মুদ্রণ

প্রেম রসিক হবো কেমনে

বিডিনিউজডেস্ক.কম| তারিখঃ ৩১.০৩.২০১৮

দর্শন, রাষ্ট্রবিদ্যা, অধিবিদ্যাসহ আরও অনেক বিষয়ে প্লাতন লিখেছেন।

কোনো দার্শনিকের এত বিষয় নিয়ে কাজ করার নজির নাই। এবং অন্য কোনো দার্শনিকের লেখাপত্র নিয়ে এত গবেষণা বা পঠনপাঠন হয়েছে কিনা জানি না। প্লাতন কি শুধুই দার্শনিক? তার গদ্যের আঙ্গিকও অবিষ্মরণীয়। তার অনেক লেখাই সংলাপ আকারে লেখা। দর্শন হিসাবে না পড়ে ফিকশন হিসাবে পড়লেও প্রভূত আনন্দ লাভ করা সম্ভব। ‘সিম্পোজিয়াম’নামের ছোট বইটি প্রেম নিয়ে। প্রেমকে বহুদিক থেকে আবিষ্কারের যে অনুসন্ধান এই বইতে করা হয়েছে তা সত্যিকার অর্থেই একজন পাঠকের অন্দরমহল আলোকিত করে দেয় এবং তার মনে অনেক প্রশ্নের অবতারণা করে। সিম্পোজিয়ামের আঙ্গিকটা প্লাতনের অন্যান্য সংলাপের মতই। এখানে অংশ নিয়েছে বেশ কয়েকটি চরিত্র। আপোলোডোরাস, ফেড্রাস, পসেনিয়াস, এরিফিন মেকস, এরিক্সিমেকাস, আগাথন, সক্রাতেস, এলসিবিয়াডিস প্রমুখ। এই সংলাপকারিরা সবাই আগাথনের ঘরে দাওয়াত খেতে যায়। ভোজন ও পানাহারের সাথে সাথে শুরু হয় কথোপকথন। সংলাপগুলো যেন একঘেয়ে হয়ে না যায় বা শুধুই দর্শনের কচকচানিতে পরিণত না হয় সে জন্য প্লাতন বেশ কিছু কৌশল ব্যবহার করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ তর্কের মাঝে মাঝে হাস্যরসের সমাবেশ। চটুল চুটকি। মাঝে মাঝে কারো প্রস্থান বা আগমণ ইত্যাদি দিয়ে বইটিকে ফিকশনাইজড করা হয়েছে।

প্রেম আসলে সবারই আগ্রহের বিষয়। প্রেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হলেও সবসময় সেটা বিভিন্ন সেন্সরের কারণে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে না সচরাচর। হতে পারে সেটা ধর্মীয় বা সামাজিক। কোনো পরিবারই সম্ভবত প্রেম নিয়ে আলাপ-সালাপকে ভালো চোখে দেখে না। কিন্তু তখন থেকেই প্রাচীন গ্রিসে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনার চল ছিল। শুধু প্রেম নয় গে বা লেসবিয়ানিজম ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা হয়েছে এই সিম্পোজিয়ামে। প্রেমকে সিম্পোজিয়ামে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসাবে ভূষিত করা হয়েছে। তর্কের শুরুতে ফেড্রাস প্রেমের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, প্রেমিকের পক্ষে মনমতো প্রেমিকা বা প্রেমিকার পক্ষে মনমতো প্রেমিক পাওয়ার মতো সৌভাগ্যবান আর কে আছে? যারা উন্নত জীবনযাপন চায় প্রেম তাদের জীবনের নিয়ামক হতে পারে। বংশমর্যাদা, পদমর্যাদা, ধনসম্পদ বা অন্য কিছুই মহৎ জীবনের ধ্রুব আদর্শের স্থলাভিষিক্ত হবার যোগ্য নয়। ...প্রেম এমন এক শক্তি কেবল প্রেমিকরাই অপরের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিতে পারে, একথা নারীপুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই খাটে। দ্বিতীয় বক্তা পসেনিয়াস প্রেমকে দুই আফ্রোদিতির উদাহারণ দিয়ে দুইভাগে বিভক্ত করেন। একটা গতি নিম্নগামী অন্যটা উর্ধ্বগামী। তিনি বলেন, যে প্রেম অতি সাধারণ প্রকৃতির তার নিমিত্ত দেহ। এর প্রভাব অস্থির আর অনিশ্চিত। নিকৃষ্ট শ্রেণির লোকমানসেই এই প্রেমের উদ্ভব হয়। এ অনুরাগ যেমন নারীর প্রতি তেমনি কিশোরদের প্রতি। এ প্রেম আধ্যাত্মিক নয়, দৈহিক। কেবল ইন্দ্রিয়জ ক্ষুধা মেটানোর দিকে এর পক্ষপাতিত্ব। অন্যদিকে মহৎ প্রেম এসবের উর্ধ্বে। সেই প্রেম শুধু নারীর প্রতি নয় বয়স্ক বুদ্ধিমান জ্ঞানী পুরুষের জ্ঞানের প্রতি যেমন বালকের টান। এটা তাদের নিয়ে যায় মহৎ কোনো কার্যসাধনের দিকে।

