Nabodhara Real Estate Ltd.

Khan Air Travels

Bangadesh Manobadhikar Foundation

বিডিনিউজডেস্ক.কম| তারিখঃ ২৫.০৫.২০১৯

রাজধানীসহ দেশের বড় কয়েকটি শহরে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের জনপ্রিয়তা এখন বাড়তির দিকে।

সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সেলফোন অ্যাপভিত্তিক সেবাটির দিকে ঝুঁকছেন যাত্রীরা। আবার চালকদের মধ্যে অনেকেই এখন পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন রাইড শেয়ারিংকেই। কিন্তু এ বাড়তি জনপ্রিয়তার মধ্যে সড়কে নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে এর মাত্রাতিরিক্ত বাণিজ্যিক ব্যবহার। রাইড শেয়ারিং কোম্পানির বোনাস ট্রিপের অফার ধরতে গিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছেন চালকরা। বাড়ছে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

একই বা কাছাকাছি গন্তব্যের কাউকে নিজের গাড়িতে নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে পৌঁছে দেয়ার বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় মাধ্যম রাইড শেয়ার। দেশে বর্তমানে প্রতিটি ট্রিপের জন্য চালকদের কাছ থেকে ১০-২৫ শতাংশ হারে কমিশন নেয় রাইড শেয়ার কোম্পানি। একই সঙ্গে চালকদের জন্য প্রতি সপ্তাহের টার্গেট ট্রিপ বেঁধে দেয়া হয়, যা পূরণ করতে পারলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে চালককে বোনাস হিসেবে দেয়া হয় নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ। অন্যদিকে চালকদেরও লক্ষ্য থাকে টার্গেট ট্রিপের সংখ্যা পূরণের মাধ্যমে বোনাস আদায় করা। টার্গেট ট্রিপ পূরণ করতে গিয়ে প্রতিদিন নয় থেকে ১৪টি ট্রিপ দেয়ার চেষ্টায় থাকেন তারা। আর এতেই ঘটে বিপত্তি। বিশেষ করে রাজধানীতে তীব্র যানজটের কারণে একদিনে এতগুলো ট্রিপের লক্ষ্য পূরণ করা বেশ কঠিন। স্বল্প সময়ে বেশিসংখ্যক ট্রিপ ধরার তাগিদে সড়কে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন চালকরা। মেতে ওঠেন গতির নেশায়। ভাঙেন ট্রাফিক আইন ও সড়কের শৃঙ্খলা। ফলে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসেও এখন মাত্রা বাড়ছে দুর্ঘটনার।

শুধু রাজধানীতেই এ ধরনের দুর্ঘটনার ভূরি ভূরি উদাহরণ পাওয়া যায়। গত ২৫ এপ্রিল রাজধানীর কলেজ গেটে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা হক লাবণ্য। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও লাবণ্য উবারের বাইকে চড়ে ক্যাম্পাসে যাচ্ছিলেন। কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার অভিযোগ তোলেন, মোটরসাইকেল চালক সুমনের বেপরোয়া গতির কারণে ওই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে।

এ দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ১৮ মে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে উবারের দুটি প্রাইভেট কারের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান ফুল বিবি নামের এক উবার যাত্রী। ওই দুর্ঘটনায় আহত হন আরো পাঁচজন। বড় দুর্ঘটনার পাশাপাশি নিয়মিতই রাইড শেয়ারিংয়ের কার ও মোটরবাইক দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে।

সহজ, উবার, পাঠাও, ও ভাইসহ দেশে রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা সবক’টি কোম্পানিই এখন মুনাফা বাড়াতে চালকদের জন্য বোনাস টার্গেট বেঁধে দেয়ার নীতি অনুসরণ করছে। এ বোনাস আদায়ের জন্য চালকদের বেপরোয়া চলনে সড়কে বাড়ছে ছোট-বড় দুর্ঘটনার সংখ্যা। বাড়ছে প্রাণ ও অঙ্গহানিসহ নানা ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি। রাজধানীর সড়ক পরিবহন খাতকে আরো বিশৃঙ্খল করে তুলেছে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস। 

রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা বাইকারদের মধ্যে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রবণতা এখন সবচেয়ে বেশি। এমনকি প্রায়ই ফুটপাতেও মোটরসাইকেল তুলে দিতে দেখা যায় তাদের। রাস্তা একটু ফাঁকা পেলেই গতি তুলে দিচ্ছেন স্বাভাবিক মাত্রার উপরে। এতে করে নিজেরা যেমন দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন, একই সঙ্গে ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছেন আরোহী সেবাগ্রহীতাসহ অন্যদেরও। কিছুটা একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায় রাইড শেয়ারে চলা প্রাইভেট কার বা সিএনজি অটোরিকশার ক্ষেত্রেও।

বোনাস ট্রিপ রাইড শেয়ারের যাত্রী ও চালক উভয়কেই বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করেন পরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। এ বিষয়ে তিনি  বলেন, বোনাস ট্রিপ ধরতে গিয়ে চালকরা ঝুঁকির মুখে পড়ে যান। একই ঝুঁকি থাকে আরোহীরও। পাশাপাশি এখানে কর্মঘণ্টাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঢাকার যানজটের যা অবস্থা, তাতে বোনাস ট্রিপ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে একজন চালক অবশ্যই ৮ ঘণ্টার বেশি রাস্তায় থাকতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে ১২-১৫ ঘণ্টার বেশি সময় দিতে হবে চালককে। সড়ক দুর্ঘটনার একটা বড় কারণ কিন্তু চালকের ক্লান্তি। রাইড শেয়ারের বোনাস ট্রিপ ধরতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া চালক যদি দুর্ঘটনা ঘটান, তাহলে তার দায়ভার কোনোভাবেই কোম্পানি এড়িয়ে যেতে পারে না। এজন্য কোম্পানিগুলোকে আরো সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিআরটিএকেও বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হবে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে রাইড শেয়ার নীতিমালা বিআরটিএ করেছে, সেটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে এ ধরনের সমস্যা এখন থেকেই রোধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে তাদের।

রাইড শেয়ার কোম্পানি হিসেবে দেশে উবার বেশ জনপ্রিয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব বলছে, উবারে নিবন্ধিত যানবাহনের (প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল) সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি। উবার নিবন্ধিত চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ কোম্পানির নিবন্ধিত প্রাইভেট কারগুলোর সপ্তাহের হিসাব শুরু হয় প্রতি সোমবার ভোর ৪টায়। শেষ হয় বৃহস্পতিবার রাত ৩টা ৫৯ মিনিটে। সপ্তাহের শুরুতেই এ চারদিনের জন্য চালকদের একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য বেঁধে দেয় উবার। চার দিনে ৩৪টি ট্রিপ দিলে ১ হাজার ১০০ টাকা বোনাস দেয় কোম্পানিটি। একইভাবে ৪১ ট্রিপে ১ হাজার ৯০০ টাকা, ৪৯ ট্রিপে ২ হাজার ৯০০ টাকা ও ৫৫ ট্রিপে ৪ হাজার ৩০০ টাকা বোনাস দেয়া হয়। অন্য রাইডশেয়ার কোম্পানিগুলোও কম-বেশি একই হারে বোনাস অফার দিয়ে থাকে। আবার সপ্তাহের বাকি তিনদিনের জন্যও রয়েছে প্রায় একই ধরনের ট্রিপ টার্গেট।

বাইকের (মোটরসাইকেল) ক্ষেত্রে বোনাস দেয়া হয় সপ্তাহের সাতদিন হিসাব করে। উবার, পাঠাও, ও ভাই, সহজসহ বেশ কয়েকটি রাইড শেয়ার কোম্পানির বাইক চালকরা জানান, সাধারণত সাতদিনে কোনো বাইকার ৪০টি ট্রিপ দিতে পারলে তাকে ৬০০ টাকা বোনাস দেয়া হয়। একই ভাবে ৬০ ট্রিপে ১ হাজার ৪০০ টাকা, ৮০ ট্রিপে ২ হাজার ৮০০ টাকা ও সাত দিনে ১০০টি ট্রিপ দিতে সক্ষম হলে বাইক চালক বোনাস পাচ্ছেন ৪ হাজার টাকা।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) লোকমান হোসেন মোল্লা বলেন, রাইড শেয়ারিং নীতিমালা করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নীতিমালা কার্যকর হলে কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে চলে আসবে। যাত্রী বা চালককে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে—এমন কোনো কিছুই যেন কোম্পানিগুলো করতে না পারে, সেজন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।