মুদ্রণ

জাতীয় ডেস্ক | তারিখঃ ০৫.০৪.২০২১

দেশের করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত 'লকডাউন' আরোপ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।

আজ সোমবার (০৫ এপ্রিল) সকাল ৬টা থেকে এ 'লকডাউন' শুরু হয়েছে। আগামী ১১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। গতকাল রবিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘করোনাভাইরাসজনিত রোগ কভিড-১৯-এর বিস্তার রোধকল্পে শর্তসাপেক্ষে সার্বিক কার্যাবলি/চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ’ করা হয়েছে।

১১ দফা নিষেধাজ্ঞায় সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, ব্যাংক জরুরি প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বইমেলা, সিনেমা হল চালানোর সুযোগ থাকছে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খোলা থাকবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকান ও কাঁচাবাজার। তবে গণপরিবহন, শপিং মল, দোকানপাট বন্ধ থাকবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়নি।

অনেক কিছু খোলা রেখে গণপরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে এ বিষয়ে কোনো সদুত্তরও মিলছে না।

মন্ত্রিপরিষদের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এখন কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসে, সেটা দেখে সরকার নিশ্চয় সেগুলো বিবেচনা করবে।

সংক্রমণের তীব্র পরিস্থিতি দেখে গত ২৯ মার্চ সরকার ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করে। এসব নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় গতকাল ১১ দফা নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

এর আগে গত শনিবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ‘লকডাউন’ আসছে বলে জানান। একই দিন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনও একই ধরনের আভাস দেন। এর পরপরই মানুষ বাজার, বাস, লঞ্চ ও রেলস্টেশনের দিকে ছুটতে শুরু করে। গতকালও এই ঢল অব্যাহত ছিল। এতে ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হয় মানুষ।

১৮ দফা নির্দেশনায় সব কিছু খোলা রেখে গণপরিবহনে ৫০ শতাংশ যাত্রী পরিবহন এবং ভাড়া বাড়ানোর পর থেকে মানুষের ভোগান্তি শুরু হয়। বিশেষ করে দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হন বেসরকারি কর্মজীবীরা। একদিকে তাঁদেরকে বাড়তি ভাড়া গুনে পরিবহনে চড়তে হয়েছে। অন্যদিকে পরিবহন পেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এবার অফিস খোলা রেখে গণপরিবহন পুরোপুরি বন্ধ করার ঘোষণায় তাঁরা আরো বিপাকে পড়বেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সংবাদ ব্রিফিংয়ে এক সপ্তাহের জন্য গণপরিবহন বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। এরপর সাড়ে ১২টার দিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব সাফায়েত মাহবুব চৌধুরী স্বাক্ষরিত ১১টি নির্দেশনাসংবলিত প্রজ্ঞাপন জারি হয়।

যা করা যাবে, যা করা যাবে না : সব ধরনের গণপরিবহন যেমন—সড়ক, নৌ, রেল ও অভ্যন্তরীণ আকাশ পরিবহন বন্ধ থাকবে। তবে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যবস্থা, জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্তদের জন্য এই আদেশ প্রযোজ্য হবে না। নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবেন বিদেশ থেকে আসা ও বিদেশে যেতে চাওয়া ব্যক্তিরা। আইন-শৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিষেবা, যেমন—ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, স্থলবন্দর, নদীবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এই নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে। সব সরকারি/আধাসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত অফিস ও আদালত এবং বেসরকারি অফিস কেবল জরুরি কাজ করার জন্য সীমিত পরিসরে প্রয়োজনীয় জনবল কাজে লাগাতে পারবে। এ ক্ষেত্রে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় অফিসে আনা-নেওয়া করতে পারবে। শিল্প-কারখানা ও নির্মাণ কার্যাদি চালু থাকবে। শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেওয়া করতে হবে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ শিল্প-কারখানা এলাকায় সুবিধাজনক স্থানে তাদের শ্রমিকদের জন্য ফিল্ড হাসপাতাল/চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত অতি জরুরি প্রয়োজন যেমন, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা, চিকিৎসাসেবা, মৃতদেহ দাফন বা সৎকারের মতো কাজ ছাড়া কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় শুধু খাদ্য বিক্রি বা হোম ডেলিভারি সরবরাহ করা যাবে। কোনো অবস্থায়ই হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে কোনো গ্রাহক খাবার খেতে পারবেন না। শপিং মলসহ অন্যান্য দোকান বন্ধ থাকবে। তবে দোকানগুলো পাইকারি ও খুচরা পণ্য অনলাইনের মাধ্যমে কেনাবেচা করতে পারবে। এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের চলাফেরার সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। কাঁচাবাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা জায়গায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনা-বেচা করা যাবে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা সীমিত পরিসরে চালু রাখার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে। গতকালই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞাকালে ব্যাংকিং লেনদেন করা যাবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত। সারা দেশে জেলা ও মাঠ প্রশাসন এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত টহল জোরদার করবে। এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ঢাকায় সুবিধাজনক স্থানে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে মন্ত্রিপরিষদের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আদেশ যারা মানবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে প্রজ্ঞাপণের সর্বশেষ ধাপে। মন্ত্রিপরিষদের প্রজ্ঞাপনের আলোকে অন্য মন্ত্রণালয়গুলোকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এরপর গতকাল বিকেলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় বইমেলা খোলা রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। ব্যাংকগুলো সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা এবং পুঁজিবাজার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২ পর্যন্ত খোলা রাখার নির্দেশনাও এসেছে। একই দিন কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষিপণ্য, কৃষি উপকরণ, কৃষিশ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট যান চলাচলে যাতে সমস্যা না হয় সে বিষয়ে অফিস আদেশ জারি করেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে জানতে চাইলে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান গতকাল রাতে বলেন, ‘আগামীকালের (আজ মঙ্গলবার) মধ্যে আমরা একটি আদেশ জারি করব।’ তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মসজিদ-মন্দির বন্ধ করা হবে না।