এরপর এরেক্সিমেকাস বলেন, আমাদের শারীরিক গঠন প্রকৃতি অনুসারে প্রেমের তারতম্য ঘটে। সুস্থ দেহ আর রুগ্ন দেহ অবশ্যই পরস্পর বিভিন্ন বা অসদৃশ। সুতরাং সুস্থদেহে যে প্রেম বিরাজ করে, তা অসুস্থ দেহ থেকে পৃথক।

এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো যে এই ক্যারেক্টারগুলো সক্রাতেস পর্যন্ত- এনাদের কথা আমরা জানতে পেরেছি প্লাতনের লেখায়। আর প্লাতনের লেখার স্টাইলই এইরকম সংলাপ কেন্দ্রিক। সক্রাতেস বলে কেউ যে ছিল সেটা প্লাতন না হলে আমরা জানতে পারতাম না। ফলে এইসব ক্যারেক্টার প্লাতনের রচনা জুড়ে যারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্ক বিতর্ক করে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদেরকে আমরা আসলে প্লাতনীয় বলেই তকমা দিতে পারি। যদিও অনেকগুলো সংলাপ অংশ থেকে চমৎকার নিপুণভাবেই প্লাতন নিজেকে মানে নিজের ক্যারেক্টারকে লুকিয়ে রাখেন।

ফলে সিম্পোজিয়ামের একেকজনকে দিয়ে যে ধারাবাহিক বক্তৃতা করানো হচ্ছে এগুলো আসলে প্রেমকে নানা দিক থেকে প্লাতন নিজেই ঝালাই করে নিচ্ছেন।

আগাথনের বক্তৃতায় তিনি বলেন, আত্মসংযম ও সাহসে শক্তিতে প্রেমই সেরা। কারণ সেটা সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রেমের রয়েছে অপূর্ব আত্মসংযম। আবার প্রেমের চেয়ে প্রবল কোনো ভোগ বিলাস নেই। আর সাহসের কথা যদি বলি তবে যুদ্ধের দেবতা আরেসের থেকেও প্রেম অধিক শক্তিশালী। কিংবদন্তিতেই উদাহরণ রয়েছে আফ্রোদিতির প্রেমের জয়। প্রেমদেবতা কবি হিসাবে এত সুচতুর যে অন্যকেও সে কবি বানিয়ে দিতে পারে। প্রেম যাকে স্পর্শ করে তার ভিতর প্রথমে কবিতার লেশমাত্র না থাকলেও অবশেষে সেও কবি হয়ে ওঠে। প্রেম যাবতীয় শিল্প সৃষ্টিতেই সিদ্ধহস্ত। প্রেমদেবের কাছে যাদের শিক্ষা হয়েছে। তারাই বিখ্যাত ও উল্লেখযোগ্য হয়েছে, আর যারা প্রেমের স্পর্শ লাভ করেনি তারা অখ্যাতই রয়ে গেছে।

