Nabodhara Real Estate Ltd.

Khan Air Travels

Bangadesh Manobadhikar Foundation

নববর্ষ দেশে দেশে

বিডিনিউজডেস্ক.কম| তারিখঃ ১৫.০৪.২০১৮

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নববর্ষ পালিত হয়। তবে তাতে সময়ের হেরফের আছে।

নিজ নিজ সাংস্কৃতিক ঘরানায় নববর্ষ পালিত হয় ঘটা করে। একই দেশের মধ্যে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী আবার নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অনুসারে নববর্ষের দিন আনন্দ উৎসব করে থাকে। ‘জানুস’ (ল্যাটিন ভাষায় ‘লানুস’) গ্রিকদের দেবতা। শুরু ও সূত্রপাতের এই দেবতার একটি মাথা, তার দুদিকে দুটি মুখ। একটি সামনের দিকে অপরটি পিছনের দিকে। দেহ অবিচ্ছিন্ন। প্রবেশ পথ বা তোরণের দেবতা হিসাবেও আরধ্য ছিলেন। প্রাচীন রোম সাম্রারাজ্যের নববর্ষ উৎসব হতো এই ‘জানুস’কে ঘিরে। এখনো জানুসের মূর্তি রয়েছে ভাটিকান জাদুঘরে। ‘টেম্পল অব জানুস’ এর ছবি খোদাই করে মূদ্রা প্রচলন করেন রোম সম্রাট ‘নিরো’। ইতালির ছোট্ট শহর ভেলাব্রোর সেন্ট জর্জের গির্জায় রয়েছে ‘আর্চ অব জানুস’। তার নাম থেকে নেয়া নববর্ষের শুরুর মাস জানুয়ারি স্থায়ীভাবে রয়ে গেছে পৃথিবীব্যাপী। যুগান্তরের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে নববর্ষের সময় উদযাপনের ঘরানা।

প্রাচীন মিসরে প্রচলিত ছিল ‘কোপটিক’ বা আলেকজান্দ্রীয় বর্ষপঞ্জি। তাতে ছিল ৩০ দিনের মাসের ১২ মাস, সঙ্গে ৫ দিনের ছোট এ মাস সর্বমোট ৩৬৫ দিন)। তৃতীয় টলেমির সময় (খ্রিস্টপূর্ব ২৩৮) তার সংস্কার হয়। নববর্ষের দিন মিশরীয়রা পালন করতো ঘর Ni Yaronon (নদীর উৎসব)। এটা থেকেই এসেছে ইরানের নববর্ষের নাম ‘নওরুজ’।

রোমের প্রাচীন বর্ষপঞ্জির সামান্য পরিবর্তন করে জুলিয়াস সিজার তৈরি করেন একটি সৌর পঞ্জিকা। সেটা হযরত ইছা (আ.) বা যিশুখ্রিস্টের জন্মের ৫৬ বছর আগের কথা। খ্রিস্টপূর্ব ৪২ সালে রোমান সিনেটে ১২ মাসের এই পঞ্জিকা (জুলিয়ান ক্যালেন্ডার) সরকারি স্বীকৃতি পায়। তাতে ছিল ৩৬৫ দিন। ‘লিপ ইয়ার’ হিসাবে চার বছর অন্তর অন্তর একদিন বাড়তি। ‘ভার্নর ইকুইনক্স ছিল’ ২৫ মার্চ। এক বছরের চেয়েও বেশি ছিল জুলিয়ান বছর। তখন সেটাই ছিল মূল নববর্ষ।

ত্রয়োদশ পোপ গ্রেগরি ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে নতুন ক্যালেন্ডার চালু করেন। এতে প্রথম দিনটি নির্ধারণ হয় ১ জানুয়ারি। গ্যালারি (লিটার্জিক্যাল) ক্যালেন্ডার পৃথিবীতে সাদরে গৃহীত হয়। এতে বছরের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই মূল নববর্ষের উৎসব শুরু হয়। ব্রিটেনে আগে নববর্ষ পালিত হতো ২৫ মার্চ। দিনটিতে বলা হতো ‘ফিস্ট অব দ্য আনানসিয়েশন’। ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে স্বীকৃতি পায় গ্রেগরি ক্যালেন্ডার। মজার ব্যাপার হলো সেটিই এখন সারাবিশ্বে ইংরেজি ক্যালেন্ডার হিসেবে পরিচিত।

হযরত মোহাম্মদ (স.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় গমন করেন। এই গমন করাকে আরবিতে বলা হয় ‘হিজরত’। আরবি ‘হিজরা’ শব্দের অর্থ ‘গৃহ ও বন্ধুদের ছেড়ে চলে যাওয়া’। ইসলামি বা আরবি বর্ষকে বলা হয় ‘হিজরা’। আরবি বা ইসলামি বর্ষপঞ্জির দিন সংখ্যার চেয়ে ১১-১২ দিন কম। এই দুই নববর্ষের ব্যবধান তাই প্রতি বছর বদলায়। এ বছর ইসলামি নববর্ষ (১৪৩৯ হিজরি) পড়েছে ২২ সেপ্টেম্বর’২০১৭। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আরবি বা ইসলামি নববর্ষের সঙ্গে মহাউল্লাসে নববর্ষ পালিত হয়। যেমন আমাদের দেশেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভাবে ১ জানুয়ারি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে উঠেছে।

১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সুপারিশে চালু হয় ‘শকাব্দ’। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি বা জনগণের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার বাংলা একাডেমিকে বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কার করে লিপ ইয়ারের বিষয়টি বিজ্ঞান সম্মত করার দায়িত্ব প্রদান করে। এই মর্মে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্থাৎ ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে। এতে বছরের প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিনে এবং পরবর্তী সাত মাস ৩০ দিনে। যে বছর লিপ ইয়ার হবে সে বছর ফাল্গুন মাস একদিন বেড়ে ৩১ দিন হবে। এ কারণেই দুই বাংলার নববর্ষ কোনো কোনো বছর একদিন আগে-পিছে হয়।

ইয়েমেনে নববর্ষ ৬ এপ্রিল। নেপালে ১৪ এপ্রিল (এ কারণে সাধারণত আমাদের সঙ্গে একই দিন নববর্ষ পালিত হয়ে থাকে)। মায়ানমার ও থাইল্যান্ডে নববর্ষ পালিত হয়ে থাকে ১৩ এপ্রিল। নববর্ষের সঙ্গে চলে ‘মহাথিঙ্গন’ উৎসব। পানি ছিটানো হয়। একে অপরকে বিশুদ্ধ পানি ছিটিয়ে আনন্দ করা হয়। এখানে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য যেকোনো প্রকারেই মহাথিঙ্গন উৎসবে নোংরা পানি ব্যবহার করা যাবে না। মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও চীনে নববর্ষ ফেব্রুয়ারিতে। তিব্বতিদের নববর্ষ ‘লোসার’ উদযাপিত হয় ১৮ জানুয়ারি। পাকিস্তান ও মালদ্বীপে নববর্ষ পালিত হয় ১৭ এপ্রিল। তুরস্ক, কুয়েতসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশে নববর্ষ পালিত হয় গ্রেগরিয়ান বা ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে অর্থাৎ ১ জানুয়ারিতে।

বাংলাদেশে নববর্ষ পালিত আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা ইতোমধ্যেই ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করেছে। এক কথায় বলা যায় বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে ব্যাপ্তি বিশাল। রমনা বটমূল, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পুরান ঢাকাসহ বাংলাদেশের গ্রাম-শহরে আবালবৃদ্ধবণিতা এই দিন সকাল থেকে মেতে ওঠে নাচ, গান, কবিতা, নাটক ও হালখাতা উৎসবে।

বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখ মানে বঙ্গসংস্কৃতির উৎসব বাংলাভাষাকে ঘিরে নবজীবনের পার্বণ। বাংলার মানুষের কাছে এই দিনটি আত্মপরিচয় খোঁজার দিন। পশ্চিমবাংলা ও ত্রিপুরায় বাঙলা নববর্ষের সঙ্গে হিন্দুদের পূজা-পার্বণ অনুষ্ঠিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে উৎসব হয়, তবে তা ব্যবসায়ীদের হালখাতা, পরিবার পরিজন নিয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁয় বাঙালি খানার জন্য লাইন দেওয়া, নতুন জামা-কাপড় পরিধান করা আর কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এপার বাংলায় ভাষা ও সাংস্কৃতির টানে যতটা ভালোবাসা নিয়ে দিনটি উদযাপিত হয় ওপার বাংলায় ততটা হয় না। গত তিন বছর ওপার বাংলার কলকাতায়ও শুরু হয়েছে বাংলাদেশের অনুকরণে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ওপার বাংলার ব্যবসায়ীরা এই দিন হালখাতা করে থাকেন। ‘হালখাতা’ ভাঙলে দুটি শব্দ বের হয়। একটা হাল। যার অর্থ ‘লাঙল’। অন্য শব্দটির অর্থ ‘খাতা’। অর্থাৎ এক্সারসাইজ বুক। এখন লাঙল চলে কলে বা ইঞ্জিনে। জীবন খুবই ব্যস্ত। এর পরেও বাঙালি নিজেদের ঐতিহ্য আঁকড়ে আছে, থাকেবে বহুকাল।

মোগল সম্রাট আকবরের সময় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সাল গণনা শুরু হয়। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। ১৯৬৭ সালের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, আন্দামান-নিকোবার, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা ও বিহারের বাঙালি পরিবারগুলোও এই দিন উৎসবে মেতে ওঠে। তারা তাদের শেকড়ের সন্ধান খোঁজে এই দিনটিতে। শ্রীলঙ্কায় নববর্ষ উৎসবকে বলা হয় ‘পাথাণ্ড’। ভারতের তামিলরাও ওই দিন নববর্ষ পালন করে। তামিলরা এই দিন মন্দিরে মন্দিরে পঞ্জিকা (পঞ্চঙ্গম) পাঠ করে।

ফেব্রুয়ারিতে চীনের চান্দ্র-নববর্ষ। এই উৎসবকে বলা হয় ‘চুন জি’, ইংরেজিতে ‘স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল’ বা স্প্রিং ফেস্ট’। বেজিংয়ের হোইয়াই হ্রদে মন্দিরের মেলার ভিড় জমান উৎসাহীরা। চীনের প্রাচীরের একটি অংশ এই দিন বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পর্যটকদের জন্য থাকে বিশেষ প্যাকেজ। প্রতিবছর চীনের নববর্ষে থাকে বিশেষ থিম। গত বছর ছিল ড্রাগন। এ বছর সাপ। লাল পোশাক, লাল সন্ধ্যাবাতিতে সেজে ওঠে চীনের জনজীবন। আগে চীন এবং জাপানে একই দিন নববর্ষ উদযাপন হতো। এখন জাপানিরা ইংরেজি নববর্ষ বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে নববর্ষ পালন ১ জানুয়ারি।

নববর্ষ সন্ধ্যা স্পেনে পরিচিত Vispera de Ario nuevo হিসেবে। ১ জানুয়ারিতে কোরিয়াতে ‘সিওনাল’, ১১/১২ সেপ্টেম্বর ইথিওপিয়ায় ‘এঙ্কুটাটাস’-এর মতো হল্যান্ডে (নেদারল্যান্ডে)Nieuvwjaar Sdag উৎসব, বেলজিয়ামে Sint Sylvester Voorovond, ফ্রান্সে La Saint Sylvestere, ইতালিতে Vigilia di Capodanno অথবা Notte disan Silvestro পালিত হয় জাঁকজমকের সঙ্গে। ওযাশিংটন থেকে প্যারিস, মাদ্রিদ থেকে নিউইয়র্ক, মেলবোর্নসহ পশ্চিমা প্রধান শহর রাতভর জেগে ঘটা করে নববর্ষ উৎসব পালন করে। পশ্চিমা দেশের গির্জা ও জাহাজের ঘণ্টাধ্বনি জানায় নববর্ষকে স্বাগতম। গির্জায় গির্জায় ঝুলানো হয় প্রভু যিশুর জন্মবৃত্তান্ত। চলে পারস্পরিক শুভেচ্ছা পর্ব। আবালবৃদ্ধবণিতার বিশাল একটি অংশ মেতে ওঠে আতশবাজিতে। চলে নাচ-গান উল্লাস। জার্মানির নববর্ষের প্রধান উৎসব হয় বার্লিনের ব্যান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে। লন্ডনে বিগ বেন এবং ওয়েস্টমিনিস্টার প্রাসাদের ঘড়ি ঘরের সামনে ঘটা করে উৎসব করে সর্বস্তরের জনতা। এই অনুষ্ঠান বিবিসিসহ প্রায় সকল মিডিয়া সরাসরি সম্প্রাচার করে থাকে।

বাংলাদেশে সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, ওঁরাও, গারো, ম্রো, মোরাং, হাজং, ইত্যাদি অধিবাসী এবং ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অনুসরণে নিজ নিজ নববর্ষ পালন করে থাকে।আমাদের প্রত্যাশা নতুন বাংলা বছর একুশের তারুণ্য নিয়ে ঝলমল হয়ে উঠুক। সকলকে নিয়ে পথ চলার অঙ্গীকারে বৈশাখ। বাংলাদেশ হোক অম্প্রদায়িক একটি জন কল্যাণকর রাষ্ট্র।