Print

কৃষকের ধান সরকারি গোলায় জমা দেয় কারা?

বিডিনিউজডেস্ক ডেস্ক | তারিখঃ ০৫.০৫.২০১৬

প্রতিবছরের মতো এবারও চলতি বোরো মৌসুমে ধান ও চালের ক্রয় মূল্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

তবে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান না কেনায় এখন পর্যন্ত এর সুফল পাননি কৃষকরা। এ কারণে ধানের ওপরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে অনেক কৃষকই ঝুঁকছেন নতুন ফসলের দিকে। এ সমস্যা অবগত হয়ে এবার বিষয়টির দিকে নজর দিচ্ছে সরকার। দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, চলতি বছর মৌসুমী ব্যবসায়ী ও দলীয় পরিচয়ের লোকদের কাছ থেকে নয়, সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কেনা হবে। জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম জানিয়েছেন, এ বছর বোরো মৌসুমে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কেনা হবে। তারা কার্ড দেখিয়ে ধান জমা দেবেন। আর ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের ধানের মূল্য পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ধানের সঠিক মূল্য পান এজন্য গত চার বছর ধরে ধান ঘরে তোলার আগেভাগেই অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরুর তারিখ ও সংগ্রহমূল্য ঘোষণা করছে সরকার। এ বছর সরকারিভাবে প্রতি কেজি বোরো ধানের মূল্য ২৩ টাকা এবং প্রতি কেজি চালের মূল্য ৩২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে, মৌসুমের শুরুতেই সরকার বোরো সংগ্রহ অভিযান এবং সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা করলেও এখনও আশঙ্কায় রয়েছেন, শস্যভাণ্ডার খ্যাত উত্তরের জেলা দিনাজপুরের কৃষকরা। কয়েকজন কৃষক এ ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, সরকার প্রতিবছরই ভালো ভালো সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু সরকারি দলের মৌসুমী মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের কারণে কোনও সিদ্ধান্তই কৃষকদের পক্ষে আসে না। তারাই জোর করে আমাদের কাছ থেকে কম দামে ধান নেয়, আর সরকারের গুদামে পৌঁছে দিয়ে সব সুবিধা নিয়ে নেয়।কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি ক্রয় মূল্য অনুযায়ী সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার ঘোষণা দিলেও গত চার বছরে এ ঘোষণার কোনও প্রতিফলন দেখা যায়নি। এর ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে কৃষকের কাছ থেকে জোর করে ধান নিয়ে সেটি সরকারের গুদামে পৌঁছে দিয়েই মাঝখান থেকে লাভবান হচ্ছেন কিছু মধ্যস্বত্বভোগী। প্রতি বছরের মতো এবারও এ কারণেই কৃষকদের আশঙ্কা নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রি করতে না পারা নিয়ে।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র মতে, অব্যাহতভাবে লোকসান গোনায় চলতি বছর দিনাজপুর জেলায় ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৭৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় ২ হাজার হেক্টর কম। গত বছর ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল।কৃষকরা জানান, এক বিঘা জমি (৪৮ শতক) বর্গা নিতে ১২ হাজার টাকা, পানি সেচ বাবদ ৩ হাজার টাকা এবং কাটা-মাড়াই বাবদ আরও ৪ হাজার টাকা খরচ হয়। তাছাড়া রয়েছে কীটনাশকসহ অন্যান্য খরচ। এতে করে এক বিঘা জমিতে তাদের খরচ হয় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে ২৮ থেকে ৩৫ মণ ধান হয়। সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করেছে তাতে মণ প্রতি দাম হয় ৯২০ টাকা। এই মূল্যে এক বিঘা জমিতে তারা প্রায় ২৬ হাজার টাকার ধান বিক্রয় করতে পারবেন। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন বাজারে ধানের মূল্য ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা মণ। এই দর অব্যাহত থাকলে এক বিঘা জমির ধানের মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ২০ হাজার টাকা। যা উৎপাদনের খরচের চেয়েও কম।
দিনাজপুর সদর উপজেলার শিবপুর এলাকার কৃষক জবেদুর রহমান জানান, এবারে বোরো ধানের ফলন ভাল হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম তারা পান না। এমনিতেই উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়ছে। সরকারের আগাম ধানের মূল্য নির্ধারণে প্রথম প্রথম খুশি হলেও এখন আর হন না। কারণ ওই মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারেন না তারা।দক্ষিণনগর এলাকার কৃষক বেনু রাম সরকার জানান, বাজারে ধানের যে মূল্য পান তাতে তাদের খরচ ওঠে না। কৃষকরা কষ্ট করে ধান উৎপাদন করলেও লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা। ৯০০ কিংবা এক হাজার টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে পারলে তাদের পোষাতো।কৃষক সেলিম রেজা জানান, সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে তা কৃষকদের হাত পর্যন্ত পৌঁছে না। সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান না কেনায় এটি হয়। তাই অব্যাহতভাবে লোকসান দেওয়ায় ধানের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে অন্য ফসল আবাদে ঝুঁকছেন তারা। তবে আশার কথা জানিয়েছেন, সরকারের ক্রয় অভিযানে মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম। তিনি জানান, কৃষকদের কাছ থেকে যাতে সরাসরি ধান কেনা হয় এজন্য ব্যাংকিং সিস্টেমে পেমেন্ট করা হবে এবং কৃষি অধিদফতরের কাছ থেকে তালিকা নিয়ে কৃষকদের কার্ডের মাধ্যমে ধান কেনা হবে। কার্ড ও ব্যাংকিং সিস্টেম চালু হওয়ায় এবারে মধ্যস্বত্বভোগীরা নন, লাভবান হবেন প্রকৃত কৃষকরা। মধ্যস্বত্বভোগীরা যাতে করে ফায়দা লুটতে না পারে সেজন্য সব সময় নজর রাখা হয়েছে, এবারও নজর রাখা হবে।