আগাথন পেশায় কবি। তাই এখানে হয়ত তার মুখের সংলাপগুলোতে প্রেমের বিষয়ে যে প্রশস্তি গাওয়া হয়েছে সেটা নিয়ে শ্রোতারাও এক বাক্যে বলে উঠে বাহ বাহ। তবে সবচেয়ে তীর্যক প্রশ্নগুলো আসে সক্রাতেসের কাছ থেকেই। প্লাতনের অন্যান্য সংলাপগুলোতেও তাই। কারণ সক্রাতেস প্রেম বলতে শুধু প্রেমিক প্রেমিকার প্রেমকে বোঝেন না। তিনি প্রশ্ন তোলেন খোদ প্রেমের শরীর সম্পর্কেই। মানে তিনি প্রেমের নিজেরই এনাটমি করেন। আগাথনের কথার ভেতরই সক্রাতেস বলেন, প্রেম বলতে কি কোনো বস্তু বা ব্যক্তির প্রতি প্রেম বোঝায়, না এসব ব্যতিরেকেও এর নিজস্ব একটা অস্তিত্ব আছে? ...আচ্ছা, বলো ভালোবাসা বলতে কোনো কিছুর ভালোবাসা বোঝায় না বস্তুনিরপেক্ষ ভালোবাসাই বোঝায়? যাকে দয়িতা চায় সে তার সত্তার মধ্যে আছে বলেই কি তাকে সে চায়Ñ না সে নাই বলেই সে তাকে চায়?

সক্রাতেস বলেন, একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবে, সকলেই যা আছে তা চায় না, বরং যে বস্তুও অভাব আছে তা-ই চায়। আমার কাছে তো এটা স্পষ্ট। যে বড় সে কি বড় হতে চাইবে? বা যে বলবান সে কি বলবান হতে চাইবে? এর কারণ হচ্ছে যে ইতিমধ্যেই বর্তমান সে আর বর্তমান হওয়ার বাসনা করতে পারে না। ...যদি কেউ বলে আমার স্বাস্থ্য আছে, ধন আছে এবং আমি ঐসব চাই, তা হলে হয়তো আমরা তাকে বলব বন্ধু তুমি তো স্বাস্থ্যবান ও বলবান আছই, আসলে তুমি চাও এগুলো ভবিষ্যতেও যেন থাকে। সুতরাং মনে রেখো যখন কেউ বলে আমার যা আছে তাই আমি চাই তা হলে এর অর্থ হচ্ছে বর্তমানে আমার যা আছে ভবিষ্যতেও তা থাকুক, এই আমি চাই। ...তাহলে বলতে হবে প্রেমের যে বস্তুও অভাব আছে এবং তা তার আয়ত্তের বাইওে, তাই সে ভালোবাসে।

তবে অনেক যুক্তিতর্কের পথ ধরে সক্রাতেস এসে পৌঁছান এমন এক সিদ্ধান্তে যা হয়ত প্রেমের নিহিত সত্য। প্রেম হচ্ছে নতুন কিছু সৃষ্টির কামনা। কিন্তু সৃষ্টির কামনা কেন? কেননা মানুষ মরণশীল। মরণশীল হয়েও কেবল সৃষ্টি ও প্রজননের দ্বারাই অমরত্বেও কাছাকাছি অবস্থায় আসতে পারে।...তবে এটা আবার দুইভাবে হয়। যাদের সৃষ্টিপ্রেরণা জৈবিক, তারা স্ত্রীলোকের কাছে গমন করে, সন্তান উৎপাদনে লিপ্ত হয়, যে তাদের সন্তান সন্তুতির ভেতর দিয়েই তারা অমরতা লাভ করবে। কিন্তু অপর এক শ্রেণির লোক আছে যাদেও সৃষ্টিপ্রেরণা মেটাফিজিকাল। তারা জৈবিক সৃষ্টির বদলে আত্মিক সৃষ্টি করে। আত্মার প্রকৃতিই হচ্ছে ইন্দ্রিয়াতীত কোনো কিছু ধারণ ও উৎপাদন করা। যদি বল এই ইন্দ্রিয়াতীত বস্তুটি কী? তবে জেনে রাখ, সাধারণভাবে, সে হচ্ছে প্রজ্ঞা ও সদগুণ।

এরপর সক্রাতেস এক অপার সম্ভাবনার কথা বলেন, এক দেহধারী থেকে দুই, দুই থেকে সমগ্র জীবজগৎ, তারপর দৈহিক সৌন্দর্য থেকে নৈতিক সৌন্দর্য, এর থেকে বিশুদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সৌন্দর্যের দিকে অগ্রসর হওয়া। এইভাবে নানাপ্রকার সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে পরম প্রজ্ঞালাভ হয়, যার একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে সেই অখণ্ড সৌন্দর্য লাভ। তখন সে বুঝতে পারে সেই শাশ্বত, অনন্ত, বিশুদ্ধ, অনুপম সৌন্দর্য কী বস্তু।