঃ

***চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারবে ভারত***

Bangladesh Manobadhikar Foundation

Khan Air Travels

UCB Debit Credit Card

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ২০.০৪.২০১৬

তিন বেলা পেট ভরে খাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।খেয়ে না-খেয়ে কাটে দিন।

এমন দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে এ বছর অনুষ্ঠিত আন্তপ্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় দীর্ঘ লাফে সারা দেশে প্রথম এবং ১০০ মিটার দৌড়ে তৃতীয় হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে কামরুল।মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত হরেকৃষ্ণপুর গ্রামে কামরুলদের বাড়ি। সে নিজ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। ক্ষুধা পেটে খালি পায়ে হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে কামরুলের দেশজয়ের গল্প এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে। তার সাফল্যের খবর শুনে অনেকেই এখন তাকে দেখতে আসছে।চলতি বছরের ২১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে জাতীয় পর্যায়ে আন্তপ্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় কামরুল সারা দেশের মধ্যে দীর্ঘ লাফে প্রথম এবং ১০০ মিটার দৌড়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। পরদিন বিকেলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাল্টিপারপাস হলে প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান।

কামরুলের খোঁজে

মহম্মদপুরের নিভৃত গ্রাম হরেকৃষ্ণপুর। গ্রামে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, কামরুলদের বাড়ি কোথায়? কেউই ঠিকঠাক বলতে পারে না।

যখন বলি, দীর্ঘ লাফে (গ্রামের ভাষায় লম্বা লাফ) দেশসেরা কামরুলের কথা। তখন চিনে ফেলে সবাই। ‘আরে, আগে বলবেন না, “লাফ কামরুল”।’ লম্বা লাফের কারণে কামরুলের নামের সঙ্গে এখন ‘লাফ’ শব্দটি জুড়ে গেছে। কামরুলদের বাড়িতে দারিদ্র্যরেখা স্পষ্ট দৃশ্যমান। বিদ্যুৎ নেই। একটিমাত্র টিনের দোচালা জরাজীর্ণ ঘর। ৪ শতাংশ জমির ওপর এ ঘরই মাথা গোঁজার ঠাঁই। জানা গেল, বাবা অলিয়ার রহমান ঢাকার শ্যামপুরে একটি কারখানায় কাজ করেন। মা গৃহিণী। চার ভাইয়ের মধ্যে কামরুল তৃতীয়। বড় এক ভাই শ্রমিক। অন্যজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। পাঁচজনের পরিবারের তিন বেলা ঠিকমতো খাবারই জোটে না। আলাপকালে কামরুলের মা রুপালি বেগম জানালেন সংসারের টানাপোড়েনের কাহিনি, কামরুলের স্বপ্ন আর বেড়ে ওঠার কথা। বললেন, ‘অভাব আর অভাব। অভাবের জন্যি আমার মনিরে পেট ভরে তিন বেলা ঠিকমতো ভাতই দিতি পারিনে। কাপুড় দিতি পারিনে। ঢাকায় খেলতি যাবি তার এক জুড়া জুতোও ছিল না। কিনে দিতি পারিনি। তারপরও ও দেশের মধ্যি প্রথম হইছে। আমি ভাবতিই পারিনি। আপনারা দশজন আমার মনির জন্যি দুয়া করবেন, যাতে খাতি-পরতি পারে। খেলাধুলা করে উপরে উঠতি পারে, সে জন্য একটু সহযোগিতা করবেন।’

জুতায় স্বপ্নভঙ্গ

কামরুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে জানায়, জাতীয় পর্যায়ে রেকর্ড দীর্ঘ লাফে সে দেশসেরা হয়েছে। খালি পা আর বড় আসরের উপযোগী প্রশিক্ষণ না থাকায় ১০০ মিটার দৌড়ে সে তৃতীয় হয়।

তার ধারণা, পায়ে দৌড়ানোর জুতা আর এত বড় জায়গায় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ধারণা বা প্রশিক্ষণ থাকলে সে দৌড় প্রতিযোগিতাতেও প্রথম হতো। তাকে কেউ রুখতে পারত না। কামরুলের ভাষায়, ‘অন্য সব প্রতিযোগীর পায়ে দৌড়ের জুতা ছিল। কেবল জুতা ছিল না আমার পায়ে। কারণ, বাড়ি থেকে জুতা কিনে দিতে পারেনি। তাই খালি পায়েই ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তৃতীয় দেশসেরা হই। কিন্তু আফসোস থেকে গেল, জুতার জন্যেই আমি প্রথম হতে পারিনি। পায়ে জুতা থাকলে আমি প্রথম হতামই। কেউ আমার আগে যেতে পারত না। লাফের মতো প্রথম হতাম। এই কথা আমি কোনো দিন ভুলব না।’

ইচ্ছেঘুড়ি

দৌড়-লাফের প্রতি কামরুলের প্রচণ্ড ঝোঁক। ক্লাসের ফাঁকে বা টিফিনে, গ্রামের মাঠে, নদীর চরে—সব জায়গাতেই অবিরাম দৌড়-লাফই ছিল কামরুলের একমাত্র শখ। পেটে ক্ষুধা নিয়ে ক্লান্তিহীন অনুশীলন করত। কেউ শিখিয়ে বা বুঝিয়ে দেয়নি। নিজেও বুঝে করেনি। তারপরও এল দেশসেরা এই সাফল্য। কামরুলের ইচ্ছা, মাগুরার ছেলে বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের মতো সেও বিকেএসপিতে পড়বে। কিন্তু সে সামর্থ্য নেই পরিবারের। তাই ইচ্ছেঘুড়ি অধরাই না থেকে যায় এ খুদে ক্রীড়াবিদের!

তাঁরা বললেন

হরেকৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ হুমায়ুন কবির জানালেন, দৌড়-লাফে কামরুল বরাবরই ভালো। কোনো প্রশিক্ষণ আর পরিচর্যা ছাড়াই সে গ্রামের মাঠে, নদীর চরে একাই অনুশীলন করত।মহম্মদপুর উপজেলা, মাগুরা জেলা ও খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। গ্রামের কানাচে পড়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভা কামরুল বিকশিত হলে ভবিষ্যতে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে পারবে। কামরুলদের প্রতিবেশী স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মো. মাসুদুল হক বললেন, ‘সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের ছেলে কামরুল। প্রতিদিন অভাবের সঙ্গে লড়াই করে চলছে পরিবারটি। সেই পরিবারের ছেলে কামরুলের দেশজয় সাধারণ কোনো গল্প নয়, গৌরবের। আমরা কামরুলকে নিয়ে গর্ব করছি। তার কথা এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে। আমরা কামরুলের কারণে গর্বিত।’ মাগুরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম সিরাজুদ্দোহা বলেন, কামরুলের মতো গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য প্রতিভা সুপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। যারা মূলত সঠিক পরিচর্যা ও সুযোগের অভাবে প্রস্ফুটিত হতে পারছে না। তিনি সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কোমলমতি দরিদ্র শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। প্রাথমিকের খুদে শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক ও নান্দনিক বিকাশের জন্য প্রতিবছর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা আয়োজন করে। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বিজয়ীরা ক্রিকেট বল নিক্ষেপ, দীর্ঘ লাফ, উচ্চ লাফ, দৌড় ইত্যাদি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এ বছর ওই প্রতিযোগিতায় মাগুরার মহম্মদপুরের অজপাড়াগাঁয়ের কামরুল দেশসেরা হয়।