সিনেমা হল বন্ধের বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় সিনেমা হল খোলা রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে হল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি।

ভোগান্তিতে পড়বেন বেসরকারি কর্মজীবীরা : বেসরকারি একটি আইটি ফার্মের কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন রাসেল বলেন, ‘সরকারি অফিসে পিয়ন থেকে বড় কর্তা সবার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা আছে। বেসরকারি অফিসে লকডাউনে চাকরি থাকাই অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। সেখানে পরিবহন দিয়ে অফিস করাবে কোথা থেকে। তাই বাড়তি ভাড়া দিয়ে রিকশায় চড়া ছাড়া উপায় থাকবে না। না হয় হাঁটতে হবে।’

শুধু বেসরকারি কর্মজীবীরাই নন, কঠোর নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছেন বিভিন্ন শপিং মলের দোকান মালিক ও কর্মচারীরাও। তাঁরা বলছেন, প্রথম দফায় কোনোভাবে ‘লকডাউনের’ সময় পার হয়েছে। এবার দোকানপাট বন্ধ হলে মরা ছাড়া উপায় নেই। গতকাল মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে সড়ক অবরোধ করা দোকান মালিক মিজানুর রহমান বলেন, ‘যদি মরতেই হয় দোকান খোলা রেখেই মরতে চাই। সরকার অফিস-আদালত খোলা রাখছে, বইমেলা খোলা রাখছে, তাহলে শপিং মল খোলা থাকবে না কেন, আমরা কী খেয়ে বাঁচব।’

গতবার সাধারণ ছুটির সময় চলাচল নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকা জরুরি সেবার তালিকায় গণমাধ্যম থাকলেও এবার সেটি রাখা হয়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ বলেন, ‘গতবারও প্রথম দফায় প্রজ্ঞাপন জারির সময় জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠানের তালিকায় গণমাধ্যমের নাম উল্লেখ ছিল না। রাস্তায় অনেক সাংবাদিক ও সংবাদ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। সরকারকে বলার পর দ্বিতীয়বার গণমাধ্যমের নাম যোগ করা হয়েছিল। এবারও সরকার একই কাজ কেন করল বুঝতে পারছি না।’ সরকার এই বিষয়টিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দেশে প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় গত বছরের ৮ মার্চ। এরপর ২৬ মার্চ থেকে ১০ দিনের সাধারণ ছুটি দেওয়া হয়েছিল। সেই ছুটি কয়েক দফা বাড়িয়ে ৬৬ দিন হয়েছিল। এরপর করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কমতে থাকায় সব কিছু খুলতে খুলতে গত ফেব্রুয়ারি নাগাদ প্রায় স্বাভাবিক পরিস্থিতিই চলছিল। এ বছর মার্চের শুরুতে আবার সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল।