Print


বিডিনিউজডেস্ক.কম 

তারিখঃ ২৭.০৬.২০১৫

ছোট ছোট লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে নিয়মিত বিরতিতে, সম্ভব হলে প্রতি মাসে একটি করে খুনের ঘটনা ঘটাতে চায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। তাদের বিবেচনায় যেসব ব্যক্তি ইসলামবিরোধী, তাদের ওপর হামলা চালাতে সংগঠনটির মতাদর্শে উদ্বুদ্ধদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


সাম্প্রতিক কালে গ্রেপ্তার হওয়া আনসারুল্লাহর সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন জঙ্গি দমন কার্যক্রম তদারকিতে যুক্ত একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাঁরা বলেন, আনসারুল্লাহ এই পর্বে একক ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাদের তারা ইসলামবিরোধী মনে করছে। তারা প্রতি মাসে এ রকম একজনকে খুন করে কর্মীদের সক্রিয় রাখতে চায়।
এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ব্লগার ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যা, মার্চে ওয়াশিকুর রহমান ও মে মাসে সিলেটে অনন্ত বিজয় দাশকে হত্যার সঙ্গে জড়িত বলে এই উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকেই সন্দেহ করছেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা। মাঝে এপ্রিল মাস বাদ গেছে। ওই কর্মকর্তাদের ধারণা, এপ্রিলে আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে নয়জনকে গুলি করে হত্যার পর অভিযানের মুখে আনসারুল্লাহর জঙ্গিরা চাপে ছিল, অনেকে গ্রেপ্তার হয়। ফলে ওই মাসে কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ করতে পারেনি তারা।
অবশ্য আনসারুল্লাহ লেখালেখির কারণে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে প্রথম হত্যার ঘটনা ঘটায় ২০১৩ সালে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার মিরপুরে ব্লগার রাজীব হায়দারকে খুন করে। এরপর গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সাভারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আশরাফুল আলম ও দেড় মাস পর ১৫ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফিউল ইসলাম একই কায়দায় খুন হন। এই দুটি হত্যার ঘটনায়ও আনসারুল্লাহ প্রধান সন্দেহভাজন।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া আনসারুল্লাহর সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে যুক্ত ছিলেন—গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, যতসংখ্যক এ ধরনের হত্যা করা যায়, সেদিকে এই গোষ্ঠীটির বেশি মনোযোগ। তারা এ ধরনের খুন করানোর জন্য নিজেদের সদস্যদের পাশাপাশি উগ্র মতাদর্শের অন্যদের উদ্বুদ্ধ করার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। ব্লগার ওয়াশিকুরকে এমন লোকদের দিয়েই হত্যা করানো হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন। ফলে হাতেনাতে দুজন ধরা পড়লেও মূল পরিকল্পনাকারীকে শনাক্ত করতে পারছেন না তাঁরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আনসারুল্লাহ এখন আর একক কোনো সাংগঠনিক কাঠামোতে নেই। এটা এ প্রজন্মের উগ্রপন্থীদের একটা ‘প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে কাজ করছে। তারা শুরু থেকেই আল-কায়েদার নীতি-কৌশলকে অনুসরণ করে আসছে। শুরুতে আল-কায়েদা আরব উপদ্বীপের প্রয়াত নেতা ইয়েমেনের আনোয়ার আওলাকিকে আধ্যাত্মিক নেতা মানত। আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট বা একিউআইএস ঘোষণার পর এর অধিভুক্ত হয় আনসারুল্লাহ। তারা এখন আধ্যাত্মিক নেতা মানছে আল-কায়েদার নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরিকে।
আনসারুল্লাহর ওপর নজরদারি এবং এর সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে যুক্ত—এমন একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ২০১৩ সালে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীসহ সংগঠনটির বেশ কিছু সদস্য গ্রেপ্তার হয়। এরপর ২০১৪ সালে তারা চুপচাপ থেকে মূলত প্রস্তুতি নিয়েছে। গত ডিসেম্বর থেকে নতুন করে সক্রিয় হতে থাকে। তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে সংগঠিত হয়। প্রতিটি দলের আলাদা আলাদা নাম থাকলেও সব সদস্যকে সেটা জানানো হয় না। একজন সদস্য একটা বিশ্বাসযোগ্য পর্যায়ে যাওয়ার পরই সংগঠনের নাম জানতে পারে। এ কারণে সাম্প্রতিককালে যতগুলো দল ধরা পড়েছে, একপর্যায়ের পর তাদের বিষয়ে আর কিছু জানা যাচ্ছে না। এক দল ব্যাংক ডাকাতি করে তহবিল গড়ার পরিকল্পনা করছে, কিন্তু অন্য দলগুলো জানছে না। ফলে আগাম গোয়েন্দা তথ্যও মিলছে না।
দেশে তৎপর জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আনসারুল্লাহকে এখন সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করছে জঙ্গি তৎপরতা দমনে নিয়োজিত সংস্থাগুলো। এ কারণ জানতে চাইলে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই গোষ্ঠীর সদস্যরা আধুনিক শিক্ষিত, চৌকস, বিত্তবানদের সন্তান। এদের পেছনে প্রশিক্ষিত জনবল আছে। এই গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ ২৫ জনের একটা তালিকা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ১৮ জনই ক্যাডেট কলেজ থেকে পাস করা। এমন কয়েকজন সম্প্রতি গ্রেপ্তারও হয়েছে।
২০০৭ সালে জন্ম নেওয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিম আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার মধ্য দিয়ে। চলতি বছরের ২৫ মে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার।
আনসারুল্লাহকে এ দেশে চতুর্থ প্রজন্মের জঙ্গি সংগঠন বলে মনে করা হয়। প্রথম প্রজন্মের জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশের (হুজি-বি) জন্ম বিগত শতাব্দীর আশির দশকের শেষ দিকে। আফগানিস্তানে সোভিয়েটবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেওয়া এদেশীয় মুজাহিদরা এটি প্রতিষ্ঠা করে। এর এক দশক পর জন্ম হয় দ্বিতীয় প্রজন্মের জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি)। একুশ শতকে এসে এ দেশে কার্যক্রম শুরু করে আন্তর্জাতিক সংগঠন হিযবুত তাহ্রীর। এটিকে এ দেশে তৃতীয় প্রজন্মের সংগঠন বলে মনে করা হয়। হিযবুত তাহ্রীরকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালের ১০ অক্টোবর নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপরও সংগঠনটির তৎপরতা বন্ধ হয়নি। প্রায় প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীর কোনো না কোনো মসজিদের সামনে তারা ছোটখাটো সমাবেশ করে এবং তার সচিত্র সংবাদ বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠায়।