Print

খুলনার বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ কোম্পানির ওষুধ

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ০৭.০৫.২০১৬

যথাযথ নিয়ম না মানায় কার্লোফার্মা কোম্পানির ‘কার্লোভিট’, রহিত ফার্মার ‘প্র্যাকটিন’ এবং স্পার্ক ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের ‘স্পার্কক্লো-টিআর’ নামের ওষুধ উৎপাদন

ও বাজারজাত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবাধে খুলনার বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হচ্ছে এসব ওষুধ। অসাধু ব্যবসায়ীরা নিষিদ্ধ ওষুধ এখনও বাজারজাত করছে। ওষুধ প্রশাসন খুলনার বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালিয়ে এর সত্যতা পেয়েছে।খুলনায় অভিযানে ২ হাজার পিস নিষিদ্ধ ওষুধ উদ্ধার হয়েছে। এছাড়া এসব ওষুধের পাশাপাশি নিষিদ্ধ আরও ৫১ ধরনের ওষুধ বাজারে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে স্যাম্পল পরীক্ষায় নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাত করার প্রমাণ পাওয়ায় স্পার্ক ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড নামে এক ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই মামলা হয়েছে। এছাড়া ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরির অভিযোগে সম্প্রতি ২০টি কোম্পানির ওষুধ উৎপাদন লাইসেন্স বাতিল, ১৪টি কোম্পানির সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক (নন-পেনিসিলিন, পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপ) উৎপাদনের অনুমতি বাতিল এবং ২২টি কোম্পানির পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপের অ্যান্টিবায়েটিক উৎপাদনের অনুমতি স্থগিত করার সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
খুলনার ড্রাগ সুপার মাহমুদ হোসেন বলেন, খুলনার বাজার থেকে নিষিদ্ধ ধরনের ওষুধ বাজারে সরবরাহ বন্ধের জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ হওয়া ওষুধ কোম্পানির খুলনাস্থ কর্মকর্তা, ড্রাগ সমিতির নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে সভা করে এসব ওষুধ বাজার থেকে তুলে নিতে বলা হয়েছে। এরপরও যদি কোনও ব্যবসায়ী নিষিদ্ধ এ ধরনের ওষুধ কেনাবেচা বা কোম্পানির কোনও লোক বাজারে সাপ্লাই দিলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।নগরীর যেকোনও ফার্মেসিতে এসব ওষুধ বিক্রির তথ্য পেলে তিনি তাদের নজরে আনতে ভোক্তাদের প্রতি অনুরোধ করেন।ড্রাগ সুপার খুলনা কার্যালয় সূত্র জানান, অভিযানকালে পাইকগাছা উপজেলা বাজারের মোমিনুল ইসলামের ডিজিটাল ফার্মেসি থেকে কার্লোফার্মা কোম্পানির ‘কার্লোভিট’, তরুণ কুমার দাসের মালিকানাধীন রহিত ফার্মা থেকে ‘প্র্যাকটিন’, ভারতীয় জিএসকে কোম্পানির নকল ব্যাথার মলম বেটনোভেট-এন, বেটনোভেট-সি ও রেকিটভেনজা কোম্পানির বেটনোভেট-মুভ, হাকীম মো. শাহাদাত হোসাইনের মালিকানাধীন পাইকগাছা ইউনানী দাওয়াখানা থেকে ক্যালসিয়াম সেনডোজিন, জেসটেন, ঝান্ডুবাম, রিংগার্ডসহ প্রায় ২ হাজার পিস নিষিদ্ধ ওষুধ উদ্ধার করা হয়।
খুলনা মহানগরীর হেরাজ মার্কেট, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতাল, নগরীর বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে এবং বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার ফার্মেসিগুলোতেও নিষিদ্ধ এসব ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। অনেকেই গোপনে আবার কেউ কেউ প্রকাশ্যে এসব ওষুধ বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা কিছু সংখ্যক লোক না বুঝেই এসব ওষুধ কিনছেন।খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. মাসুম আলী বলেন, নিষিদ্ধকৃত ওষুধ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতি। এ সকল ওষুধ ব্যবহার করলে সাধারণত কিডনি, ব্রেইনসহ শরীরে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।খাওয়ার স্যালাইন,‘ওরস্যালাইন-এন’ লেখা মোড়কের আকার, কালার (রং) এবং সাইজ হুবহু একই। কিন্তু এটি অনুমোদিত কোনও প্রতিষ্ঠানের খাওয়ার স্যালাইন নয়। এটি সম্পূর্ণ নকল। মেডিলাইফ ফার্মা বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ‘মেডিলাইফ ওরস্যালাইন-এন’ নামে এটি এখন বিক্রি হচ্ছে খুলনার বাজারে। যে প্রতিষ্ঠানের কোনও ঠিকানা এর মোড়কের গায়ে লেখা নেই। প্রচণ্ড গরমে মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে না বুঝেই পান করছেন এ স্যালাইন। সম্প্রতি ওষুধ প্রশাসন খুলনার বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালিয়ে নকল এ স্যালাইন জব্দ করে।সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছেন, হুবহু এসএমসির ওরস্যালাইন-এন এর মতো দেখতে হওয়ায় ক্রেতারা না বুঝেই নকল স্যালাইন পান করছেন। যা কড়া নজরদারি এবং মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বাজার থেকে অপসারণ করা হচ্ছে।

চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সেখ মো. আখতার-উজ-জামান বলেন, মূলত খাওয়ার স্যালাইন তৈরি হয় চিনি ও লবণের সংমিশ্রনে। কিন্তু নকল স্যালাইনে চিনি ও লবণের পিউরিফাই করা হয় না। সঠিকভাবে পিউরিফাই করা না হলে এ স্যালাইন পানে মানবদেহে ব্যাক্টেরিয়াল গ্যাস্ট্রো এন্ট্রাইটিস হতে পারে। এতে ডায়রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাথা ব্যাথা ও বমি হতে পারে। সর্বোপরি এতে শরীরে লবণের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলেও জানান তিনি।সম্প্রতি ড্রাগ সুপার খুলনার নেতৃত্বে অভিযানকালে মহানগরীর রূপসা ঘাট এলাকার একাধিক ফার্মেসি থেকে জব্দ করা হয় নকল এ স্যালাইন। এরপরই টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। কিন্তু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্যাকেটের গায়ে কোনও কোম্পানির ঠিকানা না থাকায় এ স্যালাইন কোথা থেকে এবং কারা বাজারজাত করছে- তা মনিটরিংয়ে রেখেছে ওষুধ প্রশাসন। এছাড়াও ভারতীয় জিএসকে নামক কোম্পানির নকল ব্যাথার মলম বেটনোভেট-এন, বেটনোভেট-সি, রেকিটভেনজা কোম্পানির বেটনোভেট-মুভ, ক্যালসিয়াম সেনডোজিন, জেসটেন, ঝান্ডুবাম, রিংগার্ড এবং অবৈধ পথে ভারত থেকে আসা ইথিকন ও চায়না সার্জিক্যাল ব্লেডও খুলনার ওষুধের বাজারে বিক্রির সত্যতা পেয়েছে কর্তৃপক্ষ।
খুলনার ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক (ড্রাগ সুপার) মাহমুদ হোসেন বলেন, হুবহু এসএমসির ওরস্যালাইন-এন এর মতো দেখতে হওয়ায় ক্রেতারা না বুঝেই নকল স্যালাইন পান করছেন। আর নকল হওয়ায় এর মান নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। যা কড়া নজরদারি এবং মনিটরিং’র মাধ্যমে বাজার থেকে অপসারণ করা হচ্ছে। এছাড়া অন্য নকল ওষুধ বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।ময়মনসিংহের স্পার্ক ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড কর্তৃক উৎপাদিত স্পার্ক ক্লো-টিআর নামের ক্যাপসুলটির যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ করেনি কর্তৃপক্ষ। খুলনার বাজার থেকে সংগ্রহকৃত স্পার্ক ক্লো ক্যাপসুলের নমুনা ল্যাবে পরীক্ষার পর এটি নিম্নমানের বলে প্রমাণ মেলে। এ কারণে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মাননিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে খুলনার ড্রাগ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। ড্রাগ সুপার খুলনার দফতরের সূত্র জানান, ওষুধের মান সঠিক আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে প্রতি মাসেই বিভিন্ন বাজার থেকে সন্দেহপ্রবণ ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তারই অংশ হিসেবে ২০১৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর নগরীর হেরাজ মার্কেটের মেসার্স কুন্ডু ফার্মেসি থেকে স্পার্ক ক্লো-টিআর নামক ক্যাপসুলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে এর গুণগতমান পরীক্ষার জন্য ঢাকার মহাখালীস্থ ওষুধ প্রশাসনের নিজস্ব ল্যাবে পাঠানো হয়। পরীক্ষার পর এ ক্যাপসুলটি নিম্নমানের বলে রিপোর্ট আসে। এ সূত্র ধরে খুলনার ড্রাগ সুপার মাহমুদ হোসেন বাদী হয়ে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি ড্রাগ আদালতে (খুলনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত) মামলা দায়ের করেন।মামলায় ময়মনসিংহের ১৭৫ নম্বর চরপাড়া বাইলেন এলাকায় অবস্থিত স্পার্ক ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রকিব উদ্দিন, কারখানা ব্যবস্থাপক কাওছার তানভীর চৌধুরী, মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপক তরিকুল ইসলাম এবং উৎপাদন কর্মকর্তা মোর্শেদ আকন্দকে আসামি করা হয়। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন।
খুলনার ড্রাগ সুপার মাহমুদ হোসেন বলেন, প্রতি মাসে দু’বার করে বিভিন্ন ফার্মেসি থেকে ওষুধের স্যাম্পল সংগ্রহ করে তা ল্যাবে পাঠানো হয়। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরির অভিযোগে ২১ এপ্রিল স্পার্ক ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড-এর ওষুধ উৎপাদন লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাড. মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ এবং শিশুখাদ্য একটি জীবন কেড়ে নিতে পারে। একটি মানুষকে চিরতরে পঙ্গু করতে পারে। অবৈধভাবে লাভের উদ্দেশ্যে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও মুনাফা লোভীচক্র ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও শিশুখাদ্য বিক্রির মত জঘন্য কাজ করছে। প্রশাসন এ বিষয়ে মাঝে মধ্যে উদ্যোগ নিলেও ধারাবাহিকতা না থাকার কারণে এটি বন্ধ হচ্ছে না। আবার কখনও সামান্য জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দেওয়া হয়।তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ কাজ করে থাকে। ওই সকল অসাধু কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে টাস্ক ফোর্সের প্রচারাভিযান নিয়মিত পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি।